Home » আন্তর্জাতিক » দেশে দেশে গণতন্ত্র বিনাশে হত্যা-নিমর্মতা (তৃতীয় পর্ব)

দেশে দেশে গণতন্ত্র বিনাশে হত্যা-নিমর্মতা (তৃতীয় পর্ব)

জোর করে ক্ষমতা দখল ॥ ৪৩ বছরের পারিবারিক শাসন

Last-5দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে ওলোটপালোট করে দিয়েছে। বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে একদিকে দেশে দেশে যেমন গণতন্ত্রের লড়াইসংগ্রাম জোরদার হয়েছে, ঠিক তার উল্টো দিকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে কখনো সামরিক শাসন, আবার কখনো অগণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়েছে। আর এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব দেশের হাজারও, লক্ষ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা উইলিয়াম ব্লাম তার ‘কিলিং হোপ’ বইয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের। এর কয়েকটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

নিকারাগুয়া ১৯৮১ ৯০

১৯৩৩ সালে শেষবারের মতো নিকারাগুয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী নিজেদের চিহৃ হিসেবে জনৈক আনাস্টিও সামোজার অধীনে ন্যাশনাল গার্ড নামক একটি বাহিনী রেখে যায়। এর তিন বছরের মাথায় সামোজা দেশটির প্রেসিডেন্টের পদ দখল করে নিয়ে ন্যাশনাল গার্ডকে কাজে লাগিয়ে নিকারাগুয়ায় এক পারিবারিক শাসন কায়েম করেন।পরবর্তী ৪৩টি বছর নিকারাগুয়া এ পরিবারটির অধীনেই তাদের খাসতালুক হিসেবে শাসিত হয়। বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ গার্ড বাহিনীর সদস্যরা দেশটিতে সামরিক শাসন জারি রাখাসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যালীলা চালিয়েছে। তারা কৃষক হত্যার পাশাপাশি ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং চোরাকারবারীর সঙ্গেও জড়িত থেকেছে। এছাড়া বেশ্যালয় পরিচালনাসহ সরকারি বিভিন্ন কর্মকান্ডেও তাদের ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে নিকারাগুয়ার অধিকাংশ জমি এবং ব্যবসায় ছিল সামোজা পরিবারের হাতে। ১৯৭৯ সালের জুলাইয়ে স্যান্ডানিস্টাদের দ্বারা উৎখাত হয়ে দ্বিতীয় আনাস্টিও সামোজা যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। এ সময় দেশটির দুইতৃতীয়াংশ মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ছিল ৩শ’ মার্কিন ডলারের কম। মিয়ামিতে পৌছেই সামোজা জানিয়েছিলেন, তার সম্পদের পরিমাণ একশ কোটি ডলার। তবে মার্কিন এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে সম্পদের এ পরিমাণ ৯শ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছিল।

নিকারাগুয়ার নতুন নেতৃত্বের জন্য এটা অনেকটা সৌভাগ্যের ব্যাপারই ছিল যে, তারা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন হোয়াইট হাউসে আসীন ছিলেন জিমি কার্টার। ক্ষমতায় আসার প্রথম দেড় বছর পর্যন্ত তারা গরিব একটি দেশকে তাদের পরিকল্পনামাফিক পুর্নগঠনের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এরপরই তাদের ওপর নেমে আসে রিগ্যান প্রশাসনের লাগাতার শত্রুতার খড়গ। তাই বলে অবশ্য এটা বলার সুযোগ নেই যে, কার্টার স্যান্ডানিস্টাদের বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

১৯৭৮ সালে সামোজা জমানার শেষ দিকে কার্টার নিকারাগুয়ায় সংবাদ মাধ্যম এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর সিআইএ’র গোপন হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে অনুমোদন দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য স্যান্ডানিস্টাদের জায়গায় বিকল্প একটি নরমপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানো। একই উদ্দেশ্যে মার্কিন কূটনীতিকরাও সামোজার দলকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ন্যাশনাল গার্ডসহ সামোজার দুর্নীতির কাঠামোটিকে একটু এদিকসেদিক করে বস্তুত অটুট রেখে দেয়ার কথাই বুঝিয়েছে। ওই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড (ল্যাটিন আমেরিকা) প্রধান লে. জে. ডেনিস ম্যাক অলিফ জানিয়ে দেন, সামোজাকে ক্ষমতা থেকে সরে দাড়াতে হলেও যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ অনুমোদন করবে না যা ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীকে ছত্রখান করে দেয়। তার এ বক্তব্যে ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর প্রতি অধিকাংশ নিকারাগুয়াবাসীর মনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ও ঘৃণাকে বিবেচনায় না নেয়ার বিষয়টি স্পষ্টই ধরা পড়েছে।

স্যান্ডানিস্টরা ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের বিরোধী পক্ষকে সিআইএ কর্তৃক অর্থ ও সাহায্যসহযোগিতা প্রদানের বিষয়টি কার্টার অনুমোদন করেন। একই সময় নতুন কিছু ব্যক্তিকে সরকারে অন্তর্ভুক্তির জন্য ওয়াশিংটন স্যান্ডানিস্টাদের ওপর চাপও প্রয়োগ করে। তবে এ কৌশলটি ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও কার্টার প্রশাসন নিকারাগুয়াকে সাহায্য প্রদানের ব্যাপারটি বাতিল করেনি। পরবর্তীকালে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রোনাল্ড রিগ্যান মন্তব্য করেছিলেন, ‘মার্কিন জনগণের ঔদার্য এবং বিশ্বাস নিয়ে কারো মনে কি কোনো সংশয় থাকা উচিত’? তবে প্রেসিডেন্ট যে বিষয়গুলো উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন সেগুলো হলো এক, নিকারাগুয়াকে দেয়া মার্কিন সাহায্যের প্রায় সবটাই গেছে বেসরকারি সংস্থা এবং ব্যক্তিগত খাতে। এদের মধ্যে সিআইএ’র দীর্ঘদিনের সহযোগী সংগঠন আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি লেবার ডেভেলপমেন্টের মতো সংস্থাও ছিল। দুই, সাহায্য প্রদানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল তথাকথিত নরমপন্থী বিরোধীদের শক্তিশালী এবং নিকারাগুয়ায় সমাজতান্ত্রিক শিবিরভুক্ত দেশগুলোর প্রভাব ক্ষুণœ করা। তিন, নিকারাগুয়া সরকার বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাদের প্রয়োজনীয় সামরিক সাহায্য প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছিল। আর পরাজিত ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীর সদস্য এবং সামোজার বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী তখনো পর্যন্ত অন্তর্হিত হয়ে যায়নি। তারা বরং ‘কন্ট্রা’ নামে নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বের আসনে চলে আসে।

১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে রিপাবলিকান রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে তার প্রশাসন ঘোষণা দেয়, নিকারাগুয়ায় মার্কসবাদী স্যান্ডানিস্টাদের ক্ষমতা গ্রহণের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্যান্ডানিস্টাদের বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রেসিডেন্ট অতি দ্রুতই তাদের প্রদেয় সব ধরনের সহযোগিতা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। মার্কিন তিমিটি তখনো পর্যন্ত ক্যারিবীয় অঞ্চলের পোনা মাছটিকে ভয় পাচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিকারাগুয়ার বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নিকারাগুয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সব ধরনের কর্মসূচির বাইরে রাখা। এ কর্মসূচির আওতায় মার্কিন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটে থাকে। নিকারাগুয়া থেকে চিনি আমদানি ৯০ ভাগ কমিয়ে দেয়া হয়। ওয়াশিংটন নিকারাগুয়াকে ঋণ না দিতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), ইন্টার আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপীয় কমন মার্কেটের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।

সে যাই হোক, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত নিকারাগুয়ার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের জন্য ৬০ লাখ ডলার প্রদানের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু নিকারাগুয়ার স্যান্ডানিস্টা সরকার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানি উদ্ধৃত করে বলে যে, এই অর্থ প্রদানের পেছনে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ওয়াশিংটন নিকারাগুয়ার বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধাচরণ ও একে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই এই অর্থ ব্যবহার করতে চেয়েছে। তবে রিগ্যান প্রশাসন তাতে থেমে থাকেনি। কার্ডিনাল মিগ্যুয়ের এবং নিকারাগুয়ার ক্যাথলিক চার্চ ১৯৮৫ পর্যন্ত সিআইএ’র কাছ থেকে গোপনে লাখ লাখ ডলার গ্রহণ করেছে।

নিকারাগুয়ার তেল সম্পদকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য জ্বালানি তেলের ডিপোতে দফায় দফায় আক্রমণ চালানো হয়। হন্ডুরাসে ঘাটি গাড়া কন্ট্রা এবং সিআইএ’র লোকেরা নিকারাগুয়ার তেলের পাইপ লাইন উড়িয়ে দিয়েছে। তারা তেল খালাস করার বন্দর সংলগ্ন জলসীমায় মাইন পুতে রেখেছে এবং তেলবাহী জাহাজ উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। তেলবাহী অন্তত সাতটি বিদেশী জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিকারাগুয়ার বন্দরসমূহ কার্যত সব সময়ই হামলার শিকারে পরিণত হয়েছে। কন্ট্রা বিদ্রোহী এবং সিআইএ’র আরেকটি লক্ষ্যবস্তু ছিল নিকারাগুয়ার কৃষি। তারা দেশটির তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, খাদ্য গুদাম, সেচ প্রকল্প, খামার বাড়ি এবং কৃষি যন্ত্রপাতির মজুদে হামলা চালিয়ে এগুলোর বিপুল ক্ষতিসাধন করেছে। উৎপাদিত পণ্য যাতে স্থানান্তরিত হতে না পারে সে জন্য রাস্তা, সেতু, বিভিন্ন পরিবহন যান ধ্বংস করে দিয়েছে।

১৯৮২ সালের অক্টোবরে স্ট্যান্ডার্ড ফ্রন্ট কোম্পানি ঘোষণা দেয় যে, তারা নিকারাগুয়ায় তাদের কলা চাষ ও প্রক্রিয়াকরণ কর্মসূচি বন্ধ করে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ফল রফতানির কাজও তারা স্থগিত করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই বহুজাতিক কোম্পানিটি একশ বছর ধরে নিকারাগুয়ায় ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছে। এতদসত্ত্বেও এবং সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বরখেলাপ করে অন্তত চার হাজার মানুষের জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়ে আকস্মিকভাবেই তারা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। এর ফলে সে সময় প্রায় ৬০ লাখ বাক্সভর্তি কলার রফতানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং সেগুলো বাজারজাত করাও সম্ভব হয়নি।

জ্বালানির অভাবে নিকারাগুয়ার মৎস্য আহরণকারী নৌকাগুলো ঠিক মতো চলাচল করতে পারছিল না। উপরন্তু এগুলো কন্ট্রাদের পেতে রাখা মাইনেরও শিকার হতো। মার্কিন অবরোধের কারণে নৌকাগুলোতে খুচরা যন্ত্রাংশেরও অভাব দেখা দেয়। ফলে দেশটির চিংড়ি রফতানিও মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

এটি ছিল নিকারাগুয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার এক যুদ্ধ। ১৯৮২ সালের দিকেই পাশের দেশ হন্ডুরাসে মার্কিন সৈন্যের সমাবেশ ঘটতে শুরু করে। আসতে থাকে বিপুল বিধ্বংসী কামান, যুদ্ধ বিমান। স্থাপিত হতে থাকে অবতরণ কেন্দ্র, রাডার স্টেশন, টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র ইত্যাদি। এসব কর্মকাণ্ড চলতে থাকে মার্কিন ও হন্ডুরাস সেনাবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানেই। অন্যদিকে হাজার হাজার কন্ট্রা বিদ্রোহীকে ফ্লোরিডা এবং ক্যালিফোর্নিয়া পাঠানো শুরু হয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য।

নিকারাগুয়ার অভ্যন্তরে যে সব লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ এবং অন্তর্ঘাতমূলক হামলা চালানো হতো হন্ডুরাস বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা বিমান দিয়ে আগে থেকেই সে সব স্থানের ছবি তুলে আনা হতো। বলা বাহুল্য, মার্কিন বৈমানিকরাই এসব বিমান চালিয়ে হন্ডুরাসের আকাশে উড়ে যেতেন। সাবেক একজন সিআইএ বিশ্লেষক বলেছেন, নিকারাগুয়ার অভ্যন্তরে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মানাগুয়ার কোনো একটি টয়লেটের ফ্লাস টানার শব্দ পর্যন্ত তাদের কানে চলে আসতো।

নিকারাগুয়ার অভ্যন্তরে সিআইএ’র তৎপরতার ওপর মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে হাজির হওয়া কয়েকজন কন্ট্রা বিদ্রোহী জানিয়েছিলেন, সিআইএ পরিচালিত কোনো কোনো হামলার দায়দায়িত্ব তাদের কাধে চাপিয়ে দেয়া হতো। এসব দায়িত্ব স্বীকার করে নেয়ার জন্য সিআইএ কর্মকর্তারা তাদের ওপর চাপ পর্যন্ত সৃষ্টি করতেন। তাছাড়া নিকারাগুয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালানোর জন্য সিআইএ হন্ডুরাসের সৈন্যদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। সিআইএ কর্তৃক প্রশিক্ষিত কন্ট্রারা নিকারাগুয়ার স্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমবায়ভিত্তিক কৃষি খামার এবং বিভিন্ন কমিউনিস্ট কেন্দ্রে হামলা চালাতেন। এগুলো ছিল নিকারাগুয়ার পল্লী অঞ্চলে স্যান্ডানিস্টা সরকারের সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচয়বাহী প্রতিষ্ঠান। হন্ডুরাসের সীমান্তবর্তী জিনোটেগা প্রদেশে কন্ট্রাদের আক্রমণের হাত থেকে বেচে যাওয়া এক ব্যক্তির জবানিতে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা কন্ট্রাদের নিষ্ঠুরতর বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, রোজার স্তন দুটি প্রথমে তারা কেটে ফেলে। এরপর তার বুক চিড়ে হৃৎপিণ্ডটা বের করে আনা হয়। পুরুষগুলোর হাতপা তারা ভেঙে চুরমার করে ফেলে। এরপর তাদের অন্ডকোষগুলো কেটে চোখগুলো উপড়ে ফেলা হয়। কারো কারো গলা কেটে ফেলা হয় এবং সেই কাটা অংশ দিয়ে তাদের জিহ্বা টেনে বের করে আনা হয়। ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে নিকারাগুয়ার সরকার জানায়, ১৯৮১ সাল থেকে শুরু করে কন্ট্রা বিদ্রোহীরা ৯১০ জন সরকারি কর্মকর্তা এবং আট হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটিকে সিআইএ জানিয়েছিল, কন্ট্রারা নিকারাগুয়ার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যাকান্ড চালাত। যে সব শিশু ও নারীকে হত্যা করা হতো অনেক সময় তাদের দেহগুলোও পুড়িয়ে ফেলতো কিংবা দেহ থেকে মস্তক আলাদা করে ফেলা হতো। এতদসত্ত্বেও আমেরিকার স্যান্ডানিস্টাবিরোধী প্রচারপ্রচারণা বেড়েই চলছিল। কোস্টারিয়ায় নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন, স্যান্ডানিস্টাদের অধীনে নিকারাগুয়া এক টুকরো পচা মাংসে পরিণত হয়েছে এবং পোকামাকড়রা এটির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। মধ্য আমেরিকা বিষয়ক কিসিঞ্জার কমিশন মন্তব্য করে, স্যান্ডানিস্টাদের শাসনাধীন নিকারাগুয়ার অবস্থা সামোজাশাসিত নিকারাগুয়ার চেয়েও খারাপ। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রিগ্যান বলেন, নিকারাগুয়ায় এখন সবংগ্রাসী একটি ড্রাগন ক্ষমতায় বসে আছে। আর নিকারাগুয়াবাসীর দূরবস্থা দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়েও ভয়াবহ। হেনরি কিসিঞ্জার মনে করতেন, স্যান্ডানিস্টরা জার্মান নাজিদের চেয়ে খারাপ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর স্যান্ডানিস্টাদের বিশ্ববাসীর সামনে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই তারা প্রচার করতে থাকে যে, নিকারাগুয়া বিভিন্ন দেশে মাদক রফতানি করছিল। স্যান্ডানিস্টরা সিনেটিক বিদ্বেষী এবং তারা ব্রাজিলীয় গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার হেইগ আগুনে পোড়া একটি মৃতদেহের ছবি দেখিয়ে সেটিকে নিকারাগুয়া সরকারের নিষ্ঠুরতম উদাহরণ হিসেবে দাবি করলেন। অথচ পরে জানা গেল, এটি ১৯৭৮ সালে সামোজার শাসনকাল তোলা একটি ছবি।

১৯৮৮৮৯ সালের দিকে নিকারাগুয়ায় যুদ্ধের প্রকোপ কমতে শুরু করলে ওয়াশিংটন ও সিআইএ তাদের স্যান্ডানিস্টাবিরোধী প্রচারণা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড আরও জোরদার করে এবং বলা চলে সফলও হয়। অবশেষে ১৯৯০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে স্যান্ডানিস্টরা ন্যাশনাল অপজিশন ইউনিয়ন নামক রাজনৈতিক জোটের কাছে পরাজিত হয়। প্রেসিডেন্ট বুশ (সিনিয়র) এটিকে গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সিনেটর রবার্ট ডোল এটিকে রিগ্যান নীতির সফল বাস্তবায়ন বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের ধারণা, দীর্ঘ ১০ বছরের যুদ্ধ নিকারাগুয়াবাসীর জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। তাদের ভয় ছিল স্যান্ডানিস্টরা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে কন্ট্রারাও ততোদিন তৎপরতা চালিয়ে যাবে। আর যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তারা তাই শান্তির অন্বেষায় ভোট দিয়েছে। ১৯৬৬ সালেও ডোমিনিকান রিপাবলিকের জনগণ মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিল।।