Home » অর্থনীতি » মাত্রাতিরিক্ত রিজার্ভ বৃদ্ধিতে উচ্ছ্বাসের কিছুই নেই

মাত্রাতিরিক্ত রিজার্ভ বৃদ্ধিতে উচ্ছ্বাসের কিছুই নেই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একের পর এক রেকর্ড গড়ছে বাংলাদেশ। এই রেকর্ড নিয়ে সরকারেরও উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। কিন্তু এ অলস অর্থ হিতে বিপরীত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিশাল অঙ্কের এই রিজার্ভ অলস বসিয়ে রাখলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ। এতে বেসরকারি খাত বিশেষ করে প্রস্তুতকারক খাতের উৎপাদন কমে যাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ পড়ে থাকা অর্থই হল বিনিয়োগ বন্ধ্যত্ব। তাই বিনিয়োগে নিয়ে আসতে হবে এই অর্থ। দেশে শিল্পায়নের প্রধান অন্তরায় গ্যাসবিদ্যুৎ সঙ্কট আর আবকাঠামো উন্নয়ন খাতে এই রিজার্ভ বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞরা এমন কথা শুরু থেকেই বলে আসছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকও বিনিয়োগ করবে করবে বললেও আজ পর্যন্ত এ অর্থ বিনিয়োগের মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৩ বিলিয়ন মর্কিন ডলার অতিক্রম করছে। মূলত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিটেন্স) প্রবাহ ও রফতানি বাড়ায় রিজার্ভ বেশ কিছুদিন ধরেই মজবুত অবস্থানে রয়েছে। বিদেশি সাহায্য বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় কমে যাওয়াও এতে প্রভাব ফেলেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঞ্চয়ে যে পরিমাণ ডলার রয়েছে, তা দিয়ে ছয় মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। যেখানে আন্তজার্তিক মান অনুযায়ী, রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেই তাকে আদর্শ ধরা হয়।

অতিরিক্ত রিজার্ভ বিনিয়োগে আনার ঘোষণা দেয়া হলেও তার কোনো বাস্তবায়ন না দেখা যাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে আর দেরি করা ঠিক হবে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংকও বলছে, রিজার্ভের অর্থ কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে তার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে এসে তার বাস্তবায়ন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের প্রথম ২২ মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ হাজার কোটি ডলারের ওপরে ছিল, যা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ওঠানামা শুরু হয়। অক্টোবরে রিজার্ভ ১ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছলেও তা স্থায়ী হয়নি। এর পরের মাস নভেম্বরেই রিজার্ভ আবারও ৯০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০১২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভ ৯০০ কোটি ডলারে অবস্থান করার পর ফেব্রুয়ারি মাসে ১ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০১৩১৪ অর্থবছরের জুলাই মাসে সাড়ে ১৫০০ কোটি ডলার এবং আগস্টে ১৬০০ কোটি ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছিল। এর পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। রিজার্ভ বাড়তে বাড়তে এখন তা ২৩ বিলিয়ন ডলার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বিপুল অংকের এই রিজার্ভ ধরে না রেখে বিনিয়োগে আনতে এখনি সরকারের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তার মতে, রিজার্ভ মূলত আপদকালীন খাদ্য আমদানির জন্য রাখা হয়ে থাকে। বর্তমানে আমাদের ১৫ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুদ আছে। আগামী একদেড় বছর খাদ্য আমদানির কোনো প্রয়োজন হবে না। বেশি রিজার্ভ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগতেও সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এ গভর্নর। তিনি বলেন, আমাদের দেশে রিজার্ভ কমে গেলেই সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল বলে এক ধরনের অপপ্রচার রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রিজার্ভ বেশি থাকায় সরকার এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পেতে পারে। কিন্তুরিজার্ভ অলস পড়ে থাকার খারাপ দিকও আছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যা প্রয়োজন, তা আমদানির সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকলেই যথেষ্ট। বেশি রিজার্ভ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।

এই বিষয়ের ব্যাখ্যায় ফরাসউদ্দিন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ধরে রাখলে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়। আর টাকার সরবরাহ বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, যার স্বাভাবিক পরিণতিতে বাড়ে মূল্যস্ফীতি। দেশের অর্থনীতির বর্তমান হাল বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, অন্যান্য সূচক ভালো থাকলেও বিনিয়োগ পরিস্থিতি বেশ খারাপ। অর্থমন্ত্রীও বারবার এ বিষয়টি বলে আসছেন। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে রিজার্ভ ব্যবহার করা খুবই প্রয়োজন। গ্যাসবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো, সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিনিয়োগে প্রধান বাধা উল্লেখ করে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, আমি চাই, এই সব সমস্যার সমাধানেই রিজার্ভ বিনিয়োগ করা হোক।

একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে এই রিজার্ভ যদি কোনো কাজে না লাগে সেটাকে খুব একটা ভালো বলা যাবে না। বরং রিজার্ভ যত বাড়বে ডলারের দাম তত নিম্নমুখী হবে। এতে রফতানিকারকরাও নিরুৎসাহিত হবে। তিনি বলেন, এছাড়া রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাত বিশেষ করে প্রস্তুতকারক খাতের উৎপাদন কমে যাবে। এতে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধাগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখতও রিজার্ভ বিনিয়োগের পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ডলারের দর ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে হস্তক্ষেপ করছে। এর ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে। যার ফল হিসেবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শিল্পায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে রিজার্ভ খরচের পরামর্শ দেন জায়েদ বখত। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ভালো। তবে ২৩ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ পড়ে থাকা অর্থই হল বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব। যত দ্রুত সম্ভব রিজার্ভ বিনিয়োগে আনতে হবে। বিদেশি মুদ্রা বিনিময় স্থিতিশীল আছে। বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক ধারা অন্যতম। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মাত্রা অনেক কম। এ কারণে কর্মসংস্থানও কমে গেছে। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে না। কারণ বেসরকারি খাতে উন্নয়ন কম হলে প্রবৃদ্ধিও কমে যায়। এই জায়গাটা থেকে প্রবৃদ্ধি বেশি আসে।

বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা চলছে, সে কথা বলার অবকাশ নেই। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এমনিতেই দেশে বিনিয়োগ আশাব্যঞ্জক নয়। শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি কম। যে কারণে শিল্পায়নের গতিও শ্লথ। ক্ষেত্র বিশেষে থমকে থাকার উদাহরণও আছে। কর্মসংস্থান না বাড়ায় দেশে বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। যদি বৈদেশিক মুদ্রা অলস পড়ে থাকে কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়, তা হবে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে, বৈদেশিক সম্পদের পরিমাণ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।।