Home » মতামত » সত্যও চরমভাবে আক্রান্ত

সত্যও চরমভাবে আক্রান্ত

হায়দার আকবর খান রনো

dis 1বিখ্যাত একটি কথা আছে ট্রুথ ইজ দ্য ফার্স্ট কেজুয়ালিটি অফ ওয়ার অর্থাৎ যুদ্ধে প্রথম যা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হচ্ছে ‘সত্য’। অর্থাৎ যুদ্ধের সময় যতো মিথ্যা কথা বলা হয় তা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এটাকে বলে মনোস্তাত্বিক যুদ্ধ। বলাই বাহুল্য, বর্তমানে বাংলাদেশে গভীর রাজনৈতিক সঙ্কট বিরাজ করলেও যুদ্ধাবস্থা নিশ্চয়ই বিরাজ করছে না। তবে দুই বিবদমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে এক ধরনের ‘রাজনৈতিক যুদ্ধ’ চলছে যা আবার সহিংস রূপ ধারণ করেছে। একদিকে পেট্রোল বোমা, অপরদিকে ক্রসফায়ার। এই ‘যুদ্ধে’ও বলি হচ্ছে ‘সত্য’ বা ‘ট্রুথ।’ দুই পক্ষই চরম মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।

যেমন ধরা যাক, পেট্রোল বোমার প্রসঙ্গটি। কোন সন্দেহ নেই যে, পেট্রোল বোমা ছুড়ছে বিএনপিজামায়াত জোট। কিন্তু তারা অস্বীকার করছেন। যতোই অস্বীকার করুক, পাবলিক পারসেপশন কিন্তু এই যে, পেট্রোল বোমার দায়িত্ব বিরোধী জোটকেই নিতে হবে। অন্যদিকে বিএনপি যে অভিযোগ করছে, সরকারি দল বা সরকারি এজেন্সি এই দুষ্কর্মটি করেছে, বিরোধী পক্ষের ওপর দোষ চাপানোর জন্য, তা সর্বক্ষেত্রে সত্য না হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রকম অভিযোগের পক্ষে কিছু সাক্ষ্য পাওয়া যায়। যেমন চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রোল বোমা হামলার পর পরই পুলিশ যে দুইজন যুবলীগ কর্মীকে গ্রেফতার করেছিল, দ্রুতই তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। খালেদা জিয়ার অন্যতম উপদেষ্টা এবং সাবেক পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ রহমানকে কে বা কারা গুলি করেছিল, তা এখনো রহস্যাবৃত্ত। আওয়ামী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হলো যে, খালেদা জিয়াই নাকি তার দলের এই নেতাকে গুলি করেছেন। বলাই বাহুল্য, এটি জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা কথা। মানুষও বিশ্বাস করছে না। তবে তর্কের খাতিরে এ কথাটি বলা প্রয়োজন, যদি এমনটি হয়ই তাহলে যাদের দিয়ে এ কাজটি বিরোধী ওই নেত্রী করিয়েছেন, তাদের ধরা হচ্ছে না কেন? ধরা দূরে থাক, তাদের নামঠিকানা পর্যন্ত বলা হচ্ছে না কেন এতোদিন পরেও? বিরোধী দল যদি মিথ্যার আশ্রয় নেয় তা যেমন রাজনীতিকে কলুষিত করে, তেমনি সরকার মিথ্যাচার করলে তার ফলাফল দাড়ায় আরও মারাত্মক। জনগণ বড় অসহায়বোধ করে। উপরন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোগুলো ধসে পড়তে থাকে।

তবে আমার ভাবতে অবাক লাগে, সরকার কোন বুদ্ধিতে এমন মিথ্যাচার করে যা সহজেই ধরা পড়ে যায়? আরও কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। খালেদা জিয়ার অফিসে তালা মেরে বলা হলো যে, তিনি অবরুদ্ধ নন। বাড়ির সামনে বালুর ট্রাক রেখে জনৈক মন্ত্রী বললেন যে, ওই ট্রাক আনা হয়েছে বাড়ি মেরামত করার জন্য। পাঠক বলুন, কে এই কথা বিশ্বাস করেছে? অথবা হতে পারে, এটা ছিল নেহায়েত রসিকতা। কিন্তু এমন রসিকতা কোন মন্ত্রী পর্যায়ের নেতার মুখে সাজে না।

মিথ্যাচার তো বটেই, সরকারি দলের নেতামন্ত্রীদের হুমকিধামকি, আস্ফালন বা বেসামাল কথাবার্তা কেবল নিম্নমানের রুচি ও সংস্কৃতির পরিচয় বহনই করে না, সরকারের মন্ত্রীদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সাক্ষ্য বহন করে।

একই মন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ‘পাকিস্তান দূতাবাসে তালা মেরে দেয়া হবে।’ চার দশক আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। তাই পাকিস্তানের প্রতি আমার সদয় হবার কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক (যা শেখ মুজিবুর রহমানই স্থাপন করে গিয়েছিলেন) আছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সরকারের কোনো মন্ত্রী কি এমন কথা বলতে পারেন? আমাদের মন্ত্রীদের আরও অনেক খবর পরিবেশন করা যেতে পারে, যা হয়তো রাগের বদলে হাসির খোরাক জোগাবে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা সাজেদা চৌধুরী তো দলের সাবেক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মাহমুদ সম্পর্কে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বেয়াদব’। এরাই আমাদের দেশ চালাচ্ছেন। তারা কীই বা দেশ উদ্ধার করবেন। আর বর্তমানের গভীর সঙ্কট মোকাবেলায় তারা যে কতোটা সক্ষম হবেন তা অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয়।

২২ ফেব্রুয়ারি রাতে মিরপুরের কাজীপাড়ায় তিনজন তরুণকে নাশকতাকারী হিসেবে গণপিটুনিতে নিহত হতে হয়েছে, এমন দাবি করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। কিন্তু পরেরদিন পুলিশেরই সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, তিনজনের দেহে অন্তত ৫৪টি গুলি রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে তাদের কোনো খোজ নেই। খোজ যখন মিললো তখন তাদের দেহ গুলিতে ঝাঝরা, আর পরিচয় নাশকতাকারী। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই ক্রসফায়ারের অপর নাম কি গণপিটুনি? আর যে তিনজন তরুণকে হত্যা করা হয়েছে তারা কেউই রাজনীতির সাথে সামান্যতমও জড়িত নন। এছাড়া ওই একই রাতে আরও একজনকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত দেখানো হয়। এক্ষেত্রেও ওই একই ঘটনা ঘটেছে। সত্যকে মিথ্যা বানানোর এটি একটি সামান্য উদাহরণ মাত্র, দেশজুড়েই এমনটা ঘটছে এমন কথা শোনা যায় অহরহ।

এবার আসা যাক বিরোধী পক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রসঙ্গে। তারা রাজনীতিকে একটা তামাশায় পরিণত করেছেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ ডেকে বসে আছেন। তার উপর ডাকা হচ্ছে হরতাল। হরতাল ও অবরোধের মধ্যে পার্থক্য কি সেটাও পরিষ্কার নয়। দায়িত্বশীল দল হলে জনগণকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলতে হবে, সবকিছু। জনগণ তো বুঝছে না, বিএনপি নেত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বা আহবান কী। বস্তুত জনগণের তোয়াক্কা তিনি করছেন না। আন্দোলনের নামে এতো বড় দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দৃষ্টান্ত আমাদের দেশের ইতিহাসে ইতোপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, প্রথমে ৭২ ঘন্টা (রবি, সোম, মঙ্গল) হরতাল ডাকা হচ্ছে। পরে আরও ৪৮ ঘন্টা বাড়ানো হচ্ছে। একই প্যাটার্ন প্রতি সপ্তাহেই অনুসরণ করা হচ্ছে। এটাকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বললে কমই বলা হবে। এই দল জনগণের জন্য কি কল্যাণ করতে পারে তা তো বোঝাই যাচ্ছে।

আমাদের দেশের প্রধান দুই বুর্জোয়া দল, লুটের ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি এই দুই দল আবার বিদেশী শক্তির উপর নির্ভরশীলতাও বটে। সে জন্য তারা বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে ধর্নাও দেন। বিদেশীদের সাথে কি কথা হলো সেই ব্যাপারেও আবার তারা দ্বিধাহীনভাবে মিথ্যাচার করে চলেছেন। বিদেশী রাষ্ট্র অথবা জাতিসংঘের বক্তব্যকে খন্ডিত করে অথবা বিকৃত করে যে যার পক্ষে প্রচার করার ঘটনাও আমরা দেখেছি। এটাও মিথ্যাচার। এমন কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক।

যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন কংগ্রেস সদস্যের বিবৃতি জাল করে প্রচার করেছিলেন বিএনপির আমেরিকা প্রবাসী নেতা। আসলে বিষয়টি এই রকম, বিএনপি জনগণকে ভরসা দিতে চেয়েছে যে, ভারতআমেরিকার তাদের সাথে আছে।

অন্যদিকে সরকারও জনগণকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে অথবা বর্তমানের সঙ্কটময় সময়ে তারা সরকারের পক্ষে রয়েছে। সে জন্য তারাও চোখকান বুঝে মিথ্যাচার করে চলেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার বিষয়ক এক কমিটির নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তারা বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ে উদ্বেগ ও হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হলো যে, তারা নাকি কোন উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়র এমন বিভ্রান্তিকর বিবৃতির সাথে সাথেই সফররত কমিটির নেতা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যকে খন্ডন করে বলেছিলেন, ‘উদ্বিগ্ন বলেই তো আমরা এসেছি।’ তারা ঢাকায় বসেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য দারুন লজ্জার বিষয়। সেই কারণে এক ধরনের কূটনৈতিক বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরদিনই তাদের আগেকার বক্তব্যের সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়েছিল। এমন ঘটনা নজিরবিহীন। বাংলাদেশ এই ধরনের নানা নজিরবিহীন রেকর্ড তৈরি করে চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর যে বৈঠক হয় সেখানে কি আলোচনা হয়েছে তা নিয়েও আমাদের সরকার অর্ধসত্য বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ওই বৈঠকে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য বিরোধীদের সাথে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে অবশ্য আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য দেয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে তা বেমালুম চেপে যাওয়া হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশের বিবৃতিতে এমনটাই মনে হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান যা কিছু ঘটছে এবং সরকার যা যা করছে সবকিছুই বৈধ।

আমার কাছে খুব অবাক লাগে, কেন সরকার এই ধরনের মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয় যা তৎক্ষণাৎ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে? কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তো কোনো গোপন বিষয় নয় বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য বক্তব্যের মধ্যদিয়ে তাদের অবস্থান, মতামত এবং বক্তব্যবিবৃতি সব সময়ই প্রতিফলিত হয়। সবাই জানতে পারে, এমন বিষয়ে বানোয়াট কিছু বলতে যাওয়া কি মুর্খতার পরিচয় বহন করে না?

এর চেয়ে বরং মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ অনেক স্পষ্টভাষী। তিনি মার্কিনের বক্তব্যকে বিকৃত বা খন্ডিত করতে চাননি। বরং তিনি সরাসরি মার্কিন মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতকে তাচ্ছিল্যের সাথে অবজ্ঞা করেছেন। রাষ্ট্রদূতকে ‘কাজের মেয়ের’ সাথে তুলনা করেছেন। মার্কিনের সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে ‘দু আনা দামের মন্ত্রী’ বলে ব্যঙ্গও তিনি করেছেন। মনে হচ্ছে যেন সরকার বামপন্থী হয়ে উঠেছে। কারণ একমাত্র বামপন্থীরাই মার্কিনের বিরুদ্ধে এতোটা সাহসী উচ্চারণ করতে পারেন। অবশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকলে কোনো কমিউনিস্ট সরকারেরও কোনো মন্ত্রী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বা মন্ত্রী সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করেন না। কিন্তু বাংলাদেশের মন্ত্রী করেছেন, যিনি আবার শাসক দলের সাধারণ সম্পাদকও বটে।

উক্তিটি অশালীন হলেও আমি মন্ত্রীকে সাবাস বলতাম যদি পরবর্তীতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেই মার্কিনের কাছে ধর্না দেয়ার জন্য ওয়াশিংটন দৌড়ে না যেতেন অথবা মার্কিন প্রশাসনকে খুশি করার জন্য তড়িঘড়ি করে বঙ্গোপাসাগরের আরও তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে তুলে দেয়া না হতো।

একদিকে বিদেশ নির্ভরতা, অপরদিকে মিথ্যাচার সরকারি ও বিরোধী পক্ষ উভয়কেই রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রমাণ করেছে। এই দেউলিয়াত্ব দেশকে এক সর্বনাশের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই যা সর্বনাশ হয়েছে, তা যথেষ্ট ভয়াবহ। ভবিষ্যতে আরও সর্বনাশের আশঙ্কা যে নেই, সে কথা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না।।