Home » রাজনীতি » বিলম্বিত স্বাভাবিক পরিস্থিতি :: বাড়বে তাণ্ডব

বিলম্বিত স্বাভাবিক পরিস্থিতি :: বাড়বে তাণ্ডব

আবীর হাসান

dis 2রাষ্ট্রের হাতে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা কে পাবে আর কে পাবে না সে প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে। কারণ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ‘মিডিয়া কথিত’ দুর্বৃত্তরাই বার বার জিতে যাচ্ছে এবং নিরাপদে কাজ কর্ম সারতে পারছে। এদের কাজ কর্ম বলতে তো মানুষ হত্যার মতো চরম একটা ব্যাপার এবং সেটা ঘটেই চলেছে। হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা, ধরন ইত্যাদি পুনরাবৃত্তি যেহেতু ঘটছে সেহেতু রাষ্ট্রীয় বাগড়ম্বও ‘জিরো টলারেন্স’ ইত্যাকার বিষয়গুলো যে নিছক কথার কথা তা বলাই বাহুল্য। খুব মজার একটি কথা বলেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা – ‘ব্যক্তির নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব নাকি তাদের নয়।’

কাজেই এখন এটা বেশ সুস্পষ্ট যে, পথে পথে এই যে পুলিশ দাড়িয়ে থাকে, টহল দেয়, তা জনসাধারণকে রক্ষা করার জন্য নয় কেবল ক্ষমতাসীনদের রক্ষার জন্যই। তাও হয়তো সবাইকে দিতে বাধ্য নয় যারা সাইরেন বাজিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন তাদের আগমন বার্তা পেলে তটস্থ হতে পারে তারা। তবে একথাও অনেকে বলেন, পুলিশ পারে না এমন কাজ নেই এটা খুবই সত্যি এবং তারা তা করে। অপরাধী ধরার বিষয়টাতেও যদি কোন নিকট স্বার্থ থাকে তাহলে সেটা তৎপরতার সাথেই করে। না হলে ওই উদ্ভট অজুহাত তারা দেয় যে, ব্যক্তির নিরাপত্তা দিতে তারা বাধ্য নয়। এখন এই প্রশ্নটা কিন্তু উঠতেই পারে যে, যাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য বলে পুলিশ মনে করছে তারা কি আসলে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনির মধ্যে আছেন নাকি সবই লোক দেখানো। আসলে সম্ভবত লোক দেখিয়ে দেখিয়ে সব কিছু চলে এই দেশে অন্তত গত বছরখানেক রাজনীতির চাইতে টেলিভিশনের মাধ্যমে লোক দেখানো বিষয়টাই প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে রাজনীতিটা আর হয়নি। জনসাধারণের কাছাকাছি যেতে পারেননি কোনো রাজনীতিবিদই। অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন টেলিভিশনের মাধ্যমে কিছু বলে দিলেই তা জাতীয় গুরুত্ব পাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। টেলিভিশনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেও এখন তা লোক দেখানো বলেই ধরে নেয় সাধারণ মানুষ। একথাও তো সত্যি যে, এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে না হোক, সকলেই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং বিশ্বাসের জায়গায় কাউকেই রাখেনি। ঝুকি নেয়ার ক্ষেত্রটাকেও তা সঙ্কুচিত করে ফেলেছে।

এদেশের মানুষের কাছে এখন পুলিশ এবং রাজনীতিবিদ সমার্থক। আর বিস্ময়কর ভাবে তারা একই ভাষায় একই সুরে কথা বলছে। এরা যেকোনো ঘটনার বিচিত্র ও অবাস্তব যুক্তি দিয়ে কথা বলে, প্রায়শই তারা যুক্তি এবং এখতিয়ারের বিষয়গুলোর বিস্মৃত হন কিংবা ইচ্ছা করে লঙ্ঘন করে।

সমস্যাটা সম্ভবত হচ্ছে এ রকম যে, রাষ্ট্রকে নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতাসীনরা অসীম ক্ষমতাসীন বানাতে চাচ্ছেন। কিন্তু সেই ক্ষমতা দেখানোর ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই তাই চলছে অনিয়ন্ত্রিত বকওয়াজী। সমস্যা তারাও তৈরি করছেন যারা নিজেদেরকে স্পেশাল বলে ভাবছেন। জনসাধারণ তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করেনি, তারা নিজেরাও হয়েছেন এবং ভেবে নিয়েছেন বাক সর্বস্ব রাষ্ট্র যন্ত্রও তাদেরকে স্পেশাল ভাববে। এই ভাবাভাবি থেকেই নানা রকম অতিভারী ভাবাবিকতা তৈরি হয়েছে। যা তারা নন তাই প্রতিপন্ন করার প্রবণতার সাথে সাথে বিশেষ সুবিধা নেয়ার প্রবণতাও তাদের আছে। প্রাচীন কালের মতো তারাই সিটিজেন হিসাবে নিজেদের প্রতিপন্ন করতে চাচ্ছেন এবং অন্যদের হেয় প্রতিপন্ন করে সুখানুভূতির মধ্যেও থাকেন তারা। কিন্তু অতি ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে তারা ওটা পান না পাওয়ার কথাও নয়। ফলে ক্ষোভটা তারা শেষ পর্যন্ত ঝাড়েন জনসাধারণের ওপরই।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে আইনগত সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টাও রয়েছে বিপদমান পক্ষগুলোর মধ্যে। এখনো এ বিষয়গুলো খুবই অপরিপক্ক অবস্থার মধ্যে রয়েছে সে কারণে আনাড়িপনাও দেখা যাচ্ছে সর্বত্র।

কর্তৃত্বপরায়ণতা ফলাতে যে স্বাচ্ছন্দ্য প্রয়োজনর হয় তা এই সরকার দেখাতে পারছে না। ওটা দেখাতে পারলে যে রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার সাহস দেখাতে পারতো। কিন্তু তা নেই বলেই প্রশাসনিক এবং ভূইফোড় যুক্তিকে বার বার সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। এ সবই হচ্ছে দায়দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। বস্তুত দায়দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা সরকার থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে। বস্তু উদ্ভূত সঙ্কট থেকে খুব অল্প আয়েসে পার পেতে চাচ্ছে তারা। কিন্তু ওটা যে সম্ভব নয় তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলীই প্রমাণ করছে।

রাজনৈতিক এই পরিস্থিতিটাকে প্রলম্বিত করলে যে অপশক্তির তাণ্ডব বাড়বে সে আশঙ্কা আগেই যেখানে সাধারণ মানুষই করেছিল সেখানে সরকার ছিল ভাবলেশহীন। এখন জঙ্গীসহ সব অপশক্তিই সক্রিয়। এতো বাগড়ম্বর সত্ত্বেও তারা অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। এর বিপরীতে ঢিলেঢালা যে অবস্থানটা নিয়েছে সরকার ও রাষ্ট্র তা খুবই বিপজ্জনক।

বিপজ্জনক এই অর্থে যে এতে করে প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে গেছে সাধারণ মানুষ। অন্ততপক্ষে রাষ্ট্রের কাজ থেকে যে ন্যূনতম কর্মক্ষমতা তারা আশা করে তাও পাচ্ছে না। সম্ভবত এই ঘটনাই ঘটেছে যে, সরকারের টিকে থাকার প্রয়াস রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডকে শেষ করে দিয়েছে। এর আগেও সরকারের ব্যর্থতা রাষ্ট্রের ওপর বর্তাতে দেশে এবং বিদেশে আমরা দেখেছি। সাম্প্রতিককালেও এ ঘটনাই ঘটেছে বলে নিশ্চিতই হওয়া যায়। আর ঠিক এই কারণেই, যে বিষয় স্বাভাবিক, সেগুলোকেই নতুন করে দাবি করার হচ্ছে বিশেষ কর্মকাণ্ড হিসেবে। অথচ খুবই ন্যূনতম যে চাহিদা নিরাপত্তা সেটাই দিতে পারছে না সরকার।।