Home » অর্থনীতি » বিদ্যুৎ খাত :: রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে ঝুকিহীন লাভজনক ব্যবসা

বিদ্যুৎ খাত :: রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে ঝুকিহীন লাভজনক ব্যবসা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4২০০৯ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো যেখানে ২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১৪ সালে তা পৌঁছায় ৬ টাকা ২২ পয়সা, যা এখনো বিদ্যমান। এরই মধ্যে ২০১৫ সালে তোড়জোড় চলছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর। ২০০৯ সালে গ্রাহককে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য দিতে হতো ৩ টাকা ৮৩ পয়সা, ২০১৩ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। এ চাপ সামলাতে সরকার উপর্যুপরি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ এসেছে, তার উৎপাদন দাম পড়েছে গড়ে ইউনিট প্রতি আট থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। এখন এ দায়ভার জনগণের ওপর চাপানো হচ্ছে।

সরকার বলছে, উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে দাম বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গত এক বছরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়েনি, বরং অনেকাংশে কমেছে। বর্তমানে বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তো উৎপাদন বাড়ার কথা নয়। একই সাথে পিডিবি’র বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচও বাড়ার কথা না। ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো ও বন্ধ থাকা কেন্দ্র ভাড়া নেয়াসহ অনিয়ম ও ভুল নীতির কারণে উৎপাদনে চাপ বাড়ছে। দামের ওপর প্রভাব পড়ছে। লোকসানের বোঝা তৈরি হচ্ছে। এই বোঝা জনগণের মাথায় চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে লোকসানের এই বোঝা গরিব মানুষ ও কৃষকের ওপর চাপানো হচ্ছে। এমন সিদ্ধান্তের ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ও উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত। ধনীদের মধ্যে একটি শ্রেণী আছে যারা বিদ্যুতের মূল্য না দিয়ে তা ব্যবহার করে। তাদের না দেখে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে বাড়তি মূল্য চাপিয়ে দেয়া অনৈতিক। কম দামের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। উন্নয়ন হয়নি বিতরণ ব্যবস্থার। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা কম। ফলে সেবার মান অথৈবচ। ২০১৪ সাল থেকেই পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের দাম কমানোর কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি বরং আবার দাম বাড়াতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে ঠিকই কিন্তু সেবা বাড়ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়তই আয় ব্যয় সমন্বয় করতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছে। দাম বাড়ছেও।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ২ টাকা ৪০ পয়সা। অথচ গড়ে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এখন সাড়ে ৭ টাকারও বেশি। কোনো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ব্যয় ১৫ টাকারও বেশি। এভাবে ক্ষমতার এক মেয়াদে বিদ্যুতের ব্যয় তিনগুণ বাড়াটা অস্বাভাবিক। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন দুর্নীতি, বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে সুবিধা দেয়াকে। সরকারের সাথে জড়িত উচ্চ থেকে নিম্ন পর্যন্ত বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে সুবিধা দিতে গিয়ে, তাদের লাভের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় এত বেশি বেড়ে গেছে যার দায় বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

এ কারণেই সরকার এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে ব্যক্তি খাতের ওপর। তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অজুহাতে সরকার ২০০৯১০ এই দুই বছরে অনেক রেন্টালকুইক রেন্টাল প্লান্টকে ব্যক্তি খাতে স্থাপন করার অনুমতি দিয়েছে। শর্ত হলো, সরকারকে একটা পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ওই সব প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। না কিনলেও এসব প্লান্টের মালিককে বিদ্যুতের মূল্য দিতে হবে। আরো শর্ত হলো, ওই সব প্লান্টে যত জ্বালানি লাগবে, তা সরকারকেই সরবরাহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি হলো ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল, যেগুলো সরকার বিদেশ থেকে আমদানি করে। ব্যক্তি খাত এ ক্ষেত্রে অতি উর্বর এক ব্যবসার সন্ধান পেয়েছে। সরকার হলো বিদ্যুতের গ্যারান্টেড ক্রেতা, আবার সরকার হলো জ্বালানি সরবরাহকারী। এমন গ্যারান্টেড ব্যবসা আর অন্যত্র আছে কি!

প্রশ্ন হলো, তাহলে ব্যক্তি খাত কী দিল? হ্যাঁ, ব্যক্তি খাত দিয়েছে পুঁজি। তবে সে পুঁজিরও ৭৫ শতাংশ জোগান দিয়েছে সরকারি ও ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলো। ওই ক্ষেত্রে ঋণ মাফের সুবিধা আছে। এরই মধ্যে অনেকে ঋণখেলাপি সেজে সুদের একটা অংশ মাফ করিয়ে নিয়েছে। আর একটা বিষয় অনেকে জানেন না, তা হলো কোনো কোনো রেন্টাল ও কুইক রেন্টালওয়ালা ইতিমধ্যে শেয়ারবাজার থেকেও তাদের মূলধন বা ইকুইটি ক্যাপিটাল তুলেছে। অর্থাৎ জনগণের কাছে আইপিও বা প্রাথমিক শেয়ার বেচে তাদের স্থায়ী ক্যাপিটাল তুলেছে। কিন্তু অন্য লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যক্তি খাতের অনেকেই এরই মধ্যে তাদের শেয়ারের অংশটাকে অতি উচ্চমূল্যে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়েছে। তাদের হাতে যেখানে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ শেয়ার থাকার কথা ছিল, এখন আছে ২০২৫ শতাংশ। তাই তাদের দুই দিকেই লাভ। প্রথমে উচ্চ মূল্যে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বেচা, অন্যদিকে তাদের প্লান্টগুলো উৎপাদন না করে বসে থাকলেই তাদের সরকার কর্তৃক ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। অন্যদিকে, তারা পুঁজির জন্য ব্যাংক ও শেয়ারবাজারকে অতি সহজভাবে ব্যবহার করেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের যে শেয়ার ধারণ করার কথা ছিল, ক্ষেত্রবিশেষে তাও তারা রাখেনি। পুঁজি নেওয়ার ক্ষেত্রে, সেটা ব্যাংক উৎস থেকে বা শেয়ারবাজার উৎস থেকে হোক, অতি মূল্যায়নের আশ্রয় নিয়েছে। ১০০ টাকার সম্পদকে দেখানো হয়েছে ১৫০ টাকা। ওই অতি মূল্যায়িত সম্পদের বিষয়টিতেই তারা ব্যাংক ও ক্ষেত্র বিশেষে শেয়ারবাজার থেকে ঋণ ও ইকুইটি ক্যাপিটাল নিয়েছে। তাদের জন্য শুধু লাভ আর লাভ।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। তবে সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এসব ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতার বিষয়কে অতি দুর্বল যুক্তি দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এখানে ওরাই ব্যবসা পেয়েছে, যারা রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই বিদ্যুতের বাজারকে সরকারই অসম, অস্বচ্ছ ও কার্টেল গঠনের উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। রাতারাতি অনেকেই বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী সেজে বসলেন। তাদের পুঁজি ও দক্ষতা কিছুই প্রয়োজন হয়নি টেন্ডার জিততে। পুঁজি দেওয়ার লোক এসে গেছে। বিদেশিরাও এই সুযোগে তাদের পুরনো যন্ত্রপাতি বিক্রি করে বিদ্যুৎ প্লান্টের অংশীদার হলো। অন্য ক্ষেত্রে মূল্যহীন যন্ত্রপাতিকে অনেক মূল্যের বলে দেখানো হলো। আজকে অতি দ্রুত ধনী হওয়ার ভালো প্রক্রিয়া হলো সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে রেন্টালকুইক রেন্টালের মালিক হওয়া। রেন্টালকুইক রেন্টাল স্থাপন করে কোনো কথিত উদ্যোক্তা লোকসান দিয়েছে, এমনটি শোনা যায়নি।

অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা আর যথাযথ উদ্যোগের অভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো থেকে বের হয়ে আসা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও তা হয়েছে উচ্চমূল্যের। আবার যে উৎপাদন বেড়েছে অথনৈতিক কারণে তার পুরো সুফল পাওয়া যায়নি। উৎপাদন খরচ বেশি বলে সারাবছর বেশিরভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বল্পব্দ রাখতে হয়েছে বা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ হলেও, বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করার মত ক্ষমতা থাকলেও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। একই সাথে বাড়েনি সেবাও। রেন্টাল,কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে বড় অঙ্কের দায় সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। ২০১৩১৪ অর্থবছর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ দায় পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় তা ইকুইটিতে রূপান্তরের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ নিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬০৭ থেকে ২০১৩১৪ অর্থবছর পর্যন্ত ক্রয়বিক্রয়জনিত কারণে পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি এ সময় ঋণ নিয়েছে ২৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এ ঋণের ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা সুদসহ পিডিবির মোট দায় দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা।

পিডিবির এ দায় তাদের মোট সম্পদকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, পিডিবির ৪০ টাকা দায়ের বিপরীতে ৬০ টাকা ইকুইটি বা নিট সম্পদ রাখার বিধান রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১১০ টাকা দায়ের বিপরীতে ইকুইটি ঋণাত্মক ১৪ টাকা। ব্যালান্সশিটে ইকুইটি ঋণাত্মক হওয়ায় বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে পিডিবিকে। মোট সম্পদ থেকে মোট দায় বাদ দিলে দাঁড়ায় নিট সম্পদ। আর এ নিট সম্পদই মূলত প্রতিষ্ঠানের ইকুইটি। যদি মোট সম্পদের চেয়ে দায় বেশি হয়, তবে তা ঋণাত্মক ইকুইটি বা নিট দায়ে পরিণত হয়। এ অবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান তার সব সম্পদ বিক্রি করেও দায় পরিশোধ করতে পারবে না। ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে ডিজেল অথবা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা হয়। এ কারণে এটি খুবই ব্যয়বহুল। তাছাড়া বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে চুক্তিসংক্রান্ত দুর্বলতার কারণে ইউনিটপ্রতি ২০, ৩০, ৫০ অথবা ৭০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।।