Home » আন্তর্জাতিক » সঙ্কটে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটতে পারে ॥ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের তিন দফা

সঙ্কটে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটতে পারে ॥ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের তিন দফা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

last 3বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে চলমান সংঘাতসহিংসতা, হতাহতের ঘটনা এবং জনজীবনের তীব্র আতঙ্ক প্রভাবশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে উদ্বিগ্ন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বৃটেনসহ বিভিন্ন দেশ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এ্যমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মানবাধিকার সংস্থা ইতোমধ্যে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর আইন বহির্ভূত কর্মকান্ডের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতিতেও দারুনভাবে উদ্বিগ্ন এবং এ ব্যাপারে সরকারের ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়েছে। তারা পেট্রোল বোমাসহ দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপের মাধ্যমে জীবনহানী ও আহত হওয়ার ঘটনারও নিন্দা জানিয়েছে এবং বিরোধী দলকে সহিংস আচরণ থেকে তাদের কর্মীদের বিরত থাকার জন্য আহবান জানাতে বলা হয়েছে। সবাই একযোগে সরকার এবং বিরোধী পক্ষকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই সংঘাতসহিংসতা বন্ধ না হলে উগ্রবাদজঙ্গীবাদ সুযোগ নিতে পারে।

সবশেষ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধ, বিবাদ ও সংঘাত নিয়ে কর্মরত প্রভাবশালী সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ এক প্রতিবেদনে ওই একই ধরনের সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। ক্রাইসিস গ্রুপ বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে এই বলে উল্লেখ করেছে যে, ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ এর দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশটি। এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কট্টরপন্থি ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটতে পারে। প্রতিবেদনে ‘আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করতে পারে’ বলেও সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনও একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল।

ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন দু’পক্ষ যেপথে ধাবিত হচ্ছে তা পরিবর্তন করা হচ্ছে উভয়ের জন্যই উত্তম পন্থা। এজন্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে আওয়ামী লীগ সরকারকে। বিএনপির উচিত হবে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সমঝোতায় গিয়ে টিকে থাকা। বিরোধীদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো ও বিজেতাকে আইনের ভেতরে থেকে দেশ শাসন করতে দেয়ার জন্য নতুন রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে চায় না মূলধারার প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল। এর ফলে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কট্টরপন্থি ও অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটতে পারে। এরই মধ্যে ইসলামপন্থি বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হচ্ছে। এটা ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলার প্রতি হুমকি। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় এ দু’দলকেই প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে জিহাদি শক্তিগুলো।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোর মধ্যে যে গভীর বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস তা অপরিহার্য নয়। উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাস সত্ত্বেও প্রথম দিকে তারা দেশ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনের ইতি ঘটাতে ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করেছেন। ২০০৭ ও ২০০৮ সময়কালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সহযোগিতার এমন উদাহরণ থাকলেও দু’নেত্রী একে অন্যকে দুর্বল করতে আশ্রয় নিয়েছেন অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি। ক্ষমতায় থাকাকালে দু’জনেই বৈধ বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, রাজনীতিকরণ করা বিচার বিভাগ, শিকার সন্ধানকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। কার্যকর বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মৌলিক মানদে সম্মত হওয়ার ব্যর্থতা থেকে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি। বিএনপি যখন নিজেকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একমাত্র দাবিদার হিসেবে দাবি করে, তখন আওয়ামী লীগ নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার একমাত্র কৃতিত্ব ও রক্ষক হিসেবে দেখাতে চায়।

ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে সঙ্কট সমাধানে তিনটি আশুকরণীয় হিসেবে তিনদফা সুপারিশ দিয়ে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে বিশেষ করে তার নিজের ক্রমাগত বেশি বেশি হারে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝোঁকার আলোকে বোঝা উচিত যে, মূলধারার রাজনীতি থেকে বিএনপিকে কোণঠাসা করে দেওয়া হলে সরকার বিরোধী কার্যক্রম চরমপন্থা এবং উগ্রবাদের পথকে উৎসাহিত করতে পারে। একইভাবে বিএনপির উচিত সহিংস ইসলামি গ্রুপগুলোর সাথে তার সম্পর্ক পরিত্যাগ করা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শ নিয়ে নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করা। নতজানু ও সহিংস রাজনৈতিক সঙ্কট শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করবে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহিত করবে, যদিও এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তবে ইতিহাসের আলোকে এ ধরনের সম্ভাবনা চূড়ান্তভাবে বাতিল করেও দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক সহিংস লড়াইয়ের মাত্রা ও এর সীমা ক্রমাগত বিস্তৃত হওয়ায় রাজনৈতিক সমন্বয়ের সুযোগ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। উভয় পক্ষের উচিত তাদের সহিংস গ্রুপকে সংযত রাখা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস করার লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া :

. আওয়ামী লীগ সরকারকে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং অভিযোগের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, সুশীল সমাজের স্বাধীনতা খর্বকারী পদক্ষেপ পরিবর্তন করতে হবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তাদের সহায় সম্পত্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

.নির্বাচনী সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক বিধিবিধান পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে আলোচনার জন্য আওয়ামী লীগের উচিত বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো (প্রয়োজন হলে জ্যেষ্ঠতার নিম্নতর পর্যায়ে)। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও এর মধ্যে থাকতে পারে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার এ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এ প্রক্রিয়ায় সংলাপের একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

. বিএনপির উচিত অসহিংস রাজনৈতিক বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া; জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধতা থেকে বিরত থাকা, যা ইসলামি দলটিকে রাজপথের শক্তি বাড়িয়ে দিলেও বিনিময়ে বিএনপি রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে সামান্য এবং সঙ্কট, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার হুমকি সৃষ্টি করছে, নিরসনে বিক্ষোভের বদলে আওয়ামী লীগের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনায় সম্পৃক্ত হওয়া।