Home » অর্থনীতি » চীনের ব্যাংকে বৃটেন :: ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র

চীনের ব্যাংকে বৃটেন :: ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র

জিওফ দায়ের, ফিন্যান্সশিয়াল টাইমস, লন্ডন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 4বেইজিংয়ের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) প্রশ্নে আমেরিকান ব্রিটিশ বিরোধটি আসলে ২১ শতকের বৈশ্বিক অর্থনীতি বিধিবিধান কে লিখবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার প্রাথমিক অধ্যায়গুলোর একটি। চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে প্রস্তাবিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবি ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকার প্রেক্ষাপটে এআইআইবি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের প্রতি ওবামা প্রশাসন ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা পেতে যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখনই ব্রিটেন জি৭ভুক্ত প্রথম দেশ হিসেবে এআইআইবিএ যোগ দিতে যাচ্ছে। এর ফলে চীনা নেতৃত্বাধীন ব্যাংকটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে।

নতুন এশিয়ান ব্যাংকটি নতুন প্রজন্মের আর্থিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির চীনা উচ্চাভিলাষের অংশবিশেষ যা দেশটিকে এশিয়াপ্যাসিফিক অঞ্চলে এবং সেইসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য অংশেও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব এনে দিতে পারে। ‘এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে শাসন, নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা যা এশিয়ার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে পরিচালনা করবে,’ জানিয়েছেন ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো ইলি রাতনার। এআইআইবি ছাড়াও চীন গত বছর ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনেও প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। গত বছর চালু হওয়া ব্যাংকটি মধ্য এশিয়াকে চীনের সাথে সংযোগকারী সিল্করোড ফান্ডে ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের কথা ঘোষণা করেছে।

চীনা নতুন উদ্যোগগুলো সবই আর্থিক শূন্যতা তথা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো প্রয়োজন মেটানোর জন্য। ম্যানিলাভিত্তিক এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের, এআইআইবির অন্যতম প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বি, হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য আগামী দশকে আট ট্রিলিয়ন ডলার অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এই ব্যাংক দুটি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) মতো ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরাসরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিষ্ঠাকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এর উপরে প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে।

এশিয়া অঞ্চলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরও অর্থনৈতিক গতি সৃষ্টিমূলক নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যটি হলো ট্রান্সপ্যাসিফিক পার্টনারশিপ। ১২ জাতির এই বাণিজ্যিক চুক্তিটি নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে। পৃথক বাণিজ্যিক চুক্তি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর আমেরিকান কৌশল নিয়ে ইইউ’র সাথে আলোচনা করছে নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বিধিবিধান প্রতিষ্ঠার জন্য, যাতে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং পরিবেশগত সুরক্ষায় আরো উচ্চতর মানদপ্রতিষ্ঠা করা যায়। এর প্রতিটি ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা আলাদা স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারে চীনা পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়ুন সানের মতে, এআইআইবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে চীন এর মধ্যেই বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কর্মকর্তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, নতুন ব্যাংকটি তহবিল ছাড়ের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কম আমলাতান্ত্রিক হবে, তবে তারা এটাও বুঝতে পেরেছেন যে অন্যান্য ব্যাংকের কঠোর শর্তাবলী আরোপের কারণ হলো বাজে পরামর্শের ঋণ প্রতিরোধ এবং শক্ত ঋণ রেটিং বজায় রাখা। তিনি আরো বলেন, চীন যাতে ‘চীনের অর্থনৈতিক এজেন্ডা, বিশেষ করে চীনা পণ্য ও সেবা রফতানি বাড়াতে’ ব্যাংকটির ঋণ ব্যবহার করে, সেজন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট গ্রুপ থেকে চাপে রয়েছে। তবে চীনা পররাষ্ট্রনীতি কৌশলবিদেরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, ব্যাংকটির ‘উচিত হবে চীনের কৌশলগত স্বার্থ সমর্থন’ করা যাতে যেসব দেশ চীনের প্রতি বৈরী, সেগুলো কম সুবিধা পায়।

যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের সময় ওয়ারশ প্যাক্টের সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্লকের মোকাবিলা করেছিল। অবশ্য, চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রকেএমন পরাশক্তি যার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখে তাদের সাথে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করার সামর্থ্য রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থায় চ্যালেঞ্জ জানাতে চাচ্ছে।

এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও ভারত অন্তর্ভুক্ত থাকলেও চীন ব্যাংকটিতে যোগদানের জন্য অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে (যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র) টানার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই দুই দেশ এখনো প্রত্যাখ্যান করলেও ব্রিটিশ সিদ্ধান্ত সম্ভবত ইস্যুটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে।

রাতনার বলেন, ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সমস্যা হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র নিজেও যদি এতে যোগ না দেয়, তবুও তা নতুন প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করা ওয়াশিংটনের জন্য পর্যাপ্ত হবে না, বিশেষ করে যখন পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।’

কয়েকজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন যে, প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের সাথে এই নতুন প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রও নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বৈশ্বিক পরিচালনায় চীনকে ‘আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা’ পালনের জন্য বছরের পর বছর আহ্বান জানিয়ে প্রশাসন আইএমএফের কোটা সংস্কারকে সমর্থন করেছে, যাতে চীনকে বৃহত্তর ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে। তবে প্রস্তাবটি কংগ্রেসে ঝুলে আছে। নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়তে এগিয়ে আসার চীনা আকাক্সক্ষার মধ্যে দেশটির এই উপলব্ধি ফুটে ওঠেছে যে, বিরাজমান ব্যবস্থায় তার জন্য দরজা বন্ধ রয়েছে।।