Home » অর্থনীতি » বাড়ছে দারিদ্র্য ॥ মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে

বাড়ছে দারিদ্র্য ॥ মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

DIS 5বাংলাদেশে গত দুই দশকে গড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষের আয় এখনো দৈনিক আড়াই ডলারের কম যা সরকারের অগ্রগতির দাবিকে ম্লান করে। অর্থের অঙ্কে মাথাপিছু আয় বাড়লেও মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তালমিলেয়ে বাড়েনি ব্যক্তির আয়। তবে এ কথা সত্য, কিছু ব্যক্তির আয় বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ফলে রাস্তায় বিলাসবহুল গাড়ি, শহরে নতুন মাল্টিপ্লেক্স বা উচ্চ অট্টালিকা এসব দৃশ্যের বিস্তার ঘটলেও অধিকাংশ মানুষ এখনো নিম্ন আয়ের বেড়াজালে আটকে আছে। বাংলাদেশ সরকার ১ ডলার মাথাপিছু আয় ধরে দারিদ্র পরিমাপ করলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দারিদ্র হিসেবে মাথাপিছু ১ দশমিক ২৫ ডলার হিসাব করা হয় এবং উন্নত দেশে এটি আড়াই ডলার হিসেবে ধরা হয়। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এখনো নিম্ন আয়ের মধ্যে আটকে আছে দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ, যা ১২ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ। যাদের দৈনিক ক্রয়ক্ষমতা ২ দশমিক ৫০ ডলার বা ২০০ টাকার নিচে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল সুফলভোগী ধনীরা। ধনীরা দ্রুতগতিতে সম্পদ বাড়াচ্ছে, ফলে আয়বৈষম্য বেড়েই চলেছে। আর দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠি কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে। চলতি (২০১৪১৫) অর্থবছরে দেশের উচ্চবিত্তদের একটি হিসাব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানেও দেখা যায়, দেশের মোট সম্পদের বেশির ভাগের মালিক মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মানুষ। তাদের বার্ষিক আয় ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার উপর। এসব ব্যক্তির সম্পদ আছে কোটি টাকার বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই আবার শত কোটি থেকে সহস্রাধিক কোটি টাকার মালিক। হিসাবটি করা হয়েছে আয়কর জমার বিবরণী থেকে। ধারণা করা যায় এতে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কেউ সম্পদের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। সবাই রেখে ঢেকে তারপর সম্পদ বিবরণী জমা দেয়। অনেকে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে সম্পদ কম করে দেখায়। তারপরও দেশের অধিকাংশ সম্পদ ধনী শ্রেণীর হাতে বন্ধি। প্রকৃত অর্থে সম্পদের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এরাই দেশের অর্থনীতির মূল সুবিধাভোগী। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে সব সুবিধা কাজে লাগিয়ে সম্পদ সৃষ্টি করছে ধনী শ্রেণী। কারণ সরকারের সুবিধা ভোগ করার মতো সব ধরনের ক্ষমতা তাদেরই রয়েছে। এটাই তাদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে একটি শ্রেণী দ্রুত অর্থ তৈরি করেছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। দারিদ্রের সম্পদ লুটে ধনী হয়েছে অনেকে। ফলে সমাজে ব্যাপক আয়বেষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু এ সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বাস্তবের তুলনায় কম। কারণ অতি ধনীরা তথ্য দেয় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে উচ্চবিত্তরা ও ধনীরা বেশি লাভবান হচ্ছে।

১৯৭০ সালের পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা বলা হতো, যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানের শিল্পবাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ওই ২২ পরিবারের মধ্যে দুটো পরিবার ছিল পূর্বপাকিস্তানের, তাও একটি ছিল অবাঙালি। বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের জন্যই বাংলাদেশীরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এসে সে বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশেই ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক ২৩ হাজার ২১২ জন কোটিপতি ছিল। ২০১৪ সালে ওই সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে। এটি সম্পদ লুকানোর পরের তথ্য অর্থাৎ ব্যাংক থেকে সংগ্রহিত। যারা বিদেশের ব্যাংকে অর্থ রাখছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সম্পদের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক বা এনবিআরের কাছে নেই। এটি হিসাবে নিলে ধনীদের সংখ্যা আরো বেশি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোটিপতির এ প্রবৃদ্ধিকে সাফল্য মনে করতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যাওয়ার বিপদ সংকেত পাওয়া যাচ্ছে, সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা নিশ্চুপ, বরং তারা ধনীদের লুটপাটের বা সম্পদ তৈরিরই সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকারি হিসাবে প্রতিবছর দরিদ্র্যের হার কমেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশে দরিদ্র জনগণের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি দারিদ্র্যের হার নির্ণয় পদ্ধতিতেই রয়েছে গলদ। যাদের আয় দৈনিক ১ ডলারের নিচে তাদের চরম দরিদ্র হিসেবে ধরা হয় বাংলাদেশে। অথচ এ সময়ে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। জাতিসংঘ পর্যন্ত এখন ডলারের হিসাবে নয়, মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণকে দারিদ্র পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচনা করছে। বলা হচ্ছে, এ হিসাব অনুযায়ী দেশে ৩৬ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কিন্তু এ হিসেবেও প্রকৃত সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি হবে।

উল্লেখ্য, বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে ১ ডলার দিয়ে একজন মানুষ তার দৈনিক চাহিদা মেটাতে পারছে না। যারা এক ডলারের হিসাবে তুষ্ট আছে তারা মিলিয়ে দিতে পারবে না এ হিসাব। ১ ডলার বাংলাদেশী ৭৭ টাকা। বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন ব্যক্তি এ টাকা দিয়ে দু’বেলা খাবারেরই চাহিদা মেটাতে পারেন না। যেখানে ১ কেজি মোটা চালের দাম সর্বনিম্ন ৪০ টাকা। আর খাদ্য ছাড়াও রয়েছে বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের বিষয়। অপরদিকে মাথাপিছু আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত আয় না বেড়ে, বরং কমেছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ।

চরম দারিদ্র’ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা হলো, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর দরিদ্র্য সীমার গড়ের আপেক্ষিক দারিদ্র্যমাত্রা, যা কম। অর্থাৎ দৈনিক আয় ১ দশমিক ২৫ ডলারের উপরে উঠার অর্থ দারিদ্র্যমুক্তি নয়। বরং সেটা হলো আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দরিদ্রের অবস্থায় যাওয়া। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলার মানদে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৪ শতাংশ দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে পারলে তখন তা সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হবে বিরাট ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু সেটা অর্জন করতে সক্ষম হলে পরেও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের দৈনিক আয় থাকবে ৪ ডলারের কম। অপরদিকে বর্তমান সরকারের তরফ থেকে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৫ ডলারের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে; সেটি আসলে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ছাড়া কিছুই নয়।

সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নেমে এলেও বাংলাদেশে গত এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি খানিকটা বেড়েছে। এর কারণ হিসাবে হরতালঅবরোধে দেশে পণ্য পরিবহনে সমস্যার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসভিত্তিক) বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ০৪ শতাংশে। ডিসেম্বরে এ হার ছিল ৬ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে সমস্যা হওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ০৭ শতাংশ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ০১ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে অর্থ্যাৎ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই হার ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে এ মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। ইউরোপে মূল্যস্ফীতি শুন্যের কোঠায়। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের নিচে বলে জানা গেছে। এতে দারিদ্র সীমার নিচে নেমে গেছে আরো অনেকে। রাজনৈতিক অস্থিতিরতার কারণে দিন আনে দিন খায় মানুষের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গীন। গ্রামে কাজ নেই বললে চলে। রাজধানী মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামের পরিবেশ অত্যন্ত ভীতিকর বলে খবর মিলছে। দোকান ব্যবসাও বন্ধ হওয়ার পথে। দূর পাল্লার গাড়ি চলাচল পুরোদমে করতে না পারায় পরিবহন শ্রমিকরাও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। রাজনৈতিক সহিংসতার আড়ালে যা চাপা পড়ছে। কৃষকরা পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। অন্যদিকে শহরের মানুষ অধিক দামে কিনছেন পণ্য। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি। শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চাকুরি হারানোর শঙ্কা জেঁকে বসেছে শ্রমিকদের মধ্যে। গার্মেন্টস খাতে এরই মধ্যে শ্রমিক ছাটাই শুরু হয়েছে বলেও খবর আসছে। আগামীতে এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বেড়ে যাবে সামাজিক অস্থিতিরতা।