Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিস্মৃত বীরেরা (দ্বিতীয় পর্ব)

বিস্মৃত বীরেরা (দ্বিতীয় পর্ব)

LAST 4(বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও তার অধিকাংশই যতো না বস্তুনিষ্ঠ তার চেয়ে অনেক বেশি আবেগাক্রান্ত এবং পক্ষপাতদুষ্ট। ইতিহাসের সঠিক অনুসন্ধান এবং ঘটনার পাত্রপাত্রীদের সঠিক ভূমিকা মূল্যায়ন ও বিচার বিশ্লেষণভিত্তিক লেখা খুবই কম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লুডেন নির্মোহ দৃষ্টিতে ইতিহাস সম্মত বিশ্লেষণে ‘ফরগটেন হিরোস’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন যাতে যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং প্রেক্ষাপট তৈরিকে অনিবার্য করে তুলেছিল, সে সব বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর এটি ছাপা হয়েছিল ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনের ২০০৩ সালে জুলাইআগস্ট সংখ্যায়। লেখাটি এখনো প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় তার বাংলা অনুবাদ তিন পর্বে ছাপা হবে। এবারে ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব।)

১৯৬৯ সালে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নতুন এক গণআন্দোলনের সূচনা হয়। তাতে ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পাশাপাশি আবেগমথিত কণ্ঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদেরও ডাক দেয়া হয়। জানুয়ারির ৪ তারিখে নতুন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (এসসিএসপি) পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের লক্ষ্যে ১১ দফা সনদ ঘোষণা করে এবং ‘জাগো, জাগো বাঙালি জাগো,’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ প্রভৃতি ধ্বনিতে স্বাধীনতার ডাক দেয়। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনির পরিবর্তে এ সময় ‘জয়বাংলা’ ধ্বনিটি সর্বসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ জানুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল এক জনসভার আয়োজন করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা তোফায়েল আহমদ এতে সভাপতিত্ব করেন। সভায় শেখ মুজিবকে জাতীয়তাবাদী উপাধি ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত করার জন্য তোফায়েল আহমদ প্রস্তাব করেন। সমবেত উদ্বেলিত জনতা কর্তৃক তা গৃহীত হয়। রেসকোর্সের সব প্রান্ত থেকে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে এবং গণমাধ্যমগুলোতেও তা গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হতে থাকে।

সেদিন থেকেই ছাত্রদের কর্মকাণ্ডের গণসম্পৃক্তির পাশাপাশি শেখ মুজিবের সম্মোহনী ভাবমূর্তি ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাধীনতার প্রশ্নে এই দু’পক্ষের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত অভিন্নতা না থাকলেও এই আন্দোলন শেখ মুজিবকে যেমন শক্তি যোগাচ্ছিল তেমনি তিনিও ছাত্রদের আশাভরসার স্থলে পরিণত হন এবং তাদের আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন যোগাতে থাকেন। গণআন্দোলনের ওপর আস্থাশীল হয়ে বঙ্গবন্ধু এভাবেই তার সংবিধানপন্থী রূপরেখাটিকে এগিয়ে নেয়ার কাজে তৎপর হন। ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ তিনি রাওয়ালপিন্ডি গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ফেডারেশন পরিকল্পনার ৬ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা প্রস্তাবটিকে পাকিস্তান ভেঙ্গে ফেলার পরিকল্পনা অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানে আলাদা দুটি রূপরেখার ধারণা চলমান ছিল। তবে ১৯৬৯ সালে এসে পশ্চিম পাকিস্তানের সামনে সে দুটি ধারার মধ্যে কোনো রকম ভিন্নতা আর দৃশ্যমাণ ছিল না এবং ১৯৫৪ সালে না হলেও অন্তত ১৯৬৬ সাল থেকেই এমন একটি অবস্থা সেখানে বিরাজমান ছিল বলে মনে করা যায়। ১৯৬৯ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু উভয় ধারারই প্রতিনিধিত্ব করতে থাকেন যদিও তিনি নিজে সংবিধানপন্থী ধারাটির পক্ষেই ছিলেন।

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। নভেম্বরের ২৮ তারিখ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, পরের বছরই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এক ব্যক্তি এক ভোট নীতির অধীনে এক কক্ষ বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ে ১৬২টি আসন এবং অপ্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৫টি মহিলা আসন। তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির ঝড়ো অধ্যায়ের সূচনা এবং স্বাধীনতা পরিকল্পনার দুটি রূপরেখাই অবিচ্ছেদ্যভাবে পরস্পর অঙ্গীভূত হয়ে যায়।

নিজের ফেডারেল পরিকল্পনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর রেডিও পাকিস্তানের মাধ্যমে এক নির্বাচনী বক্তৃতায় শেখ মুজিব একটি ফেডারেল সংবিধান প্রণয়নে পাকিস্তানের ভোটারদের সহযোগিতা চাইলেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের মতোই নাটকীয়ভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর একবার পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যের চিত্রটি তুলে ধরলো। ফলে পূর্বাংশের স্বাধীনতার দাবিটি আরো বেশি জোরালোভাবে উচ্চারিত হতে থাকলো।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারের কাছ থেকে যে সাহায্য পায় তা কেবলই নামমাত্র। ২৩ নভেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় মওলানা ভাসানী বলেন, আগেকার ঘটনাসমূহ এবং ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্তদের প্রতি সরকারের বর্তমান নির্বিকারত্ব এটাই প্রমাণ করে, পাকিস্তান ইতোমধ্যেই কাণ্ডজ্ঞানহীন এক নির্বোধে পরিণত হয়েছে। ‘পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি উচ্চারণ করে তিনি তার বক্তৃতা শেষ করেন। এর তিনদিন পরই ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত অঞ্চল সফর করে এসে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব এই মর্মে ঘোষণা দেন, ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্তদের সাহায্য প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের এই ব্যর্থতা যতোটানা ইয়াহিয়া খান শাসনের ব্যর্থতা, তার চেয়ে বেশি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। পূর্ব পাকিস্তানকে অবশ্যই তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করতে হবে। সম্ভব হলে ভোটের মাধ্যমেই। আর যদি প্রয়োজন হয় তবে বুলেটের মাধ্যমে বলেও তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন। এক সপ্তাহ পর ৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবি তোলে এবং নতুন দুটি স্লোগান দিতে শুরু করে। স্লোগান দুটি যথাক্রমে : ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এবং ‘গণবাহিনী তৈরি কর (জনগণের শক্তি) বাংলাদেশ স্বাধীন কর’।

এভাবেই ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের সময় পূর্ব এবং একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের মনের মধ্যে স্বাধীনতার দুটি রূপরেখাই এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের মাধ্যমে একাকার হয়ে যায়। তারপরও তাদের অভিন্ন বলা যায় না, কারণ রাজনৈতিকভাবে তারা একীভূত ছিল না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল ৬ দফা ভিত্তিক ফেডারেল শাসনের পক্ষে জনমতের আনুষ্ঠানিক সমর্থনের প্রতিফলন। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়ী হয় এবং ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে।

আগে সাংবিধানিকভাবে যে জনপ্রিয় আবেদনটি ছিল তা আবার ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নিজস্ব চেহারায় যথাস্থানে আবির্ভূত হয়। ওই দিন রমনার রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সব জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এক সভায় মিলিত হয়ে আওয়ামী লীগের ৬ দফা এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত ১১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন। দুটি কর্মসূচিকেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উপর অর্পিত জনগণের আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আজকের দিনে পেছন ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের প্রথমদিককার ঘটনাগুলোই বস্তুত একটি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান টিকে থাকার সব ধরনের বাস্তব সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি সে সময় এতটা নিশ্চিত বলে মনে হয়নি। এমনকি শেখ মুজিবের কাছেও তা সেভাবে ধরা পড়েনি। তিনি তখনো তার ফেডারেশন পরিকল্পনায় স্থির ছিলেন, যেটি সাংবিধানিক নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত নির্বাচনী বিজয় ও বিপুল জনসমর্থনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে। সব দিক বিবেচনায় তখনো তার আশাবাদী থাকার কথা। কিন্তু দ্রুতই হতাশার নতুন কারণ হাজির হতে শুরু করলো।

মার্চ মাসের ৩ তারিখে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে বলে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার মাত্র তিনদিনের মাথায় জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা দেন, আওয়ামী লীগের ৬ দফা প্রস্তাবের মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যাদি যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা না হয় তবে তার দল ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারবে না। ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে শেখ মুজিব ভাষা শহীদদের স্মারক ঢাকার শহীদ মিনারে যান এবং ৬ দফার ভিত্তিতে প্রণীত পাকিস্তানের ফেডারেল শাসন ব্যবস্থার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এই ঘোষণাও দেন যে, বাঙালির অধিকার ও স্বার্থের বিরুদ্ধে যদি কোনো রকম চক্রান্ত চালানো হয় তবে তা মোকাবেলার জন্য সব বাঙালিকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। ঠিক পরের দিনই সেই চক্রান্তের আবির্ভাব ঘটে ইয়াহিয়া খান তার মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিয়ে জেনারেলদের নিয়ে এক সভা করেন এবং সঙ্কট সমাধানে নিজস্ব পথে এগুনোর সিদ্ধান্ত নেন।

এর দু’দিন পরই ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘোষণা দেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও স্বশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে লড়াই চালিয়ে যাবে। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ শেখ মুজিব পাকিস্তানের জন্য নতুন একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে তাকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সব নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ঢাকা অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। একই দিনে জেডএ ভুট্টো তার দল ঢাকা অধিবেশন বর্জন করবে বলে হুমকি দেন। এর পরদিনই ১ মার্চ ১৯৭১ ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন।

অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক গণআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগ পরিষদীয় দলের সভা চলাকাল বাইরে সমবেত হাজার হাজার মানুষ অতিদ্রুত সার্বভৌম জাতীয় স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য শেখ মুজিবের প্রতি দাবি জানাতে থাকে। বিক্ষুব্ধ জনতা পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে ফেলে। ছাত্র নেতারা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগাম পরিষদ নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। এর নেতা নূরই আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনে যৌথ নেতৃত্ব প্রদানের ঘোষণা দেন।

স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণাটি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেই প্রথম রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর সাংগঠনিক শক্তি ও গণআবেদনের বিষয়টি এতদিন সাংবিধানিকতার বাইরে এর উৎসস্থল ছাত্রদের মধ্যেই সীমিত ছিল। এ ছাত্র সংগঠনগুলোই এর উত্থানে এতদিন শক্তি যুগিয়েছে। কিন্তু এখন এটি সরকারি মহলের প্রভাবশালী বাঙালির মধ্যেও সাড়া জাগাতে শুরু করে। মার্চ মাসের ২ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ঢাকা শহর ও এর আশপাশ এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এসে জড়ো হয়। জনতা জাতীয় স্বাধীনতার পক্ষে সুর তোলে। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ভাবগম্ভীর পরিবেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সমবেত হর্ষোৎফুল্ল জনতার মুহুর্মুহু – ‘জয়বাংলা’ ধ্বনির মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পরদিন ৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করে। সেখান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত একটি ইশতেহার (ঘোষণাপত্র) পাঠ করা হয়। ইশতেহারে বলা হয় – ‘জয়বাংলা : স্বাধীনতার ঘোষণা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হল। এটি এখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। ৫৪,৫০৬ (বর্গ) মাইল আয়তনের এই ভূখন্ডটির নাম বাংলাদেশ…’। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিটি গ্রাম, শহর ও নগরে প্রতিরোধ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তারা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে থাকেন।

মার্চ মাসের ৪ তারিখ সারা পূর্ব পাকিস্তানে এক সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং গণমাধ্যম তাদের কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখে। বাঙালিবিহারি সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা এবং চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকায় সেনাবাহিনীর আক্রমণের মধ্যদিয়ে আসন্ন যুদ্ধের হিংসাত্মক আলামত দেখা দিতে শুরু করে। মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে জাতীয় স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান করেন। মার্চ মাসে ৫ তারিখ পাকিস্তান সেনাবাহিনী টঙ্গীতে ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর গুলি চালায়। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আক্রমণে এবং বিভিন্ন স্থানে বাঙালিবিহারী দাঙ্গায় আরও বহু মানুষ মারা যায়। বিক্ষোভকারীরা সেনাবাহিনীর চলাচল রোধ করার জন্য রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং টঙ্গীর কাঠের পুলটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ঢাকায় ছাত্ররা লাঠি হাতে বিশাল মিছিল বের করে। বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা জাতীয় স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেন। মার্চের ৬ তারিখে জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত হন। জনতা যশোরে সেনাবাহিনীর পিছু ধাওয়া করে। সেখানে তখন বাঙালিবিহারি দাঙ্গা চলছিল।

গণআন্দোলনের মুখে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, ২৫ মার্চ তারিখে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। তৎসত্ত্বেও আওয়ামী লীগসহ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এমনি এক অবস্থায় শেখ মুজিব হয়তো ভেবেছিলেন, তার ৬ দফা দাবি যদি আবারও প্রত্যাখ্যাত হয় তবে তিনি লাগাতার গণআন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য একটি ভবিষ্যৎ ফেডারেল ব্যবস্থার দ্বার খুলে দিতে পারবেন।।

(চলবে…)