Home » আন্তর্জাতিক » ভারত বিশ্বের প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ॥ এক দশকে ব্যয় বেড়েছে ১৪০ শতাংশ

ভারত বিশ্বের প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ॥ এক দশকে ব্যয় বেড়েছে ১৪০ শতাংশ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, স্টকহোম পিচ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা তথ্য অবলম্বনে

LAST 1অনেক দিক দিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য কমছে। তবে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র রফতানিতে দেশটির শীর্ষস্থান অব্যাহত রয়েছে। আর ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। দুই প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান এবং সেইসাথে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে ভারত এখন তিন গুণ বেশি অস্ত্র আমদানি করছে। গত এক দশক সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ১৪০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ তথ্য পাওয়া গেছে।

অস্ত্র রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষেচীনের অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ১৪৩ শতাংশচীনা অস্ত্রের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে পাকিস্তান (৪১%), বাংলাদেশ (১৬%) ও মিয়ানমার (১২%)…

সিপরি‘র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অস্ত্র রফতানি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সিপরির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১০১৪ সময়কালে আন্তর্জাতিক অস্ত্র রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ৩১ শতাংশ, আর রাশিয়ার ২৭ শতাংশ। ২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ সময়কালে রাশিয়ার অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে চীনের প্রধান অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ১৪৩ শতাংশ, এর ফলে ২০১০১৪ সময়কালৈ দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে। অবশ্য দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। চীনা অস্ত্রের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে পাকিস্তান (৪১%), বাংলাদেশ (১৬%) ও মিয়ানমার (১২%)। চীন ১৮টি আফ্রিকান দেশেও রফতানি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রফতানি বাড়ার কারণও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক ড. আউডি ফ্লর‌্যান্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরেই অস্ত্র রফতানিকে প্রধান পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা হাতিয়ার বিবেচনা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র শিল্পের উৎপাদন বজায় রাখতে সহায়তার জন্য রফতানি ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ানোর দরকার দেখা দিয়েছে।’

কারা কিনছে অস্ত্র

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। দেশটি পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এ খাতে নিজস্ব উৎপাদন শোচনীয় পর্যায়ে। বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ে ভারত অব্যাহতভাবে লজ্জাজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, সেই সাথে দেশটিকে কৌশলগতভাবে অরক্ষিতও করে রেখেছে। সম্প্রতি স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) জানিয়েছে, দুই প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান এবং সেইসাথে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে ভারত এখন তিন গুণ বেশি অস্ত্র আমদানি করে।

আন্তর্জাতিক অস্ত্র হস্তান্তরবিষয়ক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ‘২০১০১৪ সময়কালে ভারত বিশ্বের মোট অস্ত্র রফতানির ১৫ শতাংশ আমদানি করেছে। ২০০৫০৯ এবং ২০১০২০১৪ সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ১৪০ শতাংশ। ২০০৫২০০৯ সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি ছিল চীনের ২৩ শতাংশ কম এবং পাকিস্তানের দ্বিগুণের বেশি।’ ভারতের সামরিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ৬৫ ভাগই আমদানি করা। গত পাঁচ বছরে ভারত বিদেশী অস্ত্র কোম্পানিগুলোকে সরাসরি ১,০৩,৫৩৬ কোটি রুপি (১৬.৭২ বিলিয়ন ডলার) প্রদান করেছে। আর একই সময় রফতানি করেছে মাত্র ২,৬৪৪ কোটি রুপির (৪২৬ মিলিয়ন ডলার) অস্ত্র।

গত ১৫ বছরে ভারতের অস্ত্র আমাদনিতে ব্যয় ১২০ বিলিয়ন ডলার। আগামী দশকে তাদের ব্যয় হবে আরো ১২০ বিলিয়ন ডলার। মোদি সরকার গত ১০ মাস ধরে গলা ফাটিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান দিতে থাকলেও কাজের কাজ এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি। সিপরির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাশিয়া ও ইসরাইল উভয়ের জন্যই ভারত বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। ভারতের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে রাশিয়া (৭০%), যুক্তরাষ্ট্র (১২%) ও ইসরাইল (%)। তবে সরকারি চিত্র দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে প্রতিরক্ষা সরবরাহের দিক থেকে রাশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া থেকে ২৫,৪৪৮ কোটি রুপির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ৩২,৬১৫ কোটি রুপির অস্ত্র।

বাড়ছে এশিয়ায়ও

২০১০১৪ মেয়াদে প্রধান অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের মধ্যে পাঁচটিই এশিয়ার : ভারত (বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ১৫ শতাংশ), চীন (৫ শতাংশ), পাকিস্তান (৪ শতাংশ), দক্ষিণ কোরিয়া (৩ শতাংশ) ও সিঙ্গাপুর (৩ শতাংশ)। এই পাঁচটি দেশ বিশ্বজুড়ে মোট অস্ত্রের ৩০ শতাংশ আমদানি করে। এশিয়ার ৩৪ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করে ভারত যা চীনের মোট আমদানির তিন গুণ। ২০০৫২০০৯ ও ২০১০১৪ মেয়াদে চীনের আমদানি ৪২ শতাংশ কমেছে। সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র গবেষক পিটার ওয়েজম্যানের মতে অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ধারণাপ্রসূত হুমকির কারণে এশিয়ার দেশগুলো অস্ত্র আমদানি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলো সাধারণভাবে আমদানি করা অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল এবং অদূর ভবিষ্যতেও তারা তাই থাকবে।

উপসাগরীয় দেশগুলো পিছিয়ে নেই

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে ২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০১৪ মেয়াদে অস্ত্র আমদানি ৭১ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০১৪ সময়কালে মধ্যপ্রাচ্য আমদানি করেছে ৫৪ শতাংশ অস্ত্র। ২০০৫২০০৯ সময়কালের তুলনায় ২০১০১৪ সময়কালে সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানি চারগুণ বাড়ায় তারা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে। সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র গবেষক পিটার ওয়েজম্যান বলেছেন, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অস্ত্র আমদানির মাধ্যমে জিসিসি দেশগুলো তাদের সামরিক বাহিনী সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করছে। জিসিসি এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যভুক্ত মিসর, ইরাক, ইসরাইল ও তুরস্ক আগামী বছরগুলোতে তাদের অস্ত্র আমদানি বাড়াতে যাচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য

২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ সময়কালে ইউরোপের অস্ত্র আমদানি ৩৬ শতাংশ কমেছে। তবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার ঘটনার কারণে এই প্রবণতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া সীমান্তের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের অস্ত্র আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইএসআইএসের মোকাবিলার জন্য ইরাক ২০১৪ সালে ইরান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র আমদানি করেছে।

২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ সময়কালে জার্মানির অস্ত্র রফতানি ৪৩ শতাংশ কমেছে। তবে তারা ২০১৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশ কিছু আমদানির চাহিদাপত্র পেয়েছে।

২০০৫২০০৯ থেকে ২০১০২০১৪ সময়কালে আজারবাইজানের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ২৪৯ শতাংশ।

একই সময়কালে আফ্রিকার আমদানি ৪৫ ভাগ বেড়েছে। এ সময় আফ্রিকার বৃহত্তম আমদানিকারক ছিল আলজেরিয়া। এরপর ছিল মরক্কো, এই দেশটির আমদানি বেড়েছে ১১ গুণ।

২০১০১৪ সময়কালে ব্যালাস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের সরবরাহ ও অর্ডার উভয়টাই বেড়েছে, বিশেষ করে জিসিসি ও উত্তর পূর্ব এশিয়ায়।।