Home » আন্তর্জাতিক » অনিশ্চয়তার শেষ সীমানায়

অনিশ্চয়তার শেষ সীমানায়

LAST 2বিতর্কিত নির্বাচনের পরে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যাটি এখন ব্যালট বাক্সের চাইতেও আরও অনেক গভীরে প্রথিত হয়ে গেছে। এছাড়াও ওই অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার আগুনে অর্থনীতি হয়ে পড়েছে স্থবির, শাসন ব্যবস্থা হয়ে গেছে একনায়কতান্ত্রিক এবং গণতন্ত্র হয়েছে দুর্বল। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এভাবেই ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করেছে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ফরেইন পলিসি ম্যাগাজিন ২৬ মার্চ সংখ্যায়।

রাজা রুমি

জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ঝরে গেছে শতাধিক জীবন। ধর্মঘটের কারণে বাংলাদেশের রাজধানী ও অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র ঢাকা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। পাকিস্তান থেকে পৃথক হওয়ার পর থেকেই অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি ছাপ রয়ে গেছে যা মূলত রাজনীতিতে ঘন ঘন সামরিক হস্তক্ষেপ, বড় ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও দুই বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে আবর্তিত হওয়া অকার্যকর গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট। বিপরীত মেরুতে অবস্থানরত দুই শিবিরের শীর্ষে রয়েছেন দুই নারী, যারা ‘বেগমস’ নামে পরিচিত। তারা হলেন আওয়ামী লীগের প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। আগেরজন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় বীর শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। দ্বিতীয়জন দেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। জিয়াউর রহমান আবার দেশের রক্ষণশীল অংশের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। ওই দুই দল, রাজনীতিবিদ ও তাদের শাসন সৃষ্টি করেছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি মাত্রা।

সাম্প্রতিক অস্থিরতার শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে। সে নির্বাচন বিরোধীদের বর্জন সত্ত্বেও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। বিরোধী দল বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর দাবি ছিল, দলনিরপেক্ষ অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রশাসনের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে একতরফা নির্বাচনী চর্চার দিকেই এগিয়ে যান হাসিনা, যার ফলে তিনি সহজেই আরেকবার ক্ষমতায় আরোহণ করেন।

নির্বাচন থেকে অস্থিরতায়

গত ৫ই জানুয়ারি ছিল ২০১৫ সালের নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি। বিরোধীরা দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেয়। সরকার বেশ শক্ত হাতে প্রতিক্রিয়া দেখায় বিরোধী কর্মীদের গ্রেপ্তার ও সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করনের মাধ্যমে। এর পাল্টা হিসেবে বিরোধীরা দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধ আহবান করে। আর তখন থেকেই বিরোধী দল আন্দোলন শুরু করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গ্রহণ করে এর পাল্টা ব্যবস্থা। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় নিজের কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার গতিও বাড়তে শুরু করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থনের কারণে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ওপর মামলা ঝুলে আছে। জানুয়ারি থেকে প্রায় ৭ হাজার বিরোধী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আটক করেছে পুলিশ। শতাধিক মানুষ রাজপথে সংঘর্ষে, পেট্রোলবোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ২০ জনের মতো বিরোধী কর্মীকে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ খুবই উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। সর্বশেষ এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল ২০০৭ সালে, যখন সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করেছিল। ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বলেন, উভয় পক্ষের কট্টরপন্থিরা কোন ছাড় দিতে রাজি নন। একই কথা বলছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটি বলছে, দু’দলই দলীয় একনায়কত্বের মতো আচরণ করছে, যারা গোটা দেশকে দুটি যুদ্ধাংদেহী শিবিরে বিভক্ত করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, কিছু বিরোধী দলের কর্মীর সহিংস অপরাধকে সরকারের হত্যাকাণ্ড, অন্যায়ভাবে আটক ও হতাহতের ঘটনাসমূহকে যৌক্তিকতা দেয়া ও অজুহাত হিসেবে দাড় করানো যায় না।

অর্থনৈতিক ও সরকারি দুর্দশা

বাংলাদেশের এ রাজনৈতিক হাঙ্গামার মধ্যে অবরোধ, সহিংসতা অব্যাহত থাকার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবরোধ, শহরগুলোতে সহিংসতা এবং দেশজুড়ে একটি অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে। এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে প্রতি বছর ২৪০০ কোটি ডলারের পোশাকশিল্পের ওপর। কারণ তৈরি পোশাক বিদেশে পাঠানো ও মালামাল কেনার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) জানিয়েছে, পোশাকশিল্প ইতিমধ্যেই ৩৯০ কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা খাতের ক্ষতির পরিমাণ ২১০ কোটি মার্কিন ডলার। সম্প্রতি সপ্তাহে কৃষকরা নিজেদের পণ্য অবরোধের কারণে বিভিন্ন শহরে নিয়ে যেতে পারেননি। ফলে কৃষি খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫৩.৩ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডিস দেশটির ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে। দেশটি যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জন করেছে, তা আংশিকভাবে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এ ছাড়া বর্তমান প্রবৃদ্ধি ছোট ঘাটতির দিকে রূপান্তরিত হতে পারে। গত কয়েক মাসে পরিবহন খাত বলতে গেলে বন্ধই ছিল। এর ফলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানিও। গত দুই দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক উন্নয়ন সূচকে উন্নতি করা সত্ত্বেও দেশটির রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা এখনও বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। এটি এখনও কর্তৃত্বপরায়ণ, বংশানুক্রমিক ও ব্যক্তিচালিতই রয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই এর ফলাফল হচ্ছে, সংসদ ও সুপ্রিম কোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, আদালতও আওয়ামী লীগের বিশ্বস্তদের দিয়ে পূরণ করা হয়েছে গত ছয় বছর। আসল সত্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে কেবল নিজেদের বিশ্বস্তদেরই নিয়োগ দিয়েছে, আর এর ফলে আমলাতন্ত্রেও দলীয় বিভাজন ঢুকে গেছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার। এ ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনেও নতুন পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এর আগেরবার সংবিধানে তত্ত্ববাবধায়ক সরকারের একটি বিধান ছিল, যেটি বর্তমান সরকার বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

ভবিষ্যত কি

গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পদ্ধতি দুই অহংচালিত, একগুয়ে নারীর কাছে জিম্মি, অথচ যাদের রয়েছে বিপুল সমর্থক। আরেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, সামরিক বাহিনী কোন হস্তক্ষেপ ছাড়া নীরবভাবে সবকিছুর দর্শক হওয়াটাই বেছে নিয়েছে। হাসিনার প্রথম মেয়াদে সংবিধানকে ধর্মনিরপেক্ষ করা হয়েছে।

দেশটিতে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রাটি অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সাধারণত নির্বাচনের আগে আগে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এমনই যে, সহিংসতা মাত্রা ছাড়িয়েছে এবং আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি এটি হুমকি হিসেবেই আবির্ভূত হচ্ছে। হাসিনা সম্প্রতি খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় আসতে চান। তবে তিনি সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, বরং হাসিনা সহিংস কৌশল অবলম্বন করে সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন। সরকারের কাছে যে একমাত্র অবশিষ্ট উপায়টি রয়েছে তাহলো, রাজনৈতিক সংলাপের আয়োজন করা ও বিরোধীদের সাথে একটি আপোসরফায় পৌঁছানো। বর্তমান শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভারতেরও উচিত ঢাকাকে বিরোধীদের সাথে রাজনৈতিক সহাবস্থানের উপায় খোঁজার পরামর্শ দেয়া। অন্যথায় আরেকটি অচলাবস্থার সম্ভাবনা রয়েই যায়। বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নও ঢাকার কর্তৃপক্ষকে বলতে পারে, রাজপথে লড়াইয়ের বদলে রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের সাথে সমঝোতায় আসতে। বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণে রাজনৈতিক পদক্ষেপে অনুপস্থিতি থাকলে এবং এই অবস্থা বিদ্যমান থাকলে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে থেকেই যাবে।।