Home » রাজনীতি » হায় গণতন্ত্র ॥ বড় অসহায় বোধ করি

হায় গণতন্ত্র ॥ বড় অসহায় বোধ করি

হায়দার আকবর খান রনো

dis 1বিএনপি প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সরকার তার নিজ কার্যালয়ে তালা মেরে, বালুইটের ট্রাক দিয়ে, পিপার স্প্রে ছড়িয়ে, বিপুল সংখ্যক র‌্যাবপুলিশ মোতায়েন করে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। অবশ্য মন্ত্রী মায়া বলেছেন যে, এসব বালু ও ইটের ট্রাক আনা হয়েছে খালেদা জিয়ার অফিসবাড়ি সংস্কারের জন্য। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যখন এমন মিথ্যাচার হয় তখন আমরা বড় অসহায় বোধ করি। বিএনপি ৫ জানুয়ারি যে সভা করার অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছিল তা পাওয়া যায়নি। পুলিশ প্রশাসনের দফতরে বিএনপি নেতারা কয়েকবার গিয়েও কোনো কর্মকর্তার দেখা পাননি। এদিকে আওয়ামী লীগছাত্রলীগ ঘোষণা দিয়েছিল, তারা বিএনপিকে সভা করতে দেবে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সভা পর্যন্ত করতে না দিয়ে তারা বলবেন, ‘এই হলো গণতন্ত্র’। এই ভাবেই তারা পালন করবেন ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’। একদিকে র‌্যাবপুলিশ এবং পুলিশের ছত্রছায়ায় দলীয় মাস্তান দিয়ে বিরোধী পক্ষকে দমন করা এবং সভা পর্যন্ত করতে না দেয়া, অপরদিকে গর্বের হাসি নিয়ে বলবেন, ‘পারলে না তো, মুরোদ নেই’। কি করলে পারা হয় অথবা মুরদ দেখানো হয়? বিএনপির সেই শক্তি আছে কিনা জানি না। তবে এই ক্ষেত্রে পারাটা হয়, যদি তারা আইন অমান্য করে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি করেন। শাসক আওয়ামী লীগ সেই পথেই যাবার জন্য বিএনপিকে উস্কাচ্ছে। কিন্তু সেই পথে গেলে আবার বলবে, ‘এটা হল সন্ত্রাসী কারবার’।

আওয়ামী লীগের সাথে কথায় কেউ পেরে উঠবে না। একদিকে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস অপরদিকে গলাবাজি ও বাগাড়ম্বর। এই দুটি হচ্ছে শাসক দলের বৈশিষ্ট্য, যা আবার একনায়কত্ববাদী লক্ষণ। এই দলটিই ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা যখন প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখনো তারা বলেছিলেন, ‘এটাই হলো আসল গণতন্ত্র, শোষিতে গণতন্ত্র, দ্বিতীয় বিপ্লব ইত্যাদি’। ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের আগেও তারা আজকের মতোই একইভাবে খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে বালির বস্তার ট্রাক রেখে পুলিশ দিয়ে পথ রুদ্ধ করে বলেছিল, ‘পারলে না তো রাস্তায় বেরিয়ে মিটিং করতে?’ একটা কথা মানতেই হবে যে, আওয়ামী নেতৃত্ব কথায় ও উপরোক্ত ধরনের অপকৌশলে অদ্বিতীয়।

৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তার যে আজ জনপ্রিয়তা শূন্যে নেমে এসেছে তা যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই বলবেন। এমনকি উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখেও বোঝা যায়। প্রথম দুই দফা উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের নিদারুন পরাজয়ের পর তারা আর গণতন্ত্রের ভড়ংটুকুও রাখেননি। ভোট কেন্দ্র দখল ও সিলমারার উৎসবে মেতে উঠলেন। বললেন, এটাই নাকি গণতন্ত্র।

পঞ্চাশের দশকে একটা সিনেমা তৈরি হয়েছিল হিটলারের উত্থান ও ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের কিছু ছবি নিয়ে। ছবিগুলো সংগৃহীত হয়েছিল জার্মানির আর্কাইভে রক্ষিত প্রামাণ্য দলিলসমূহ থেকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২০/২৫ জন যুবক হিটলারের ‘মেইন ক্যাম্প’ বই হাতে হল্লা করছে, কমিউনিস্টদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে, বিরোধী পক্ষের বই পুড়াচ্ছে। হিটলারের বন্দনায় বার্লিনের দেয়াল ছেয়ে গেছে। কিন্তু আমরা আরও অসহায় বোধ করি এই ভেবে যে, ইতিহাস থেকে কেউ কিছু শেখে না।

বর্তমান পরিবর্তিত অবস্থায় এসে দেখা যাচ্ছে, তারা আর কখনো সভা করতে দেবে না বলে ঘোষণা করেছেন। নেতারা ‘গণতন্ত্রের’ জয়গান গাইছেন। বলছেন, ‘নেড়ী কুত্তার মতো পেটানো হবে’ ইত্যাদি। এক নেতা তো বলেই বসেছিলেন, ‘বাড়ি বাড়ি ঢুকে হত্যা করা হবে।’ ঘটনাক্রমে সেই নেতা এখন জেলে।

তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ধ্বংস করার জন্য আইন প্রনয়ন করেছেন। এক মন্ত্রী তো বেসামাল অবস্থায় সত্য কথাটি বলেই বসলেন, ‘সম্প্রচার নীতি পাস হোক, তখন দেখে নেবো সাংবাদিকদের’। সাংবাদিকরা ‘সব খবিস’ এ কথা বলতেও বাধেনি। গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠান আজ দলীয়করণে পিষ্ট হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও দুদক যে শাসক দলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা কি বিশদ ব্যাখা করে বলার দরকার আছে?

বিচার ব্যবস্থাকেও সংসদের অধীনস্থ করা হয়েছে, যে সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। গুম, খুন, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, বিরোধী পক্সের ওপর দৈহিক নির্যাতন, যেখানে সাধারণ চিত্র সেখানে গণতন্ত্রের অবশেষটুকুও নেই।

বিএনপির প্রতি আমার সামান্যতম সহানুভূতি নেই। কারণ বিএনপিও তাদের রাজত্বকালে গণতান্ত্রিক আচরণ করেননি। তখনো ক্লিনহার্ট অপারেশনে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছিল। যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। খালেদা জিয়া পার্লামেন্টে আইন পাস করে নির্যাতনকারী ও হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। বিএনপিও আওয়ামী লীগের মতো ধনীক শ্রেণীর দল। তবে সত্যিকারের নির্বাচন হলে হয়তো এবার বিএনপি নেগেটিভ ভোটে জিতবে। কিন্তু বিএনপির জন্য মানুষ রাস্তায় নেমে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে সংগ্রাম করবে না। তাই বিএনপি হয়তো এই স্বৈরাচারী শক্তিকে মোকাবেলা করার ‘মুরদ’ রাখে না। কিন্তু প্রশ্ন তো সেটা নয়।

আওয়ামী শাসন তো শুধু বিএনপিকেই প্রতিহত করছে না, জনগণকেও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আজকে প্রতিপক্ষ বিএনপির সাথে যে আচরণ করছে, আগামীকাল তারা শ্রেণী প্রতিপক্ষ অর্থাৎ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সাথেও একই আচরণ করবে। তার প্রমাণও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। বকেয়া মজুরির দাবিতে অনশনরত গার্মেন্টস নারী শ্রমিকদের উপর চড়াও হয়ে বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা তো বেশিদিন আগের কথা নয়।

আজকে বিএনপি সভা করতে পারছে না। সে জন্য আমাদের উৎফুল্ল হওয়ার অথবা নিশ্চুপ থাকার কোন কারণ নেই। এই শক্তি একবার গেড়ে বসলে সকলেরই সর্বনাশ হবে। এই প্রসঙ্গে হিটলারের জামানায় এক নির্যাতিত কবি ও ধর্মযাজকদের সেই বিখ্যাত কবিতাটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রণিধানযোগ্য। কবিতাটির সারমর্ম এই রূপ

ওরা কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল

আমি নিশ্চুপ ছিলাম, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই

তারপর ওরা ট্রেড ইউনিয়ানিস্টদের জন্য এসেছিল

তখনো আমি কিছু বলিনি, কারণ আমি

ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী নই,

তারপর তারা ইহুদির জন্য এসেছিল

তখনো আমি কোন প্রতিবাদ করিনি,

কারণ আমি ইহুদি নই

তারপর তারা আমাকে ধরতে এলো

ততোদিনে আমার পক্ষে কথা বলার জন্য

কেউ আর ছিল না।’

আজকের বাস্তবতায় বিএনপি আক্রান্ত হচ্ছে বলে আমাদের নিশ্চুপ থাকা ঠিক হবে না। যেখানেই গণতন্ত্র আক্রান্ত হবে সেখানেই আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আর কিছু যদি করতেও না পারেন অন্তত সাহস করে প্রতিবাদটুকু জানান। কোটি মানুষের সরব, এমনকি নিরব প্রতিবাদও এক বিরাট শক্তি। লীগ সরকার মনে করছে, র‌্যাব ও পুলিশ তার ছায়াতলে আশ্রয়প্রাপ্ত দলীয় মাস্তান দিয়ে সব কিছু স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু হিসেবে ভুল করছেন। এই প্রসঙ্গে মহাভারতের একটি কাহিনীকে ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি কবিতার (গান্ধারীর আবেদন) কয়েকটি বাক্য খুবই প্রাসঙ্গিক।

ওরে বৎস শোন,

নিন্দারে রসনা হতে দিলে নির্বাসন

নিম্নমুখে অন্তরের গৃঢ় অন্ধকারে

গভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে

নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ততল।

রসনায় নৃত্য করি চঞ্চল

নিন্দা শ্রান্ত হয়ে পড়ে, দিয়ো না তাহারে

নিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারে

গোপন হৃদয় দুর্গে।’

অত্যাচারী দুর্যোধনের প্রতি এই ছিল পিতা ধৃতরাষ্ট্রের উপদেশ। শক্তি দম্ভে মত্ত দুর্যোধন তা শোনেননি।

কোন অত্যাচারী শাসক তা শোনে না। শুনছেন না আজকের আওয়ামী লীগ সরকার। ‘নেড়ী কুত্তার মতো পেটাবো’, ‘ঘরে ঘরে গিয়ে হত্যা করবো’, ‘খবিস সাংবাদিকদের দেখে নেবো’, ‘মিটিং করতে দেব না’ এই রকম বাক্য প্রয়োগ ছাড়া কোন সভ্য কথা ও গণতান্ত্রিক আচরণ তারা ভুলে গেছেন। কিন্তু এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। গণবিচ্ছিন্ন কোন শাসক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি, পারবে না। কিন্তু আমার আশঙ্কা অন্যখানে। শাসকের কি পরিণতি হবে, এ নিয়েও আমার কোনো ভাবনা নেই। আমার উদ্বেগের কারণ হলো ততোদিনে গণতন্ত্রের যে সর্বনাশ হয়ে যাবে তাতে ১৬ কোটি মানুষকেই ভুগতে হবে দীর্ঘ সময়ের জন্য।।