Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১১)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১১)

পার্টির জনভিত্তির বিস্তার

আনু মুহাম্মদ

last 3চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন প্রধানত মধ্যবিত্ত বিপ্লবী চেতনাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরাই। কিন্তু ১৯২৭ সালের মধ্যে এটি শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়। তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিনটার্ণের বিশ্লেষণেও এর স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তাদের দলিলে বলা হয় যে, নবগঠিত এই পার্টির প্রথম কংগ্রেসে মোটামুটি উপস্থিতি ছিলো ৫০ জনের, ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ কংগ্রেস পর্যন্ত সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫০ জন। এই বছর থেকেই পার্টির জনভিত্তি বিস্তৃত হতে শুরু করে। ‘৩০ মে আন্দোলন’ নামে পরিচিত জনআন্দোলনের মধ্য দিয়ে সদস্য সংখ্যা ৪ হাজারে উন্নীত হয়, যার শতকরা ৫০ ভাগই ছিলেন শ্রমিক। ১৯২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কৃষক সংখ্যা ছিলো ১০০ জন, তাঁরা সবাই ছিলেন কুয়ানটাং এলাকার। কিন্তু ১৯২৭ সালে যখন পার্টি পঞ্চম কংগ্রেস আহবান করে তখন তার সদস্য সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৬০ হাজারে, যার বৃহৎ অংশ ছিলেন কৃষক। কমিনটার্ণের মতে, ‘১৯২১ সাল থেকে ১৯২৭ সাল ছিলো বস্তুত মার্কসবাদী প্রচারণা গ্রুপ থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রকৃত জনভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের কাল’।১

পার্টির এই বিকাশের কারণেই জেনারেল চিয়াং কাই শেক আতংকিত হয়ে পড়েন। সেজন্য কুওমিনটাং পার্টিকে কমিউনিস্ট প্রভাব মুক্ত করা শুধু নয়, তাদের ভিত্তি নির্মূল করতে উদ্যত হন। আগের পর্বেই বলেছি, এই ১৯২৭ সালেই জেনারেল আক্রমণ শুরু করে। পার্টি সদস্য এবং সমর্থকদের পাইকারি গ্রেফতার, বিচার, খুন চলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতেই গ্রাম ও পাহাড়ে ঘাঁটি, সোভিয়েত বা মুক্তাঞ্চল, লাল ফৌজ গঠন করে পার্টি নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে।

১৯৩২ সালে জাপান সাংহাই আক্রমণ করলে পার্টি জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু চিয়াং কাই শেকএর বৈরীতার কারণে পার্টি বাহিনী টিকতে পারেনি। প্রবল চাপের মধ্যেই আত্মগোপনে এবং মুক্তাঞ্চলকে ঘাঁটি করে পার্টির তৎপরতা চলতে থাকে। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় সর্বচীন সোভিয়েত কংগ্রেসে মাও সেতুঙ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই বছরেই শুরু হয় লংমার্চ। ১৯৩৫ সালের শুরুতে আত্মগোপন অবস্থাতেই পলিটব্যুরোর সভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে লংমার্চ কালে মাওসেতুঙ কেই প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

একের পর এক হামলা মোকাবিলা করতে করতেই লং মার্চ (১৯৩৪) অতিক্রম করতে থাকে বিভিন্ন রাজ্য। প্রায় ৬ হাজার মাইল অতিক্রম করে এই লংমার্চ যখন শেষ হয় ততদিনে পার্টি সামরিক, রাজনৈতিক ও মতাদির্শিক ভাবে প্রবল শক্তি নিয়ে চীনের মানচিত্রে হাজির। কমিনটার্ণের সঙ্গে পার্টির সম্পর্ক তখন শিথিল, বরং পার্টি কমিনটার্ণের উপদেষ্টাদের দেয়া নীতির সমালোচকের ভূমিকায় গেছেন লং মার্চের সময় থেকেই। এই লংমার্চের মধ্য দিয়েই মাও সেতুঙ পার্টির নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। পার্টির ভেতরের অন্যান্য লাইন তখন চীনের পরিপ্রেক্ষিতে ভুল বা অকার্যকর প্রমাণিত।

সেসময় বাইরের দুনিয়ায় এই পাটির বিকাশধারা সম্পর্কে খবরাখবর প্রকাশিত হতো সামান্যই। যা হতো তার প্রায় সবই ছিলো ভুল বা অপপ্রচার। চিয়াং কাই শেক বাহিনী ছিলো বিশাল, তার সাথে ব্রিটিশ জার্মান উপদেষ্টারাও ছিলো। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ছিলো সুসংগঠিত। এসবের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে কুওমিনটাংএর বৈরী হিসেবে যে কাজ করা সম্ভব নয় সে বিষয়ে সবাই নি:সন্দেহ ছিলেন। পার্টি ঠিকই অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পতিত হয়। বারবার ঘাঁটি ছেড়ে দিতে হয়, পশ্চাদপসরণ করতে হয়। মাও সেতুঙ এবং চু তে পরাজিত, ধৃত ও নিহত হবার খবর প্রকাশিত হয় বহুবার। পার্টি তখন লালদস্যুদের গ্যাং হিসেবেই পরিচিত। ‘১ নম্বর লালদস্যু’ মাও সেতুঙকে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলে লক্ষ ডলার পুরষ্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। একটানা বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে বাইরের দুনিয়া তো বটেই চীনের বড় শহরেও ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে অনেক।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম ও অবস্থা সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ প্রথম বিস্তারিত জানতে পারেন মার্কিন সাংবাদিক এডগার স্নোর মাধ্যমে। স্নো ১৯২৮ সাল থেকেই চীনে ছিলেন। পিকিংএ তিনি সস্ত্রীক অবস্থান করতে থাকেন ১৯৩২ সাল থেকে। চীনা ভাষায় যোগাযোগে দক্ষতা অর্জন করেন। মিসেস সান ইয়াৎ সেন এর সুপারিশেই তিনি পার্টির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হন। অনেক ঝুঁকি নিয়ে যখন পার্টির নেতৃবৃন্দের ঘাঁটি এলাকায় যান তখন লংমার্চ চলছে। তাঁর পাঠানো রিপোর্টের মাধ্যমেই প্রথম সবাই পার্টির রাজনীতি, কর্মকৌশল, জনভিত্তি, সামরিক বিজয় এবং কাজের বিস্তৃতি সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর থেকে চীনের বিপ্লবী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষক এডগার স্নোর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়, যেখান থেকে পার্টির ওঠানামা, সংকট ও ক্রমবিকাশের চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৩৭ সালেই স্নোর প্রত্যক্ষ অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা নিয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রেড স্টার ওভার চায়না’র প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় যা চীন বিপ্লবের যাত্রাপথ অনুধাবনের জন্য অবশ্য পাঠ্য।২

তথ্যসূত্র

১। R. A. Ulyanovsky (ed): The Commintern and the East, Progress Publishers, Moscow, 1979. 285

২। Edgar Snow: Red Star Over China, 1977 (First published in UK, 1937)

(চলবে…)