Home » মতামত » জনগণ নির্লীপ্ত, নিরুদ্বিগ্ন নয়

জনগণ নির্লীপ্ত, নিরুদ্বিগ্ন নয়

ফারুক আহমেদ

dis 6কোন কিছুর বিষয়ে নির্লীপ্ততা বলতে অনাগ্রহ এবং এক ধরণের স¤পর্কহীনতাকেই বোঝায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের জীবন যে পরিস্থিতি এবং সংকটের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে তা বিচারবিশ্লেষণ করলে আপাতঃ দৃষ্টিতে জনগণকে নির্লীপ্ত বলেই মনে হবে। কিন্তু নিত্যদিন সে যে পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে সেই নিরিখে দেখলে নির্লীপ্ত না বলে উপায়বিহীন বলেই মনে হবে। বর্তমানে ক্ষমতসীনরা যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তাতে তাদের কেউই আক্রান্ত নয় এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এর উপরে দাড়িয়ে ক্ষমতায় যেতে চাইছে। এ অবস্থায় প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত ও আক্রান্ত হচ্ছে জনগণ। আবার জনগণের আক্রান্ত হওয়াকেই পুঁজি করে তাদের কর্মকান্ড চলছে। ক্ষমতাসীনদের কাছে যখন জনগণের আক্রান্ত হওয়া এবং সর্বপ্রকারের জনদুর্ভোগই তাদের রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয়, তখন সেই দুর্ভোগ নিরসনের উপায় কি? আক্রান্ত জনগণ কোন পথ না পেয়ে নির্লীপ্ত বটে, কিন্ত তাঁরা উদ্বিগ্ন ।

পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী কোন পক্ষের প্রতিই সাধারণ জনগণের অংশগ্রহন না থাকার নির্লীপ্ততা থাকলেও পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁদের থাকতে হচ্ছে এবং জীবনজীবিকার অর্থাৎ সবদিক দিয়েই তাঁদেরকে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন বলেই ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়েরই কর্মকান্ড এবং বক্তব্যের মর্মার্থ তাঁদের বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। এসব কথা তুলতেই একজন সাধারণ মানুষ ক্ষমতাসীনদের এবং সরকারের বর্তমান পরিস্থিতি মীমাংসায় উদ্যোগহীনতার যে ব্যাখ্যা দিলেন তা যে কোন গবেষকের গবেষনা থেকে ঢেড় বেশি। ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রতিদিনের বক্তব্য থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, পেট্রোল বোমাসহ জনগণের ওপর সব দিক থেকে যে আক্রমণ, নির্যাতন সরকার তা বন্ধের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেবে না। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের ধারণা এসব আক্রান্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে জনগণ একসময় অতিষ্ট হয়ে আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। তাঁর মতে, ব্যাপক সাধারণ মানুষ সরকার এবং ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে থাকলেও আসলে এদের কোনো পক্ষেই নয়। তার মতে বাংলাদেশের মানুষ কারো তৈরী করা ধারণা অনুযায়ী চলে না। বিকল্প না থাকায় এবং বিকল্প তৈরীর কোন পথ না থাকায় জনগণ কিন্তু বার বার একটি কাজ করে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেটা হলো ভোটের মধ্যদিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন। কিন্তু যারাই ক্ষমতায় থেকেছে তারাই জনগণের দেওয়া সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে উল্টো জনগণকেই মিথ্যা ধারণা দিতে চেষ্টা করেছে। জনগণ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছেন ওই মিথ্যাকে। ক্ষমতাসীনরা বরাবরই ভুলে গিয়েছে ক্ষমতায় থেকে জনগণকে রক্ষার দায়দায়িত্ব না নিয়ে বরং তার ওপর নির্যাতন, আক্রমণকে পুঁজি বানালে সেই ক্ষমতাসীনদের বিরূদ্ধেই দাঁড়ায় জনগণ । ১৯৯৬ সালে এবং ২০০৬ সালে ক্ষমতাসীনরা একই কাজ করেছিল। কিন্তু জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

সরকারের দায়ীত্বশীলরা যখন বলেন জনগণ হরতালঅবরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা ভুলে যান যে, জনগণ কোনো ধরনের নির্যাতননিপীড়ন, হত্যা, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ কোনো ধরনের জনবিরোধী কাজ দেখতে চায় না। জনগণ এক পক্ষকে প্রত্যাখ্যান করে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য পক্ষকে বেছে নিয়েছে। আর এই হিসাবই হচ্ছে সরকারের ভ্রান্তি।

প্রায় তিনমাস হতে চললো, স্কুলকলেজগুলো অঘোষিতভাবে বন্ধ। এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষাগুলো দুইমাস ধরেও শেষ হয়নি। অন্যদের ওপর দায় চাপালে জনগণ তা মানবে কেন? অধিকাংশ মানুষ বোঝেন দায় সরকারও এড়াতে পারে না। কৃষক তার ফসলের দাম পাচ্ছেন না। দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিক প্রায় সবাই বেকার। পরিবহন শ্রমিকের এক বিরাট অংশ বেকার হয়ে পড়েছে। সর্বস্তরে নিরাপত্তাহীনতা, রাস্তায় বের হলেই আক্রান্ত হওয়ার ভয় এড়ানো যায় না। এই অবস্থার মধ্যেও মানুষ নির্লীপ্ত কেন প্রশ্ন করতেই একজন বলে উঠলেন,‘মানুষ কোন আশ্বাসে এবং কোন ভরসায় মাঠে নামবে? মানুষের জীবনে যে সব সমস্যা ক্ষমতাসীনরা সৃষ্টি করেছে বা ক্ষমতাসীনদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কি তা সমাধানের গ্রহনযোগ্য কোন পথ দেখিয়েছে? জনগণের স্বার্থকেন্দ্রীক কোন কর্মসূচী ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিরা হাজির করেছে? সাধারণ মানুষ কেন ক্ষমতাসীন বা তাদের প্রদিদ্বন্দ্বীদের পক্ষ নিয়ে মাঠে নামবে?

মানুষের এই নির্লীপ্ততা আসলে কোন বিচার বুদ্ধিহীন নির্লীপ্ততা নয়। বরং এই নির্লীপ্ততার মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিচয় মেলে। জনগণের এই রাজনৈতিক বোধ তাঁদেরকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী কারোরই কিছু পাওয়ার থাকবে না।।