Home » আন্তর্জাতিক » দেশে দেশে গণতন্ত্র বিনাশে হত্যা-নিমর্মতা (পঞ্চম পর্ব)

দেশে দেশে গণতন্ত্র বিনাশে হত্যা-নিমর্মতা (পঞ্চম পর্ব)

যে কোনো সময় তুলে নেয়া হতো বিরোধী মতাবলম্বীদের

LAST 5দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে ওলোটপালোট করে দিয়েছে। বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে একদিকে দেশে দেশে যেমন গণতন্ত্রের লড়াইসংগ্রাম জোরদার হয়েছে, ঠিক তার উল্টো দিকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে কখনো সামরিক শাসন, আবার কখনো অগণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয়েছে। আর এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব দেশের হাজারও, লক্ষ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা উইলিয়াম ব্লাম তার ‘কিলিং হোপ’ বইয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের। এর কয়েকটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।

ডোমিনিকান রিপাবলিক

১৯৬০১৯৬৬

গণহত্যাকারী, চরম নির্যাতক ও পুরোপুরি একনায়ক জেনারেলিসিমো রাফায়েল ট্রুজিল্লো ১৯৬১ সালের ৩০ মে রাতে রাজধানী শহর সিউদাদ ট্রুজিল্লোর উপকন্ঠে মহাসড়কের ওপর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই হত্যাকান্ড পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে এমন কিছু ঘটনার জন্ম দেয় যা ডোমিনিকান রিপাবলিকের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সাক্ষী হয়ে আছে।

হত্যকান্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই হাত ছিল। আর এই হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি যুক্তরাষ্ট্রের মদদেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিলেন এবং তাদেরই সহযোগিতায় দীর্ঘ ৩০টি বছর ডোমিনিকান রিপাবলিককে শাসন করে গেছেন। বিস্ময়কর একটি ব্যাপার হলো, কমিউনিজম বিরোধী মনোভাব দ্বারা তাড়িত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী একজন স্বৈরশাসককে উৎখাতের জন্য তৎপর হয়েছিল।

১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে পার্শ্ববর্তী কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী বাহিনীর নিকট ফালজেনসিও বাতিস্তা সরকারের পতন হলে যুক্তরাষ্ট্র বুঝে যায়, দক্ষিণপন্থী স্বৈরশাসকদের সমর্থন করে লাতিন আমেরিকায় সংগঠিত বিপ্লবী আন্দোলনসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বরং এসবের প্রকোপ আরো বেড়েই যাবে। এমনকি কিউবায় আশ্রয় নেয়া ডোমিনিকানের একদল যোদ্ধা মাতৃভূমি উদ্ধার কল্পে জুনের দিকে ডোমিনিকান রিপাবলিকের অভ্যন্তরে অভিযান চালায়, যদিও সেই অভিযান ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে ক্যাস্ট্রোর শাসন বিরোধিতাকে একটি বৈশ্বিক রূপদানের প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ট্রুজিল্লোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন ট্রুজিল্লোর বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানোর বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য ক্রমেই বিব্রতকর পরিস্থিতি ডেকে আনতে শুরু করে। অবস্থাদৃষ্টে প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারের মনেও এই ধারণা জন্ম নেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ট্রুজিল্লোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় তবে মার্কিন জনগণও ক্যাস্ট্রোকে ঘৃণা করতে চাইবে না। নিজে যে একটি ঘূর্ণাবর্তের শিকার হতে চলেছেন সে কথা নাওয়াকিফ থেকে ট্রুজিল্লো তার দস্যুপনা দিয়েই দেশ শাসন করছিলেন। জুনের দিকে তার গুন্ডাবাহিনীর লোকেরা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রমুলু বেটানকোর্টকে বহনকারী একটি গাড়ি উড়িয়ে দেয়। কারণ বেটান কোর্ট ছিলেন ট্রুজিল্লোর স্বৈরশাসনের একজন কঠোর সমালোচক। এই ঘটনার পর ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনামূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে ট্রুজিল্লোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। বেটান কোর্ট অবশ্য সৌভাগ্যক্রমে সেই হামলায় বেচে গিয়েছিলেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান হেরটারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি যদি ট্রুজিল্লোকে বিনাশ না করেন তবে আমরা ডোমিনিকান রিপাবলিককে হামলা চালাব’।

ট্রুজিল্লো হত্যাকান্ডের পরদিনই রাফায়েল ট্রুজিল্লো জুনিয়র তার প্যারিসের বিলাসী জীবন বাদ দিয়ে ডোমিনিকানে ফিরে আসেন এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

রাফায়েল ট্রুজিল্লো জুনিয়র কোর্টেই কোনো আদর্শ শাসক ছিলেন না। পরিবার ও পদবীগত ঐতিহ্য অনুযায়ী অদক্ষ তো তিনি ছিলেনই, উপরন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী ছয়টি মাস প্রতিশোধের রক্তগঙ্গায় তিনি অবগাহন করলেন।

ডোমিনিকান রিপাবলিকের জনগণ নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে শুরু করলেন। বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে এলেন। অক্টোবর নাগাদ প্রতিবাদপ্রতিরোধ নৈমিত্তিক ঘটনায় রূপ নিলে সেনাবাহিনীর ট্যাংক দিয়ে সে সব দমনও করা হচ্ছিল। সরকারি সৈন্যদের গুলিতে ছাত্ররা নিহত হতে শুরু করলো। এবার প্রমাদ গুনলো ওয়াশিংটন। রাজপথ এবং সরকারের উচ্চ মহলে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। প্রথাগতভাবেই তারা ভাবলো, কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখলের একটি পায়তারা চলছে। যদিও ডোমিনিকান রিপাবলিকে সে সময় বামপন্থীদের উপস্থিতি তেমন একটা দৃশ্যমাণ ছিল না।

মার্কিন কূটনীতিকরা রাজধানীতে ট্রুজিল্লোর অনুসারী ও ডোমিনিকান সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে জানিয়েছিল, দেশটিতে জেয়াকিন বালাগুয়ের নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই সরকার দেশ চালাবে। আর এমন একটি সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে তার সামরিক শক্তিকে কাজে লাগাতেও প্রস্তুত রয়েছে। বালাগুয়ের দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই ট্রুজিল্লো পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সালের পর ডোমিনিকান রিপাবলিকে এই প্রথম মোটামুটি গণতান্ত্রিকভাবে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জুয়ান বচ একজন লেখক এবং ট্রুজিল্লোর শাসনামলে দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার কয়েকদিন আগে ওয়াশিংটনে তাকে জমকালো সংবর্ধনাও জানানো হয়। তবে বচ তার বিশ্বাসের প্রতি নিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেশ কিছু জমি তিনি সরকারি মালিকানায় নিয়ে আসেন। কম ভাড়ার ঘরবাড়ি নির্মাণ, বাণিজ্যের জাতীয়করণ, গণপূর্তের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাসী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কায়েমী স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থ রক্ষায় মনোযোগী হন তিনি। এছাড়া বিলাসী পণ্য সামগ্রীর আমদানি কমিয়ে দিয়ে বেসরকারি খাতকে উৎসাহদান এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন বিদেশী বিনিয়োগকেও স্বাগত জানানো হয়। তৃতীয় বিশ্বের একজন নেতা হিসেবে যে কোনো বিবেচনায়ই তিনি ছিলেন সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে। আইন অমান্য না করা পর্যন্ত সামাজিক মুক্তিকামীদের এমনকি কমিউনিস্টদেরও হয়রানি না করার পক্ষে ছিলেন বচ। কিন্তু তার এসব পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীনে থাকতে না চাওয়ার প্রবণতা বেশ কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ও কংগ্রেসম্যানের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাড়াল। ভূমি সংস্কার এবং জাতীয়করণের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই অসহিষ্ণু। কারণ এটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে। বেশ কিছু মার্কিন প্রচার মাধ্যম বচকে ক্যাস্ট্রো এবং ডোমিনিকান রিপাবলিককে কিউবার সাথে তুলনা করতে শুরু করে দেয়। কোনো কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনাকে সিআইএ’র প্রচারণার অংশ বলেই মনে হচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ডোমিনিকান রিপাবলিক, উভয় দেশেই বচের বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ উত্থাপিত হতে থাকলো যে, তিনি দেশে এবং সরকারের কমিউনিস্টদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছেন। আর কমিউনিস্ট বলতে দীর্ঘদিন ধরে অধিকার বঞ্চিত প্রতিবাদী মানুষকেই বোঝানো হতো। মিয়ামী নিউজ পত্রিকার সাংবাদিক হলো হেনড্রিক্স লিখছেন, ডোমিনিকান রিপাবলিকে কমিউনিস্টদের তৎপরতা অতি দ্রুতগতিতেই বেড়ে চলেছে। হল অবশ্য বচ সরকারের এমন একজন সদস্যেরও নাম উল্লেখ করতে পারেননি যিনি কমিউনিস্ট। তবে ষাটের দশকে হল হেনড্রিক্স নিজে সিআইএ’র একজন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সরবরাহকারী এবং গোপন কর্মী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বিপ্লবীদের ওপর খড়গহস্ত না হতে চাওয়ায় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিও বচএর প্রতি বিষোদগার করেন। যুক্তরাষ্ট্র যখন ডোমিনিকান রিপাবলিককে নতুন কোনো অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার থেকে সরে এলো তখনই বোঝা গেল যে, জুয়ান বচের দিন শেষ হয়ে আসছে। ফলে সামরিক বাহিনীর দক্ষিণপন্থী অফিসাররা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠে। টাইম ম্যাগাজিন পত্রিকার ক্যারিবীয় অঞ্চলের সাবেক ব্যুরো প্রধান স্যাম হেলপার পরে জানিয়েছিলেন, পেন্টাগনের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথেই বচের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠনের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়।

যে যুক্তরাষ্ট্র চোখের ইশারায় লাতিন আমেরিকায় যেকোনো সামরিক অভ্যুত্থান বন্ধ করে দিতে পারে সেই যুক্তরাষ্ট্র ডোমিনিকান সামরিক কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে এতটুকু বাধা প্রদান করলো না। যদিও বচ সাহায্যের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুধু লক্ষ্য রাখার বিষয় ছিল অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে কমিউনিস্টরা যেন আবার ক্ষমতায় চলে না আসে। ঘটনাটিকে নিউজ উইক পত্রিকা ‘গণতন্ত্রকে বিদায় করে দিয়ে কমিউনিজমের হাত থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা’ বলে অভিহিত করেছে। এর প্রায় একুশ মাস পর ডোমিনিকান রিপাবলিকে আবারও একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। সামরিকবেসামরিক যৌথ শক্তির অধীনে অংশ নেয়া সেই বিপ্লবীরা প্রবাসে অবস্থানরত বচকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে তার গৃহীত কর্মসূচির প্রতি সমর্থনদানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে মার্কিন নৌ সেনাদের সমাবেশ ঘটিয়ে একই শতাব্দীতে পঞ্চমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র এ জাতীয় একটি আশার গুড়ে বালি ঢেলে দেয়। সান্টো ডমিঙ্গোর রাস্তায় রাস্তায় রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রথম দুই দিনের সংঘর্ষে এক একবার এক এক পক্ষ এগিয়ে গেলেও ২৮ এপ্রিল রাতে সান্টো ডমিঙ্গোর অভ্যন্তরে অবস্থানকারী সেনা ও পুলিশ বাহিনীর প্রতিরোধব্যুহ ভেঙ্গে পড়ে। এর পর পরই মাইল দশেক দূরে সান ইসিড্রোতে সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ অবস্থানে সংবিধান পন্থীরা আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় সেখানে অবস্থানরত জেনারেলরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। কাউকে কাউকে কাদতে পর্যন্ত দেখা যায়। এ সময় সেখান থেকে ওয়াশিংটনে প্রেরিত এক তারবার্তায় বলা হলো, অতি দ্রুত যদি মার্কিন সৈন্য না পাঠানো হয় তবে সেখানে অবস্থানরত মার্কিনিদের জীবন বাচানো যাবে না এবং ক্যাস্ট্রোপন্থীরা জয়ী হয়ে যাবে।

কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থানরত যুদ্ধ জাহাজ থেকে হেলিকপ্টারে করে প্রথম দফায় ৫০ মার্কিন নৌসেনা সেখানে পৌছে যায়। দুই দিন পরই সেখানে মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা ৪ হাজার গিয়ে পৌছায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে অবরুদ্ধ সেই দেশটিতে নৌ ও সেনা সদস্য মিলিয়ে মোট ২৩ হাজার মার্কিন সৈন্য অবস্থান গ্রহণ করে। এছাড়া আরও প্রায় কয়েক হাজার সৈন্য উপকূলীয় অঞ্চলে যুদ্ধ জাহাজে অপেক্ষমাণ ছিল।

মার্কিন এ তৎপরতা ছিল চার্টার অব দ্য অর্গাইনাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের চুক্তির বরখেলাপ।

মার্কিন সৈন্যরা ডোমিনিকান সৈন্যদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি ও খাদ্য সরবরাহ ছাড়াও তাদের বেতনভাতা পর্যন্ত প্রদান করেছে। ফলে এটিকে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপ না বলে উপায় ছিল না। এক পর্যায়ে এসে মার্কিন সৈন্যরা ডোমিনিকান সৈন্যদের পালিয়ে যেতে সহায়তা এবং বিদ্রোহীদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর সুযোগ করে দেয়।

গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ডোমিনিকান রিপাবলিকে আসা বিভিন্ন মার্কিন প্রতিনিধি দল সংবিধানপন্থীদের কমিউনিস্ট আখ্যায়িত করে এ মর্মে অপপ্রচার চালিয়েছে যে, বিদ্রোহীরা জয়ী হলে দেশটির অবস্থা চরম আকার ধারণ করবে। সেখানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার নানা রকম কল্পকাহিনী প্রচার করেছে। তাদের বলশেভিকদের অপভ্রংশ আখ্যায়িত করে বলেছে, ক্যাস্ট্রোর কায়দায় তারা গণহত্যা চালাচ্ছে। বিদ্রোহীরা তাদের হাতে নিহতদের মস্তক দন্ডাগ্রে ঝুলিয়ে রাজপথ প্রদক্ষিণ করছে। অবশ্য সেসব প্রচারণার বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মার্কিন সৈন্যরা ১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডোমিনিকান রিপাবলিকে অবস্থান করেছিল। ১৯৬৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জুয়ান বচ বিস্ময়করভাবেই জেয়াকিন বালাগুয়েরের কাছে হেরে যান। পরবর্তী পাচটি বছর চরম বিশৃঙ্খলা আর হিংসাত্মক পরিবেশের মধ্য দিয়ে কাটায় ডোমিনিকানবাসী। এ অভিজ্ঞতা তাদের মনে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষাকে তীব্র করে তোলে। তারা চাইতে শুরু করে সমাজে একটি নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হোক, বিদেশী হস্তক্ষেপ বন্ধ হোক, রাস্তায় রাস্তায় যেন সৈন্যরা টহল না দিয়ে বেড়ায়, কোনো সান্ধ্য আইন যেন বলবৎ না হয়। টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং হত্যাকান্ডের ঘটনা যেন বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি মার্কিনিরা প্রচার চালাচ্ছিল, সংবিধানপন্থীরা এবং বচ হচ্ছেন কমিউনিস্টদের সহযোগী। তাছাড়া ডোমিনিকান সেনাবাহিনীতে তখনো পর্যন্ত ট্রুজিল্লোপন্থীরাই ছিল প্রভাবশালী।

এমনি পরিস্থিতিতে বহু ভোটারই বচের নির্বাচিত হওয়াটাকে একটি বিপদ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। তারা ভাবতে থাকেন ভোট দিয়ে বচকে নির্বাচিত করা হলে নতুন করে আবারও তাদের জীবনে দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচনের কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে এলেও বচ নিজে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে তিনি নিজের ঘর থেকেই বের হতেন না। জোয়াকিম বালাগুয়ের পরবর্তী বারোটা বছর বেশ দোর্দন্ড প্রতাপেই কেতাবি লাতিন আমেরিকান কায়দায় ডোমিনিকান রিপাবলিক শাসন করেন। এ সময় ধনীরা আরও ধনী হয় আর গরিবের ঘরে জন্ম নিতে থাকে গরিবতর শিশু।

গণতন্ত্রের ধারণাটি হয়ে পড়েছিল সুদূরপরাহত। পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর লোকেরা যখন তখন লোকজনকে ধরে নিয়ে যেত। বিরোধীরা নির্যাতন এবং হত্যাকান্ডের শিকার হতো। শ্রমিক সংগঠকরা হয়ে পড়েছিল ভীতবিহ্বল। তবে দেশ থেকে কমিউনিস্ট ভীতি বিতাড়িত হওয়ার কারণে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। যার সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারী ডোমিনিকান রিপাবলিকে বিনিয়োগ করতে শুরু করে।।

(চলবে…)