Home » রাজনীতি » আগাগোড়া ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্তি :: বিরোধী বিএনপিও কি পারবে ওই পথ থেকে বেরিয়ে আসতে

আগাগোড়া ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্তি :: বিরোধী বিএনপিও কি পারবে ওই পথ থেকে বেরিয়ে আসতে

আমীর খসরু

dis 1ভ্রান্তি বা ভুল আরেকটি কিংবা অসংখ্য ভ্রান্তি বা ভুলের জন্ম দেয়। আর তা যদি হয় কোনো সমাজের বা রাষ্ট্রের সামষ্টিক ভবিষ্যৎ নিয়ে, তবে বিষয়টি যে কতোটা গুরুতর এবং এর প্রভাব যে কতোটা সুদূর বিস্তারি হতে পারে তা অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে অনুমান করা যায় না। তবে এটাও সত্য যে, ভুল যিনি বা যারা করেন, তারা কখনই স্বীকার করেন না। আর এই স্বীকার না করার কারণে যে অস্বীকারের সংস্কৃতিটি ওই সমাজে বা রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে ভুল বা ভ্রান্তি সংশোধন করে সঠিক পথে যাওয়াকেও অসম্ভব করে তোলে। নেতৃত্বের এই সঙ্কটটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই চলে আসছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যদিয়ে জনমনে এই আকাঙ্খার জন্ম হয়েছিল যে, দেশটি হবে জনআকাঙ্খা পূরণের। তাছাড়া জনমনে এই আকাঙ্খারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ সত্যিকার অর্থেই এর সব নাগরিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বল্পকালের মধ্যেই ওই জনগণ নিদারুনভাবে প্রত্যাখাত হয় এবং ক্রমশই শাসন ক্ষমতায় তাদের অংশীদারিত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে। দেশটি চলে যায়, প্রথমে বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার মধ্যে। আর এর ফলে সৃষ্ট সমস্যার কারণে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার পথ ধরে দেশটি অচিরেই চলে যায় পুরো মাত্রার সামরিক শাসন বা সামরিক প্রভাবাধীন সরকার ব্যবস্থায়। যে জনগণ এক সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই জনগণকেই আবার দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে লড়াইসংগ্রাম করতে হয়েছে গণতন্ত্র ও অধিকারের দাবিতে। তারা লড়াইসংগ্রাম এবং এই জাতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী সরকার এবং সামরিক শাসনের হাত থেকে মুক্তির জন্যে। জনগণের এই দুর্ভাগ্যটির সূচনা বেসামরিক শাসকদের ওই ভ্রান্তি বা ভুল থেকেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জনগণকে যদি শাসন ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা না হতো, যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব শাসন ব্যবস্থায় বহাল থাকতো, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো এবং পরবর্তীকালের গণতন্ত্রের জন্য অবিরাম লড়াইসংগ্রাম জনগণকে করতে হতো না। দেশ এবং জনগণের বার বার পিছিয়ে পড়ার সাথে শাসকদের ক্ষমতালিপ্সা যে জড়িত সে বিষয়টি নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই।

এই লড়াইসংগ্রামের এক পর্যায়ে ১৯৯০এর পরে একটি প্রতিনিধিত্বশীল শাসনের মাধ্যমে জনগণের ন্যূনতম অধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। স্বল্পকালের জন্য হলেও জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু বেসামরিক নেতৃত্বের যোগ্যতা, প্রজ্ঞা এবং দক্ষতার সঙ্কটের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অসীম লিপ্সা সেই সম্ভাবনাকে আবার নাকচ করে দেয়। আবারও ভ্রান্তি ও ভুলের খেসারত দিতে শুরু করে জনগণ। দু’বছরের জন্য হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সামরিক শাসন দেশটিকে গ্রাস করে এবং পুরো ব্যবস্থাটি আবার পেছনে ফিরে যায় একেবারে নতুন করে শুরু করার মতো।

এরপরে বেসামরিক শাসনে দেশটি আবার প্রত্যাবর্তন করলেও বেসামরিক শাসকদের ‘যথেষ্ট শিক্ষা’ হয়েছে বলে জনগণের মধ্যে যে ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল, তা অচিরেই পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়। বরং স্বাধীনতার পরের বড় ভুলগুলোর পুনরুত্থান ও পুনরুজ্জীবন ঘটতে থাকে আরও ভয়ঙ্কর রূপে এবং পন্থায়।

২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ থেকে এই পর্ব শুরু হয় এবং জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ক্ষমতাসীনরা ক্রমাগত অগ্রাহ্য করতে শুরু করে। জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় প্রজাতন্ত্রের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার থেকে। আর এ কাজটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ্যের মধ্যে ভীতির সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে অপহরণ, গুম, খুন, ক্রসফায়ারসহ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাঘটতে থাকে। সামগ্রিক ভীতি সৃষ্টির জন্যে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, যৌন সন্ত্রাসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষের বাকব্যক্তি স্বাধীনতাসহ সব ব্যক্তি অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। জনগণের সামান্য যে অধিকার অর্থাৎ ভোটের অধিকারকেও নানা কৌশলে হরণ করা হয়। এর চূড়ান্ত পর্বটি জনগণকে মর্মান্তিকভাবে প্রত্যক্ষ করতে হয় ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে পরে জনগণের জন্য অর্থহীন। জনগণ ক্রমাগত ভোটাধিকারের প্রতি তাদের আস্থা হারিয়ে ফেলে। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করণের এই পর্বে বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষবিহীন একটি পরিস্থিতি ও পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা প্রথম থেকেই জারি রয়েছে এবং এখনো সে অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।

ক্ষমতাসীনদের এসব ভুলের বিপরীতে দাড়িয়ে প্রধান বিরোধী দলটি যে চরম দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, তারও কারণ তাদের ভুল বা ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে সৃষ্ট।

একথাটি বলে নেয়া প্রয়োজন, বিএনপি দল হিসেবে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেই তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। অর্থাৎ সেনট্রিস্ট বা মধ্যপন্থার এই দলটির অন্তর্গত দুর্বলতার কারণে দলের মধ্যে থাকা একদল নেতাকর্মী দলটিকে ডান দিকে ঠেলতে ঠেলতে অনেকটা ডানপন্থার দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ দলের মধ্যে থাকা উদার এবং এককালীন বাম শক্তি ক্রমশ দলটিতে দুর্বল হতে থাকে। এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে এবং এটা বাস্তব যে, দলটি মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন একটি দলে পরিণত হয়েছে। আর পরবর্তীকালের কার্যক্রমে এর প্রতিফলন দেখা যায়। এ বিষয়টিকে অতি অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিচারবিশ্লেষণ করতে হবে।

এই ভ্রান্তি বা ভুল থেকে দলটি বের হতে না পারার কারণে পরবর্তী ভ্রান্তিগুলোর জন্ম নিতে থাকে অনিবার্যভাবে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দলটি প্রথমবারের রাজপথের আন্দোলনসংগ্রামের মধ্যদিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। ক্ষমতার মধ্যে থেকে বেড়ে ওঠা দলটি ক্ষমতার বাইরে থেকে ওই আন্দোলনসংগ্রামের মধ্যদিয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে স্থির থাকতে না পারার কারণে পরবর্তীকালে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের শাসন ব্যবস্থায় বিএনপির যে নমনীয়তা ছিল, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত শাসন ক্ষমতায় এসে তা আর ছিল না। অবশ্য এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ’৯০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দলটি পুরো মাত্রায় ডান দিকে সরে যায়নি। এছাড়া আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত শাসন কার্যক্রমে দলটির নমনীয়তার কারণ ছিল নতুন নেতৃত্বের শাসন কার্যক্রমে অনভিজ্ঞতা এবং প্রথম দফার ভীতি। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তাদের নমনীয়তা ও ভীতির বদলে উল্টোটাই জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে তারা পুরো মাত্রায় ডান দিকে ঝুকে পড়েছে। এ সময় সঙ্গত কারণে দলের অন্তর্গত দুর্বলতার সুযোগে ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রের উত্থান ঘটে এবং একই সাথে দলে ‘তারেক ফ্যাক্টর’ যুক্ত হয়। ওই সময়ে ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রকে এতোটাই বিপন্ন করে ফেলে যে, নেতাকর্মীদের মধ্যে আসল ক্ষমতার কেন্দ্র খুজে পাওয়াই কষ্টকর হয়ে পরে। এরই সুযোগে একদল সুযোগসন্ধানী ওই অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রকে ব্যবহার করতে থাকে যথেচ্ছভাবে এবং ক্ষমতার মূল কেন্দ্র অসহায়ভাবে এই অবস্থাটি প্রত্যক্ষ করতে থাকে। দলের মূল নেতৃত্বের দুর্বলতাটি হচ্ছে কখনোই ওই অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রের ক্ষমতাকে খর্ব করার চেষ্টা তো ছিলই না, বরং চুপ থাকার মধ্যদিয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে।

দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে যাবার সাথে সাথে তারা হয়ে পরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখনো ওই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে দলটির মুক্তি মেলেনি। এখনো দলের মূল ক্ষমতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর ভূমিকায় কখনো ঢাকা এবং কখনো লন্ডন এমন অবস্থা চলছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমানতা এবং স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপরাগতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির আগেপরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে ওই সময় আন্দোলনের যে তীব্রতা দেখা দিয়েছিল, ঠিক বিপরীত অবস্থাটি ছিল কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের। আবার হঠাৎ করে দৃশ্যপট থেকে ওই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উধাও হয়ে যাওয়া পরবর্তী পরিস্থিতিতে সবচাইতে বেশি বিপদগ্রস্ত হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দলটি ওই বিপর্যয় থেকে এখনো বের হতে পারেনি। এক বছর চেষ্টার পরেও দলটি আর সচলসজীবভাবে উঠে দাড়াতে পারেনি। এ কারণে আন্দোলনসংগ্রামের ডাক দিয়েও বিএনপি সফল হতে পারছে না।

এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণে দুটো বিষয় স্পষ্ট এক, জনগণের সাথে দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে কার্যত ২০০১ থেকে এখনো পর্যন্ত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও অগোছালো বিএনপি যতোটুকু আন্দোলন করতে পেরেছে তার সবই ছিল ব্যক্তি, পরিবার কেন্দ্রীক বিষয়ে। জনসম্পৃক্ত বিষয়ে তাদের কখনোই আগ্রহী দেখা যায়নি। এতে তাদের সমর্থকসহ জনগণের মধ্যে ওই দলটির নেতৃত্ব সম্পর্কে আস্থাহীনতা বেড়েছে। আর এ কারণে এই পর্যায়ে এসে দলটি জনসম্পৃক্ততা ঘটাতে পারছে না। দুই, ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রসহ নানা অন্তর্গত দুর্বলতার কারণে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীদের মধ্যেও ওই ২০০১ থেকেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে। আবার দলটির উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও এ কারণে রয়েছে নানা অনীহা এবং অনাগ্রহ।

এমনই এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দোদুল্যমান ও কর্মী এবং জনবিচ্ছিন্ন বিএনপি ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও তাদের দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীতার পরিস্থিতি যে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান তা বোঝা যায়, দলটি সরাসরি নির্বাচনে না এসে শত নাগরিক নামে তাদেরই একটি অঙ্গসংগঠনের ছাতার তলে আশ্রয় নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তোলা কতোটা সম্ভব হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও তারা ওই কৌশল হিসেবেই গ্রহণ করেছিল।

ভ্রান্তি ও ভুলের রাজনীতির মধ্যে দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী পক্ষও ওই ভ্রান্তি থেকে বের হতে পারেনি। বিশেষ করে বিএনপি বিরোধী দলে থেকে ওই ভ্রান্তির মধ্যে থাকায় সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি কি আদৌ এই ভ্রান্তি থেকে কখনোই আর বের হতে পারবে?