Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৯)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৯)

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সূচনাকাল

আনু মুহাম্মদ

last 3উনিশ শতকের শুরুতেই ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন চীন সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিলেন এভাবে, ‘চীনের ঘুমিয়ে থাকাই ভালো। কারণ এই দেশ জেগে উঠলে সারা দুনিয়া তোলপাড় করবে।’ বস্তুত বিশ শতকের শুরু থেকেই নতুনভাবে চীনের বিশাল জনগোষ্ঠীর ‘জেগে উঠা’র বিভিন্ন ধাপ তৈরি হয়। কৃষিপ্রধান বিস্তীর্ণ একটি অঞ্চলে, যার বহু এলাকা দুর্গম, একদিকে সামন্তপ্রভু অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন শক্তির ক্রমবর্ধমান দাপটের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন এবং তার দ্রুত বিকাশ বিস্ময়কর মনে হবেই। এই পার্টির যথাযথ ভূমিকার কারণে দ্রুতগতিতে চীনের রাজনৈতিক মানচিত্রে বিপ্লবী শক্তির বিকাশ ঘটতে থাকে।

১৯২০ এর দিকে চীনে ও চীনের বাইরে সমাজতন্ত্রী চিন্তা নিয়ে অনেকগুলো সক্রিয় গ্রুপের কার্যক্রম দেখা যায়। এরকম অনেকগুলো গ্রুপের প্রথম সম্মিলিত কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের জুলাই মাসে। পার্টি গঠনে এই উদ্যোগের পেছনে তৃতীয় আন্তর্জাতিক (১৯১৯১৯৪৩) বা কমিনটার্ণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করেন যেসব গ্রুপ, তাদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন: পিকিংএ লি তাচাও, ক্যান্টনে চেন তুসিউ, হুনানে মাও, শানতুঙ এ হুপেই। সাংহাইতে এই কংগ্রেস শুরু হয়, এটি স্থানান্তরিত হয় জিয়াক্সিনএর সাউথ লেকএ। নিরাপদ স্থান না পাওয়ায় লেকের ওপর ভাসমান নৌকাতেই কংগ্রেসের সফল সমাপ্তি ঘটে। সকল গ্রুপের ভিন্ন ভিন্ন নাম ও অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে জন্ম নেয় চীন কমিউনিস্ট পার্টি।

মাও সে তুং (১৮৯৩১৯৭৬) এর সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক তাই প্রথম থেকেই। তাঁর কৈশোর ও বেড়ে ওঠার কাল ছিলো চীনের নতুন চিন্তা ও সংগঠনের অভ্যুদয়কাল। ১৯১১ সালে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে বিভিন্ন অঞ্চলে শোষণ, নির্যাতন, প্রতিরোধ, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তপ্রভু বিরোধী লড়াইএর ঘটনাপ্রবাহ এবং সমাজে চিন্তাভাবনার গতি খুব দ্রুত মাওকে পরিণত চিন্তা ও সক্রিয় সাংগঠনিক ব্যক্তিত্বে উন্নীত করে। মুক্তির চিন্তা ও মুক্তির লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আগ্রহ তাঁর জীবনের গতি নির্ধারণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর সীমিতই ছিলো। বস্তুত স্বশিক্ষাই তাঁকে তৈরি করেছে। লাইব্রেরীতে নিয়মিত যাতায়াত ও পড়াশোনা, সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করা এবং বিদ্যাজগতে নতুন নতুন চিন্তার সাথে পরিচয় তাঁর জীবনের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মার্কসীয় সাহিত্যের সাথে তাঁর পরিচয় ১৯২০ সালে। তার আগেই তিনি কৃষক, ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। লাইব্রেরীতেই তাঁর যোগাযোগ হয় কমিউনিস্ট চিন্তা নিয়ে সক্রিয় ব্যক্তিবর্গের সাথে, যারা তখন বিভিন্ন পাঠচক্র ও গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করতেন। ‘সমাজতান্ত্রিক যুব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠনের হুনান শাখা সংগঠিত করেন মাও ১৯২০ সালে। তাঁর সাথে ছিলেন লিউ শাও চী। ১৯২১ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর পার্টি কার্যক্রম।

কমিনটার্ণের তত্ত্বাবধানে পার্টি লেনিনীয় ধারায় পুনর্গঠিত হয় ১৯২৩ সালে। তবে বিভিন্ন কারণে কমিনটার্ণে এই পার্টি সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিলো না। প্রতিষ্ঠাকালের কিছু পরেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে কর্মকৌশল নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। কমিনটার্ণের তদারকী ও তার ওপর নির্ভরশীলতা নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এর আগের বছর ১৯২২ সালে জরুরীভাবে আহুত কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামে প্রস্তাব তোলা হয় যে, পার্টি সদস্যরা জাতীয়তাবাদী কুওমিনটাং পার্টিতে যোগদান করুক। কেননা এটি জনগণের মধ্যে অনেক বেশি বিস্তৃত, জনপ্রিয়। ভেতর থেকে একে পরিবর্তিত করা সহজ হবে। এই একই লাইন আমাদের অঞ্চলেও আমরা দেখেছি, দেখেছি তার পরিণতিও। এই লাইনেই অনেকে ভারতের কংগ্রেসে, পূর্ব বাঙলায় আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কাজ করেছেন। প্রায় সকলেই এই কৌশলগত কাজ করতে করতে নিজেরাই দ্রবীভূত হয়েছেন।

তবে চীনে শুরু একইরকম হলেও পরে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। চীনে পার্টির মধ্যে এই বিতর্কে তিনটি ধারা ছিলো। একটির মত ছিলো কুওমিনটাং পার্টির সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা যাবে না, কোন যুক্তফ্রন্ট করা যাবে না। আরেকটি ধারার মত ছিলো, এই কুওমিনটাং পার্টির সাথে মিশে যেতে হবে। তৃতীয় মতটিই গৃহীত হয় যেখানে বলা হয়, নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে ঐ পার্টিতে কমিউনিস্টরা কাজ করবে এবং নিজ শর্ত অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট গঠন করবে।

এই ঐক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুওমিনটাং পার্টিও কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েই কমিউনিস্টদের সাথে কাজ করেছে। এই পার্টির মধ্যেও কমিউনিস্টদের সাথে কাজ করবার ব্যাপারে ভিন্নমত ছিলো। সান ইয়াৎ সেন এই ঐক্যের বিষয়ে বরাবর আগ্রহী ছিলেন, তিনি কমিউনিস্টদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল ছিলেন, নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করতেন। কমিউনিস্টদের একইসঙ্গে দুই পার্টির সদস্যপদ রক্ষার ব্যাপারে তাঁর কোন আপত্তি ছিলো না। অনেকে ছিলেনও। লুকোচুরি, পরিচয় গোপন রাখার কোন ব্যাপার ছিলো না। ১৯২৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করবার পর কমিউনিস্ট বিদ্বেষীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। চিয়াং কাই শেক কমিউনিস্ট বিরোধীদের মধ্যে সবচাইতে সরব ছিলেন।

আভ্যন্তরীণ বিরোধ সত্ত্বেও কুওমিনটাং ও কমিউনিস্ট পার্টির যুক্তফ্রন্ট নেতৃত্ব সফলভাবে উত্তর অভিযান সম্পন্ন করে এবং বেশ কিছু অঞ্চল সমরপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে। এই অভিযান সমাপ্তির পর দুই পার্টির মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নিজ স্বাতন্ত্র্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে দৃঢ় থাকায় কুওমিনটাং পার্টির সাথে সম্পর্কে ওঠানামা হয়েছে, বৈরী অবস্থানও তৈরি হয়েছে তবে ঠিকই বিকশিত হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। এর মধ্যে চীন কমিউনিস্ট পার্টি বেশ কয়েকটি মুক্ত অঞ্চল গঠন করতে সক্ষম হয় যেগুলোকে তারা অভিহিত করতো ‘সোভিয়েত অঞ্চল’ বলে। এর মধ্যে বৃহত্তম অঞ্চলটির নেতৃত্বে ছিলেন মাও সে তুং ও চু তে।।