Home » অর্থনীতি » তিস্তায় পানি নেই ॥ মমতার আশ্বাসেই আস্থা

তিস্তায় পানি নেই ॥ মমতার আশ্বাসেই আস্থা

. ইনামুল হক

LAST 2ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ১৯ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ সফরে এলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী ফিরে গেলেন। তাঁর এই সফর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের আমন্ত্রণক্রমে হয়েছে। মমতা ঐ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ৪০ সদস্যের একটি টীম নিয়ে ঢাকা আসেন। ২১ ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে তাঁর এই সফরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, বিধানসভার সদস্য, লেখক, গায়ক, নায়কনায়িকা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। সরকারী আমন্ত্রণ হলেও তিনি কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার ক্ষমতা নিয়ে আসেননি বিধায় তাঁর এই ভ্রমণ অনেকটা আনন্দযাত্রা ছিলো। তাই তিনি যেন ‘এলেন এবং দলবলসহ বেড়িয়ে’ চলে গেলেন।

মমতা ব্যানার্জি ২০ ফেব্রুয়ারী সোনারগাঁও হোটেলে ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এক ‘বৈঠকী বাংলা’ বা মতবিনিময় সভা করেন। এই সভায় তিনি তিস্তা পানি বন্টন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না বলেন। তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কাঠবিড়ালি হয়ে সেতুবন্ধনের কাজ করার অঙ্গীকার করেন। স্থল সীমান্ত চুক্তির সমস্যা দূর করতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারী তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন। মমতা শেখ হাসিনার কাছে ইলিশ মাছ রফতানীর বাধা তুলে দিতে বললে শেখ হাসিনা বলেন, তিস্তার পানি পেলে ইলিশ মাছও যাবে।

উল্লেখ্য যে, বিগত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ দু’দিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জীরও আসার কথা ছিলো, কিন্তু তিনি আসেননি এবং তাঁর না আসার কারণেই তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি হয়নি এমন একটা ধারণা দিল্লির পক্ষ থেকে দেয়া হয়। এই চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কাম্য এবং প্রয়োজনীয় ছিলো। যদিও হাসিনা মনমোহন শীর্ষ বৈঠক শেষে ৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস বলেন, ‘তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি চূড়ান্ত হয়েই আছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তার অবস্থান থেকে এক বিন্দুও ছাড় দেবে না। তবে বিষয়টি তত সহজ ছিলো না। তিস্তা নদীর পানি চুক্তির সাথে যে সকল বিষয় জড়িত, যে সকল বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করেছিল বলে মনে হয় না যেমন, গজলডোবা পয়েন্টে ক্রমহ্রাসমান পানি প্রবাহ, কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনায় এর সম্পৃক্ততা এবং উত্তর বঙ্গের ছয়টি জেলায় বিস্তৃত তিস্তা সেচ প্রকল্পে পানির প্রয়োজনীয়তা। মমতা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সাথে একটি ‘লোক দেখানো’ চুক্তি করতে উদ্যোগী বলে অভিযোগ করছিলেন।

ঢাকার দৈনিক পত্রিকা দি ডেইলী স্টার ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১১ যৌথ নদী কমিশনে বাংলাদেশ ডেলিগেশনের এক সদস্যের বরাত দিয়ে বলে, তিস্তা নদীতে ২০ শতাংশ পানি রেখে বাকীটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫২৪৮ শতাংশ হারে বন্টন করা হবে। কিন্তু একই সাথে দি ডেইলী স্টার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মশিউর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখে, ’আসলে তিস্তার পানি কি পরিমাণ প্রবাহিত হচ্ছে তাইই নির্ণয় হয়নি। বিশেষজ্ঞরা আগামী ১৭ বছর ধরে তা’ পরিমাপ করবেন, তারপর চুক্তি সই হবে।’ কিন্তু মমতা আসেননি, চুক্তিও হয়নি।

তিস্তা নদীতে এবারও শীতকালে (২০১৫) পানি এলো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যখন মমতার সাথে কথা হচ্ছে তখন বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের উজানে ডালিয়া পয়েন্টে এবার তিস্তার তলানি প্রবাহ এসেছে ৩০০ কিউসেকেরও মত। এর ফলে ১০ হাজার কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন তিস্তা সেচ খালে পানি দেয়া যাচ্ছে না। তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতে নদীতে পানি নেই। তাই ডালিয়া থেকে কাউনিয়া রেল সেতু হয়ে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তা নদীর বালির তলা থেকে বেরিয়ে আসা ১০০ থেকে ২০০ কিউসেক পানিই কেবল বয়ে যায়। অথচ এই নদীতে একসময় শীতে গড়ে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ হতো। ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চ এলে এই প্রবাহ বেড়ে যেতো, কারণ, তখন হিমালয়ের হিমবাহগুলি গলে এই নদীগুলিতে নেমে আসতো। হিমালয় থেকে নেমে আসা অনেক উপনদীর বরফগলিত পানি পেয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ তাই বসন্ত এলেই ক্রমশঃ প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে বাড়বাড়ন্ত হতে থাকতো।

১৩ অক্টোবর, ২০১০ ‘তিস্তা চুক্তি ও তৃষ্ণার্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে সজল জাহিদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপাত্ত নিয়ে দেখিয়েছেন, ১৯৭৮৭৯ সালে বাংলাদেশে তিস্তার ন্যূনতম প্রবাহ ছিলো প্রায় ১৪ হাজার কিউসেক। ১৯৭৯৮০ থেকে ১৯৯৪৯৫ পর্যন্ত এই প্রবাহ নেমে আসে গড়ে ৫,৫০০ কিউসেক। তবে ভারত ১৯৮৭ সালে গজলডোবা ব্যারেজ চালু করে পানি প্রত্যাহার করলে ১৯৮৭৮৮ সালে এই প্রবাহ নেমে দাড়ায় ২,৫০০ কিউসেক। ১৯৯৫৯৬ সাল থেকে এই প্রবাহ নেমে গড়ে ১২০০ কিউসেক হয়, এমনকি ২০০৫ সালের পর থেকে ৫০০ কিউসেক হয়ে যায়। বাস্তব পরিস্থিতি এই যে, ভারত তিস্তা নদীর পুরো প্রবাহই গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশের দিকে কোন পানিই ছাড়া হচ্ছে না। যা’ আসছে তা’ নদীর বালির তলা থেকে বেরিয়ে আসছে।

তিস্তা নদীতে পানি কমে যাচ্ছে, কারণ ১) সিকিম তার রাজ্যে ৫০টিরও অধিক ড্যাম নির্মাণ করে শীতকালীন প্রবাহ আটকিয়ে রাখছে। ২) গজলডোবা ব্যারেজ থেকে পানি তিস্তা মহানন্দা খাল দিয়ে বিহারের মেচী নদীতে নেয়া হচ্ছে। যার ফলে দিল্লীর আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে বাংলাকে মরুভূমি করে থর মরুভূমিকে সুজলা সুফলা করা হবে। দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলের পানি ও খনিজ সম্পদ লুটে নেবার জন্যে অনেক ষড়যন্ত্র চলছে। এই অঞ্চলের স্বার্থরক্ষার জন্যে মওলানা ভাসানীর মতো একজন নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, Email: aamjanatardal@gmail.com