Home » বিশেষ নিবন্ধ » জুস-কোমল পানীয়ের নামে শিশুরা কি খাচ্ছে

জুস-কোমল পানীয়ের নামে শিশুরা কি খাচ্ছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dis 4শিশুকিশোরদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে জুস ও কোমল পানীয়। অথচ এগুলো শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞদের মতে এসব পান করলে হার্ট, কিডনি, পাকস্থলী, দাঁত ও হাড়ের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় সেবনের কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে যায় এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু স্বাস্থ্যের এই মারাত্মক পরিণতির কথা জেনেও আমরা যে হারে জুস বা কোমল পানীয় পান করছি তাতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ‘নকলের ভিড়ে আসল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর’।

ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা গ্রামের দোকান। সবখানেই রয়েছে নানা ব্র্যান্ডের কোমলপানীয় ও জুস, সাথে এনার্জি ড্রিংসও। এসবের ভোক্তা শিশু থেকে তরুণ, এমনকি বয়স্করা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণা বলছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় সব ধরনের কোমলপানীয়, জুস ও এনার্জি ড্রিংকসই মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক যা ক্ষয় করছে দাঁতের।

সাধারণত কোনো পানীয়তে রাসায়নিক উপাদানে পিএইচের মাত্রা ৭এর কম হলে তাকে এসিডিক বলা হয়। দন্ত ক্ষয়ের অন্যতম কারণ এটি। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, দেশের বাজারে বিদ্যমান সব কোমলপানীয়, জুস, এনার্জি ড্রিংকসে পিএইচের মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে এসব পানীয় মাত্রাতিরিক্ত এসিডিক। গবেষণায় দেখা গেছে, কোমলপানীয়র মধ্যে ভার্জিন রেডে পিএইচের মাত্রা পাওয়া গেছে ২ দশমিক ৪, কোকাকোলা ও মোজোয় ২ দশমিক ৫, আরসি কোলায় ২ দশমিক ৭, ইউরো অরেঞ্জে ২ দশমিক ৮, ফ্যানটা, পেসসি ও মিরিন্ডায় ২ দশমিক ৯, মাউন্টেইন ডিউতে ৩, স্প্রাইটে ৩ দশমিক ১, সেভেন আপে ৩ দশমিক ৪, ক্লেমন ও অ্যাপি ফিজে ৩ দশমিক ৫ এবং আরসি ক্লাব সোডায় ৫ দশমিক ৫ পিপিএম। যদিও বিএসটিআই নির্দেশিত মানমাত্রায় এসব পানীয়তে পিএইচের মাত্রা বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।

গবেষণা কাজের সহগবেষক ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মহিদুস সামাদ খান বলেন, কোমলপানীয়, জুস ও এনার্জি ড্রিংকসে অধিক মাত্রায় এসিড দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি করে। বাজারে পাওয়া কোমলপানীয়, এনার্জি ড্রিংকস ও জুসের প্রায় সবক’টিই অধিক মাত্রায় এসিডিক। এগুলোর গুণগত মান নির্ধারণে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও সরকারি নীতিনির্ধারণে পিএইচ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

পিএইচের মাত্রা বেড়ে গেলে ক্ষতি আবার কমলেও ক্ষতি। এটি রাখতে হবে নির্দিষ্ট মাত্রায়। গবেষণাটিতে বলা হয়, দাঁতের এনামেলের পিএইচ মাত্রা ৫ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৫, আর রুট ডেন্টিনের (এনামেলের ভেতরের অংশ) ৬ দশমিক ৭এর নিচে নেমে আসা দন্ত ক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে দায়ী। শুধু কোমলপানীয়ই নয়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুস ও এনার্জি ড্রিংকসও অধিক মাত্রায় এসিডিক। এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে পিএইচের মাত্রা রেড বুলে ৩ দশমিক ৫, স্পিডে ৩, টাইগারে ৩ দশমিক ১ ও পাওয়ারে ৩ দশমিক ২ পিপিএম। একইভাবে জুসের মধ্যে ফ্রুটো ম্যাংগোয় ৩ দশমিক ৪, সানড্রপ ম্যাংগোয় ৩ দশমিক ৫, চিয়ার্স ম্যাংগো ও প্রাণ ম্যাংগোয় ৩ দশমিক ৭, ড্যানিশ ম্যাংগোয় ৩ দশমিক ৮ এবং ফ্রুটিকা ম্যাংগো, ম্যাংগোলি ম্যাংগো ও সেজান ম্যাংগো জুসে পিএইচের মাত্রা পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৯ পিপিএম করে।

এ বিষয়ে কোকাকোলা, স্প্রাইট ও ফ্যানটার এ দেশীয় পরিবেশক আবদুল মোনেম বেভারেজ লিমিটেডের মূল প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম বলেন, ‘শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়লে সে পানীয় মানুষ খাবে না। পিএইচ কীভাবে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ে আসা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিতে আমরা কোকাকোলা কোম্পানিকে বলব।’

হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশের কোমলপানীয়, জুস ও এনার্জি ড্রিংকসের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে সেভেন আপ, পেপসি, মিরিন্ডা ও মাউন্টেইন ডিউয়ের পরিবেশক ট্রান্সকম বেভারেজ। ম্যাংগো জুস ফ্রুটো ম্যাংগো ও ম্যাংগোলি এবং এনার্জি ড্রিংকস পাওয়ারের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ। মোজো, ক্লেমন, স্পিড ও ফ্রুটিকা উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড। পারটেক্সের রয়েছে ড্যানিশ। এছাড়া অন্যান্য আরো কিছু ব্র্যান্ডও বাজারে প্রচলিত।

উল্লেখ্য, ১২টি কোমলপানীয়, চারটি এনার্জি ড্রিংকস ও আটটি ব্র্যান্ডের জুস নিয়ে ‘ক্যারেক্টারাইজিং ডেন্টাল ইরোশন পোটেনশিয়াল অব বেভারেজেস অ্যান্ড বটলড ড্রিংকিং ওয়াটার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গবেষণা করা হয়। গবেষণাকালে প্রতিটি ব্র্যান্ডের তিনটি করে নমুনা নিয়ে প্রত্যেকটি তিনবার করে পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি ব্র্যান্ড নয়বার পরীক্ষার পর এ সিদ্ধান্তে এসেছেন গবেষকরা। এ গবেষণা গত ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাথে এ গবেষণায় আরো যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয় ও টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়। তরুণ ও যুবকরাই কোমলপানীয়র প্রধান ভোক্তা। দন্ত চিকিৎসকরাও বলছেন, তরুণ রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এদিকে দেশের বাজারে আকর্ষণীয় লেভেলে নানা প্রলোভন দিয়ে ভেজাল লজেন্স বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের পছন্দের এ পণ্যটি (লজেন্স) স্বাস্থ্যসম্মত ও বিএসটিআইয়ের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে তৈরির আইন থাকলেও এসব পণ্য মোম, কাপড়ের রঙ ও স্যাকারিন দিয়ে তৈরি হচ্ছে। কোন কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না তাদের এই অপকর্ম। প্রায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে সীলগালাসহ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। জরিমানার টাকা পরিশোধ করলেও পরবর্তীতে অবৈধভাবে সীলগালা ভেঙ্গে তারা আবারও নতুন করে শুরু করে একই কাজ করে চলেছে।

শিশুদের অনেকের কাছে প্রিয় জুস ও কোমল পানীয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক রোগের জীবাণু। জুসে মিশ্রণ হচ্ছে ক্যাফেইন, কৃত্রিম রঙ, স্যাকারিনসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। কোমল পানীয়তে ব্যবহার করা হয় কার্বনেটেড পানি এবং স্বাদের জন্য ক্যাফেইন ও সাইট্রিক এসিড। কোমল পানীয়কে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যালামেল কালারিং। দেশীবিদেশী নামিদামি ব্র্যান্ডের নামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে এসব নকল জুস ও কোমল পানীয়।

খোদ রাজধানীতেই গড়ে উঠেছে কয়েকশ জুস ও কোমল পানীয় তৈরির কারখানা। রাজধানীর শ্যামপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, লালবাগ, চকবাজার এবং ঢাকার আশপাশে টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ এলাকায় এসব নকল কারখানার অবস্থান। মান নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর বিএসটিআইও এসব প্রতিষ্ঠানের খবর রাখে না। অসৎ ব্যক্তিরা এসব কারখানায় উৎপাদিত নকল জুস ও কোমল পানীয় নামিদামি ব্র্যান্ডের সিল ও স্টিকার নকল করে বাজারজাত করছে। এসব নকল পণ্য সাধারণত ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়। গ্রাম ও ঢাকার নিম্নাঞ্চল ও বস্তিতে এসব জুসের চাহিদা বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রামের শিশুকিশোররা এগুলোর ক্রেতা। অনেক সময় সচেতন ক্রেতারাও এগুলো কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।

শিশুরা সবচেয়ে বেশি খাদ্য ঝুঁকিতে আছে। শিশুর জন্য ডিম একটি আদর্শ খাবার। এখন কোন কোন খামারের মুরগিকে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য খাওয়ানো হয়। ওই বর্জ্য খাওয়া মুরগির ডিমে ক্রোমিয়ামের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অনেক অভিভাবক হয়তো না জেনে সন্তানকে ওইসব খামারের ডিম খাওয়াচ্ছে। এতে শিশুর ক্যানসারের মতো জটিল রোগ হতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষিতে কীটনাশক পরিমাণমতো ব্যবহারের অনুমোদন দিলেও মাঠে কী হচ্ছে, তা যথাযথভাবে নজরদারি করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার যেমন করা হয়, তেমনি কীটনাশক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর শস্য বা ফল বাজারে নেয়ার কথা থাকলেও সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় না। এদিকে লিচুর নামে যে এডিবল জেলটি বাজারজাত করা হচ্ছে তা বাচ্চাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পলিথিন যেমন পচে না, রেজিন দিয়ে তৈরি এ লিচুও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হজম হয় না। এ ছাড়া আম দুধ, চকলেট দুধ, কমলা দুধ নামে যেসব ফ্লেভার্ড মিল্ক বাজারজাত করা হচ্ছে তাতে কৃত্রিম রঙ ও স্বাদ মেশানো হচ্ছে। এগুলো স্বাস্থ্যসম্মত কিনা তা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স গ্রহণের তালিকায় জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যেরই নাম নেই।।