Home » বিশেষ নিবন্ধ » বেসামরিক শাসন কেন বার বার হোঁচট খায়

বেসামরিক শাসন কেন বার বার হোঁচট খায়

আমীর খসরু

last 1বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও আগের রাষ্ট্র কাঠামোটির কাছ থেকে এদেশের শাসকরা অগণতান্ত্রিক শাসন, জনগণের অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা, বাকব্যক্তি স্বাধীনতা হরণসহ সমস্ত অগণতান্ত্রিক বিষয়গুলো পেয়ে গেছে উত্তরাধিকার সূত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। অথচ এর বিপরীতটিই হওয়ার কথা ছিল। যে রাষ্ট্রটি পাওয়া গেল তা জনগণকে সাথে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী লড়াইসংগ্রাম এবং সশস্ত্র রক্তাক্ত যুদ্ধের পরেও কখনই জনগণের হয়ে উঠতে পারেনি এবং এমন চেষ্টাটিও তাদের দিক থেকে ছিল না। আগের শাসন ব্যবস্থাটির ভেতরকার অগণতান্ত্রিক, গণতন্ত্র বিরোধী মনমানসিকতা এবং যাবতীয় অন্তর্গত দুর্বলতার বিষয়গুলো শাসকদের মনোজগতের গহীন ভেতরে বাসা বেধেছিল ও তারা এগুলো লালন করছিলেন। জনগণের বিপক্ষের বিষয়গুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হয় তার নেতিবাচক দিকটিই গ্রহণ করা হয়েছে, অথচ লড়াইসংগ্রাম এবং মুক্তির যুদ্ধটি ছিল ঠিক এর বিপক্ষে এবং এ ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণের।

ঔপনিবেশিক শাসনোত্তর দুর্বল কাঠামোর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আগের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণবিরোধী, নির্বতনমূলক আইনকানুন বিশেষ করে জনগণের আশাআকাঙ্খাকে কিভাবে অস্বীকার এবং নির্মূল করতে হয় তার স্বপক্ষে পুরো ব্যবস্থাটি বিদ্যমান থেকে যায়। এই ধারায় শুধুমাত্র শাসক বদলের কাঠামোটিকে রাজনৈতিক অর্থনীতির (পলিটিক্যাল ইকোনমি) পন্ডিত হামজা আলাভী উল্লেখ করেছেন অতি বিকশিত বা ওভার ডেভেলাপড স্টেট হিসেবে। অর্থাৎ পুরনো রাষ্ট্র কাঠামোটির সমস্ত ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখে শুধুমাত্র ব্যক্তি বা শাসকের চেহারা বদল হওয়ার কথাই এই তত্ত্বের মূল বিষয়। এ কারণে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে দুটো আলাদা রাষ্ট্র হলেও জনগণের প্রকৃত মুক্তির বিষয়টি সম্পাদিত হয়নি, ঘটেনি রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণ। ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যবস্থাটির শুরু এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের মধ্যদিয়ে অধিকতর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটির বিভক্তি ঘটে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনের যে মুক্তির আন্দোলন তা দানা বেধেছিল ১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। এ কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে দীর্ঘ সামরিক শাসন থেকে জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করতে হবে। কারণ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ক্রমাগতভাবে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে পৃথক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেমন আমরা পেয়েছি, তেমনি জনগণও মুক্তি পেয়েছে দীর্ঘ সামরিক শাসন থেকে। আর এ কারণে সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসকদের প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল প্রধান এবং মুখ্য বিষয়। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটি।

শুরুর প্রথম লগ্নেই জনগণের বিপক্ষে দাড়িয়ে যায় শাসক দলটি অনিবার্যভাবে এবং এর মধ্যদিয়ে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ বাংলাদেশের জনগণকে শুধুমাত্র ‘প্রজা’ বানানোর প্রচেষ্টাটিরও সফল সূচনা হয়। শাসক দলটি ’৭০এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন যে কোনো দল নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক তা ভুলে গিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষেরই অপরাপর রাজনৈতিক দল, মতপক্ষকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে শাসন কাজ শুরু করে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয়ে উঠার সুযোগ বেশ কয়েকবার পাওয়া গেলেও তা বার বার হাতছাড়া হয়ে গেছে। বরং বেসামরিক শাসকরাই গণতন্ত্রকে বিপন্ন, বিপর্যস্ত করে তাদের নিজেদের জন্য বিপদ তো ডেকে এনেছেনই, জনগণকেও করা হয়েছে আশাহত এবং বিপদগ্রস্ত। স্বাধীনতার পর পরই রাষ্ট্রটির প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার যে তীব্র আকাক্সক্ষা জন্ম নিয়েছিল অনেকদিনের প্রতিক্ষার পরে তা ক্রমশ বিলীন হতে থাকে। স্বাধীনতা অর্জনের যে দীর্ঘ সংগ্রাম তা শুরুটি হয়েছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, আর এর মধ্যদিয়ে নতুন যে স্বপ্ন ও বাসনা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল তা আসলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রাপ্তি এবং শাসকদের গণতান্ত্রিক মনোভাব দেখার ইচ্ছাটি সব সময়ই প্রবল এর বিপরীতটি নয় কোনোদিনই।

বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক দেশের মতোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্তি নিয়েই যাত্রা শুরু করে। আর ওসব ভ্রান্তির কারণেই গণতান্ত্রিক এমনকি বেসামরিক শাসন বার বার বাধাগ্রস্ত হয়। নির্বাচনই যে পুরো গণতন্ত্র নয় এ বিষয়টি প্রথম দিন থেকেই ক্ষমতাসীনদের মনে কখনোই উদিত হয়নি, বরং যা হয়েছে ও করা হয়েছে তাহলো শুধুমাত্র নির্বাচনই গণতন্ত্র এমনটি বদ্ধমূলভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বিতীয় আরেকটি ভ্রান্তি প্রথমদিন থেকেই বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। আর তাহলো যেনতেনভাবে একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে যে দলটি ক্ষমতায় আসবে সব কিছুই তাদের এমন ধারণাজাত শাসন কার্যক্রম শুরু হয় প্রথমদিন থেকেই। অর্থাৎ বিজয়ীই সবকিছু ও সর্বেসর্বা, অন্যরা কিছুই নয় (উইনার টেকস অল) এমন মনোভাবের সৃষ্টি করা হয় শুরু থেকেই। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থায় অপরাপর রাজনৈতিক দল, মতপক্ষের মতামতকেও যে মূল্যায়ন বা আস্থায় নিতে হয় তার পুরো বিলোপ সাধন করা হয়। ৪৪ বছর পরে এসে যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশের শুরুটি যদি একটি সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার ব্যবস্থা দিয়ে শুরু হতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, তাহলে কেমন হতো? এখানে ১৯৭০এর নির্বাচনটিকে বিশ্লেষণের মধ্যে আনতে হবে।

১৯৭০এর নির্বাচনটিকে শুধুমাত্র একটি দলের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করা যে চরম ভ্রান্তি সে বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে, পরবর্তীকালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাধাবিঘœ অথবা বার বার হোচট খাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে। ১৯৭০এর নির্বাচনটিকে একটি প্রতীকী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ ওই নির্বাচনে জনগণ শুধু একটি দল বা প্রতীকে ভোট দিয়েছিল তা বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ঠিক হবে না এ কারণে যে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রবল আকাক্সক্ষার কারণে ওই প্রতীক এবং দলটি হয়ে উঠেছিল সামগ্রিকভাবে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের বিষয় হিসেবে। মওলানা ভাসানীর ওই সময়কার নির্বাচন বয়কটসহ বেশ কিছু বিষয় বিচারবিশ্লেষণ করলে এ সত্যটিই বেরিয়ে আসে। কাজেই নির্বাচনই পুরো গণতন্ত্র এবং ওই নির্বাচনে বিজয়ীই সর্বেসর্বা ও সব কিছুর মালিক এমন একটি ভ্রান্তির মধ্যদিয়েই এই রাষ্ট্রটির যাত্রা শুরু হয়। এটি পরবর্তীকালে রাষ্ট্র কাঠামোর একটি ক্রনিক বা অব্যাহত সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়। আর এ থেকে নিত্যনতুন সঙ্কটসংঘাতের জন্ম নিতে থাকে। বাংলাদেশের শাসক দলগুলো গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলোর জন্ম দিয়েছে তার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে এসব বিচারবিশ্লেষণ জরুরি।

এই বিবেচনায় বলা যায়, স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিন থেকে নতুন শাসনের যাত্রা শুরুর লগ্নে সমগ্র জনগণকে সাথে নিয়ে সব দলমতের মতামতকে বিবেচনায় এনে এগিয়ে যাবার যে সুযোগটি তৈরি হয়েছিল তা সূর্যোদয়ের প্রথম লগ্নেই নিভে যায়। স্বাধীনতার পরে ক্ষমতা গ্রহণের কারণে আওয়ামী লীগ ’৭০এর নির্বাচনটিকে শুধুমাত্র ওই দলেরই বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করায় তারা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আর রইলো না, বরং তারা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেই আবির্ভূত হলো। আর এর প্রধান শাসকও হয়ে গেলেন একটি দলের নেতা, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আর থাকলেন না। এ কাজগুলো করা হয়েছে স্বেচ্ছায়।

শুরুর প্রথম লগ্নেই জনগণের বিপক্ষে দাড়িয়ে যায় শাসক দলটি অনিবার্যভাবে এবং এর মধ্যদিয়ে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ বাংলাদেশের জনগণকে শুধুমাত্র ‘প্রজা’ বানানোর প্রচেষ্টাটিরও সফল সূচনা হয়। শাসক দলটি ’৭০এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন যে কোনো দল নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক তা ভুলে গিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষেরই অপরাপর রাজনৈতিক দল, মতপক্ষকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে শাসন কাজ শুরু করে।

স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র এক বছর নয় মাসের মাথায় এসে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে নিবর্তনমূলক কালাকানুন সম্বলিত আইনকানুনসহ জরুরি অবস্থার বিধান রেখে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী আনে। এর স্বল্পকাল পরেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং স্বাধীনতা লাভের তিন বছর শেষ হওয়ার পরপরই অপরাপর দলকে বিলোপ করে, সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়ে একদলীয় শাসন অর্থাৎ বাকশাল কায়েম করে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। একদিকে দুর্ভিক্ষ অন্যদিকে চোরাকারবারীমজুতদারীসহ নানা ঘটনা ঘটতে থাকে। গঠন করা হয় রক্ষীবাহিনী, নিহত হন ৩০ হাজার বামপন্থী নেতাকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ। ১৯৭১ সালে যদি পাকিস্তানের সামরিক শাসন থেকে মুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হয় তবে বছর চারেকের মধ্যেই আবার সামরিক শাসনের দুষ্টচক্রের মধ্যে এদেশের মানুষকে ফেলে দেয়া হয়, বেসামরিক শাসনের ইতি ঘটে। আর এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল সুযোগসন্ধানীরা।

স্বাধীনতার পর পরই এক দলের শাসনের বিষয়টি চিন্তা না করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে গড়ে তোলা হতো তাহলে বেসামরিক শাসনের প্রথম বিলোপ সাধনের ওই ঘটনাটি আদৌ ঘটতো কিনা সন্দেহ। ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে টানা সামরিক শাসন চলতে থাকে। জনগণকে এর বিপক্ষে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে বার বার রাজপথে নামতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে ওই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই।

অথচ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রচেষ্টা রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে। নানা উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা তারা গ্রহণ করেছিলেন বেসামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য। ১৯৫৭ সালে কলম্বিয়া এবং ১৯৫৮ সালে ভেনিজুয়েলায় দীর্ঘ সামরিক শাসন শেষে ওই দেশের প্রধান দুটো দলসহ বেসামরিক নেতৃত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কলম্বিয়ায় ওই সময় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার পরে বেসামরিক নেতৃত্ব সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারণ করেছিলেন যে, গণতান্ত্রিক শাসন কিংবা নিদেনপক্ষে শক্ত ভিত্তির বেসামরিক শাসন স্থায়ী করার জন্য যে দলই ভোট পেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করুক না কেন দেশটির প্রথম দফার শাসনকালটি হবে ভাগাভাগির অর্থাৎ অর্ধেক সময় এক দল শাসন ক্ষমতায় থাকবে এবং পরের দফায় অন্য দল শাসন করবে। আর এ সময়ের মধ্যে তারা গণতন্ত্র ও বেসামরিক শাসনের ভিত্তি শক্ত করার ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করবেন। এছাড়াও ওই সময়কালে গণতন্ত্রকে স্থায়ী করার জন্য নানা রক্ষা কবচ গ্রহণ করা হয়। ঐতিহাসিক ওই চুক্তি Punto Fijo’ (পুন্টো ফিজো) হিসেবেই পরিচিত। ভেনিজুয়েলার বেসামরিক শাসকরাও ওই একই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন গণতন্ত্রের স্বার্থেই। পরবর্তীকালে অন্যান্য দেশ এই উদাহরণ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটিতে এমন চিন্তার সুযোগ আসলেও বেসামরিক শাসকগণ হয় অজ্ঞতাবশত অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কখনোই ওই চিন্তা করেননি।

কিন্তু আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য, গণতান্ত্রিক প্রথাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে বেসামরিক শাসনকে দীর্ঘমেয়াদী এবং নিষ্কটক করার কোনো উদ্যোগ কখনই চোখে পড়েনি। বরং ক্ষমতার সহজ ও স্বাভাবিক পালা বদলকে পর্যন্ত বিপন্নবিপর্যস্ত করার যাবতীয় ব্যবস্থাটি তারা নিজেরাই জটিল করে তোলেন। তারা ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে ‘নিজেরাই সবটা নেবো’ এমন মানসিকতায় সব সময় আচ্ছন্ন থাকেন। আগেই বলা হয়েছে, প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থায় দুই বা একাধিক দল থাকতে পারে এবং শাসক দলই সর্বেসর্বা, শাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ মালিক এই মানসিকতায় যতোই দিন গেছে ততোই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যান্য দল, মতপথপক্ষকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তাদের চিন্তাচেতনা এবং মানসিকতার মূল উপাদান।

১৯৯০এর পরে বাংলাদেশে পুনরায় গণতান্ত্রিক শাসন দীর্ঘমেয়াদী করার সুযোগ এসেছিল। সুযোগ তৈরি হয়েছিল বেসামরিক শাসনকে যথাযথভাবে দীর্ঘস্থায়ী করার। কিন্তু এবারেও মাত্র তিনদফায় বেসামরিক শাসন থাকলেও তারা উল্লিখিত মানসিকতা থেকে বের হতে পারেননি। স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সব সময়ই বিঘিœত ও জটিলতর হয়েছে। পরিণতিতে ২০০৭ সালে সামরিক শাসন পুনরায় আসে তবে ভিন্ন নামে। অথচ ১৯৯০এর আন্দোলনের সময়ে তিন জোট যে রূপরেখা দিয়েছিল তার ভিত্তিতেই কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যাপারে। জনগণ প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বেসামরিক শাসকরা তাদের বলয় এবং বৃত্ত থেকে বের হওয়ার মানসিকতায় কখনই ছিলেন না। এক্ষেত্রে একই প্রশ্ন করা যেতে পারে যদি ১৯৯০এর পর প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও পক্ষ নিয়ে জাতীয় বা সর্বদলীয় সরকার হতো, তাহলে পরিস্থিতি কি ভিন্ন হতে পারতো না? কিন্তু হয়নি, ক্ষমতায় যাবার উদগ্র বাসনায়।

২০০৭০৮ এর সেনা শাসন থেকে উদ্ধার পাওয়ার পরে দেশের আপামর জনসাধারণ এটাই প্রত্যাশা করেছিল যে, বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের এবার নিশ্চয়ই যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে এবং তারা এ দফায় অবশ্যই বুঝতে পারবেন গণতন্ত্রকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের শাসন স্থায়ীকরণে করণীয় কি?

কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে বেসামরিক শাসকের মনোজগতের মধ্যে অগণতান্ত্রিক শাসন, বিজয়ীই সর্বেসর্বা, জনগণের আশাআকাক্সক্ষাকে অস্বীকার করা, বিরোধী দল, মতপক্ষকে নিদারুনভাবে নির্মূল ও বিলোপ, বাকব্যক্তি, মত প্রকাশের স্বাধীনতাহরণসহ সব নেতিবাচক উপসর্গগুলো অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায় ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। এছাড়া নির্বাচনই পুরো গণতন্ত্র নয় এমনটা মনে করা হলেও, সে ব্যবস্থাটিকেও বিদায় দেয়া হয়েছে। তবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, নির্বাচন হবে এবং এতে শুধুমাত্র এক পক্ষই থাকবে, তারাই বিজয়ী হবে, দেশ শাসন করবে। শুধু নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস সাধনই নয়, জনজীবনকে সামগ্রিকভাবে বিপন্ন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে হত্যা, গুম, অপহরণসহ জনগণকে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি অস্বীকার মধ্যদিয়ে।

এসব কর্মকান্ডের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে জনবিচ্ছিন্নতা। আবার জনবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে রাজনৈতিক শূন্যতা। এই শূন্যতা অতীতের মতোই নির্যাতননিপীড়নের মাধ্যমে পূরণের প্রচেষ্টার মধ্যদিয়েই জন্ম নেয় একনায়কতান্ত্রিক শাসনের। এরও নানা নেতিবাচক উপসর্গ থাকে। অথচ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির সেই বিখ্যাত বক্তব্য – ‘কোনো শাসকই নিরাপদ নন, শাসিতদের শুভ ও মঙ্গল কামনা ছাড়া।’ একই ভাবে জুসেফ সুমপিটার ১৯৪২ সালে তার একটি বিখ্যাত গ্রন্থ ক্যাপিটালিজম, সোস্যালিজম এ্যন্ড ডেমোক্রেসি গ্রন্থে এই বিষয়টি বলেছেন যে, ‘গণতন্ত্রের উৎস হচ্ছে জনগণের আকাক্সক্ষা এবং উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের উন্নয়ন’। এভাবে সব রাজনীতি বিজ্ঞানীই এই সিদ্ধান্তেরই উপনীত হয়েছেন যে, জনসম্পর্কহীন কোনো সরকারই বিপদের আশঙ্কা থেকে মুক্ত নন।

এদেশের জনগণের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে বেসামরিক শাসকরাই সব সময় বেসামরিক শাসন বা গণতন্ত্র চর্চার দিকটিকে বিপদাপন্ন করার জন্য দায়ী এবং এ জন্য তাদের প্রায়শই চড়া মাশুলই দিতে হয়। আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বার বার দেশটিকে হোচট খেতে হয়েছে। একদিকে, বেসামরিক শাসকদের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং প্রজ্ঞার অভাব অন্যদিকে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রবল বাসনা দেশটিকে দিতে হয়ে দফায় দফায়। আরও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে মৃত বিবেকধারী কিছু সুশীল গণতন্ত্রের মূল সঙ্কটটিকে কখনোই চিহ্নিত করায় উদ্যোগী হয় না। কারণ শাসক শ্রেণী অবৈধ পথপন্থার সাথে তারাও জড়িয়ে গেছে আষ্টেপৃষ্টে। এই প্রশ্নটি বারবার চলে আসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশটি কখন আসলেই প্রজাদের জন্য, প্রজাদের ইচ্ছায় গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে?