Home » অর্থনীতি » জলবিদ্যুতের আসল চ্যালেঞ্জ

জলবিদ্যুতের আসল চ্যালেঞ্জ

কেইথ জনসন, ফরেন পলিসি

অনুবাদ: আসিফ হাসান

last 4প্রকৌশল জগতে হুবার ড্যাম একটি বিস্ময়। ৭০০ ফুট দীর্ঘ কংক্রিটের প্রাচীরটি কলোরাডো নদীকে রুখে দিয়েছে। এর ১৭টি বিশাল পাওয়ার টাইবাইন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশের বিশাল এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে হুবার বিদ্যুৎ প্লান্টের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। অথচ ২০১৪ সালের প্রথম দিকের ২,১০০ মেগাওয়াট থেকে চলতি বসন্তে ১,২০০ মেগাওয়াটে। কারণ একটাইজলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা।

হুবার ড্যামের মতো বিশালাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ব্রাজিল, তুরস্ক, ইথিওপিয়া, তিব্বত মালভূমি, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিশাল বিশাল ড্যামের নির্মাণকাজ চলছে। আর জলবিদ্যুৎ বিশুদ্ধ জ্বালানি উৎপাদন করায় চাহিদা পূরণ এবং সেইসাথে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্যাসটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাজটিও এর মাধ্যমে হয়ে যায়, এতে কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ ঘটে না।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সম্ভাবনাকে হুমকিগ্রস্ত করেছে। বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন এবং মারাত্মক খরার ফলে নদী ও লেকের প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতে করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে পানি সরবরাহ হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি এবং অন্যান্য কাজে পানির চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কমছে। ফলে অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে মিশর ও ইথিওপিয়া কিংবা চীন এবং এর ভাটিতে থাকা প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিশ্বের অনেক অংশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যেতে শুরু করেছে। ইতিহাসের ভয়াবহ খরায় ব্রাজিলের জলাশয়গুলো ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শুকিয়ে গেছে, সাও পলোর মতো নগরীগুলোতে পর্যন্ত পানি রেশন করা হচ্ছে। দেশটির বিদ্যুৎ ৭৫ ভাগ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে, ফলে বৃষ্টিপাত না হলে দেশটি পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যাবে। মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ খরায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন গড় মাত্রার অর্ধেকে নেমে এসেছে। হুবার ড্যামের উজানে লেক মিডে ২০০১ সাল থেকে পানি ১০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্বের বৃহত্তম মিঠা পানির জলাশয় রাশিয়ার লেক বৈকাল তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় পৌঁছেছে, দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।

জলবিদ্যুতের আসল চ্যালেঞ্জ এখনো আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের মতো এলাকাগুলোকে ভবিষ্যতে আরো শুষ্ক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, তারা টারবাইন চালাতে, ফসল ফলাতে, নগরীর রিজার্ভারগুলো পূর্ণ করতে আরো কম পানি পাবে। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কলোরাডো নদীর বিদ্যুৎ উৎপাদন এক পঞ্চমাংশ নেমে যাবে। বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রকল্প কর্মকর্তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পানিপ্রবাহ কমে গেলে ব্রাজিলের বেলো মন্টে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও হুমকির মুখে পড়বে। ইকুয়েডর, কলম্বিয়ার মতো ল্যাতিন আমেরিকার আরো কয়েকটি দেশও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে মাথায় হাত দেবে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে ছুটতে হবে, আর তাতে কার্বন নিঃসরণ বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলো জাম্বেসি নদীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে বিশুদ্ধ বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি কমে যাওয়ায় সেখানকার দুটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হুমকির মুখে পড়েছে।

তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বিশ্বের অনেক বড় নদীর প্রধান উৎস হিমবাহগুলো ক্ষয়ে ফেলছে। তবে হিমবাহগুলো গলে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিন্তু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে। কারণ হিমবাহগুলো গলা বেড়ে গেলে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। এতে করে ভাটির দেশগুলো ভবিষ্যতের জন্য বেশি বেশি পানি সঞ্চয় করে রাখবে কিংবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকবে। এখন যেমন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান বিপুলসংখ্যক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে অদূর ভবিষ্যতে যখন প্রবাহ শুকিয়ে যাবে, তখন সমস্যা প্রকটভাবে দেখা দেবে। হিমবাহগুলো গলে যাওয়ার পর নদীগুলো আর পানি পাবে না। কৃষিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে। এমনকি হিমবাহ গলে যাওয়ায় বর্তমানেও স্বল্পমেয়াদি সমস্যাটি দেখা যাচ্ছে। হিন্দু কুশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত লেকের সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো বিপুলভাবে ফুলে ওঠলে ভাটি অঞ্চল পানিতে সয়লাব হয়ে যাবে, ড্যাম, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ধসিয়ে দেবে, কৃষিজমি ডুবিয়ে দেবে।

তারপর আসবে খরা। পানি থাকবে না। তবে হয়তো তখনই সমাধান আসবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিরাজমান পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করতে বাধ্য হবে, পানি বণ্টনে একটা সমঝোতায় উপনীত হবে।।