Home » শিল্প-সংস্কৃতি » উৎসব যখন পরিণত হয় যৌন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে

উৎসব যখন পরিণত হয় যৌন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে

ফ্লোরা সরকার

boishakh-976783একটি রাষ্ট্রে যখন কোনো স্তরেই কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকে না, তখন সেখানে যে কোনো সময় যে কোনো ধরণের অন্যায় কাজ ঘটতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যখন একটা দেশে ক্রমাগত ভাবে অন্যায় ক্ষমা পেয়ে যায়, তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেয়া যায় ক্রমাগতভাবে ঘটবে অন্যায়। কারণ অন্যায়কারী যখন দেখতে পায় অন্যায়ের সঠিক বিচার হয়না বা হলেও অপরাধী ছাড়া পেয়ে যায়, সে অধিকতর প্রশ্রয় পায় অন্যায় করার জন্যে। কেউ একদিনে অপরাধী হয়ে উঠে না, এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইতিহাস।

নৈতিক মূল্যবোধ সমাজের সংস্কৃতি থেকেই উঠে আসে। সাধারণ ভাবে সংস্কৃতি বলতে আমাদের যা বোঝানো হয় তা হলো, নাচ,গান, নাটক, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। যেমন, কোথাও কোনো নাচগাননাটকের অনুষ্ঠান হলে আমরা বলি ‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটিকে এভাবে ব্যবহারের কারণে আমরা শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। একবারও ভেবে দেখিনা এই নাচ,গান, নাটক কোত্থেকে উঠে এসেছে। নাচ, গান জীবনেরই অংশ। এসব জীবন থেকেই উঠে আসে। জীবনের বাইরে কোনো সাহিত্য বা নাটক নেই। এই জীবন ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে সামাজিক, বৈশ্বিক সবকিছুর অন্তর্ভুক্ত। এখন বিশেষ একটা সমাজের সংস্কৃতি বলতে আমরা কি বুঝি? একটা বিশেষ সমাজের সংস্কৃতি বলতে সেই সমাজের মানুষের সামগ্রিক জীবনাচার অর্থাৎ ভাষা এবং কথা বলার স্টাইল বা রীতি, আদবকায়দা, পোষাকআশাক, ঘরবাড়ির সাজসজ্জ্বা, আচারআচরণ, খাদ্য, সব মিলিয়ে চলাবলা ইত্যাদি। তাছাড়া সামাজিক দিক যেমন নরনারীর সম্পর্ক, বিয়েশাদি, পারিবারিক সম্পর্ক, আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি। দীর্ঘদিনের পচেষ্টায় একটা সুস্থস্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যে কোনো সমাজ ব্যবস্থা বোঝার জন্যে এসব চিহ্ন বা লক্ষনই যথেষ্ট। একটি পরিবারে বা পাড়ায় যখন কোনো অন্যায় সংঘঠিত হয় এবং সেই পরিবারের সদস্যরা যখন দেখতে পায় যে অন্যায়ের প্রতিকার দূরে থাক, সেই অন্যায় সবাই স্বাভাবিকভাবে দেখা হচ্ছে বা মেনে নেয়া হচ্ছে, তখন সেই সদস্যরা সেই অন্যায়কে ন্যায় বলেই ধরে নেয়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট করা যাক। আমাদের দেশে ঘুষ, দুনীর্তি এখন এতোটাই স্বাভাবিক যে, কোনো কাজ আদায় করতে গেলে ধরেই নেয়া হয়, সেখানে ঘুষ দিতে হবে, এটাই নিয়ম। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ উদ্ধারের কথা কেউ এখন ভাবতেই পারেনা, যারা ভাবে, সমাজ তাদের অসুস্থ বলে মনে করে, আর এটি সাধারন ধারনা। এখানে ধর্ষণের যেমন সঠিক বিচার হয়না, তেমনি হয়না রোড অ্যাক্সিডেন্টের ড্রাইভারদের। এরকম আরো অনেক হাজারো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। এভাবে অনিয়ম যখন নিয়মে পরিণত হয়, দুনীর্তি যখন নীতি হয়ে যায়, সুক্ষতা যখন স্থুলতায় রুপান্তরিত হয় তখন মানুষের ভেতরকার ন্যায়অন্যায় বোধ একাকার হয়ে যায়, যার প্রতিফলন গত পয়লা বৈশাখের যৌন সন্ত্রাসী ঘটনার মধ্যদিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি।

মানুষকে হীন বা অপদস্ত করার সব থেকে বড় অস্ত্র তার শরীরে আঘাত করা। তার থেকে বড় অস্ত্র তার পরিধেয় বস্ত্র টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেলা। আর তিনি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই। যে কাজটি সম্প্রতি পয়লা বৈশাখের দিন, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দুই নম্বর গেইটের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই করা হয়েছে। এবং বিবস্ত্র করা হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন নারীকে এবং এরা যৌন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। সব থেকে যা বিস্ময়কর তা হলো, প্রচুর মানুষের ভিড়ের মাঝেই কাজটি করা হয়েছে এবং আশেপাশের একজন মানুষও সেই নারীদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র ইউনিয়েনের নেতা লিটন নন্দী, এই দৃশ্য দেখে নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি। দৌঁড়ে বিপন্ন নারীদের যাদের পরিধেয় বস্ত্র ইতিমধ্যেই খুলে ফেলা হয়েছিলো তাদের উদ্ধার করতে যান। এই উদ্ধার কাজে তার একটি হাতও ভেঙ্গে ফেলা হয়। লিটন তার পরিধেয় পাঞ্জাবি মেয়েটিকে পরিয়ে কোনো রকমে একজনের লজ্জ্বা নিবরণ করে তাকে হলে পৌঁছে দেন। তারপর শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আসা আরও একজনের উপর হামলা হতে দেখেন। তিনি আরও দেখতে পান একজন নারীর কাছ থেকে সেই শিশুকে কেড়ে নিয়ে তাকেও বিবস্ত্র করা হয়। ওই নারীকে উদ্ধার করতে যান লিটন। এসব বিবরন পত্রিকায় দেয়া তার সাক্ষাতকার থেকে বিস্তারিত জানা যায়। তাছাড়া সোশাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুকে পরের দিন ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের একযোগে প্রতিবাদ সভার প্রকাশিত ভিডিও থেকে আরো তথ্য জানা যায়। লিটন জানান, তখন আরো মেয়েদের উপর এই তান্ডব চলছিলো। একা এবং তার সঙ্গে পরে যুক্ত হওয়া হাতেগোনা কয়েকজন সবার সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। এই তান্ডব চলে প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে, বিকেল ৫.৩০ থেকে সন্ধা ৭ টা পর্যন্ত। আরও যা বিস্মিত করে তা হলো, সেখানে প্রহরারত পুলিশ এক কদমও এগিয়ে আসেনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলীকে লিটন অভিযোগ করতে গেলে (যিনি নিশ্চিন্তে তখন কম্পিউটারে দাবা খেলছিলেন) তিনি বলেন, ‘আমি গেলেই বা কি করতে পারতাম’! পরবর্তীতে যাওবা কয়েকজন অভিযুক্তকে ধরিয়ে দেয়া হয় পুলিশের কাছে, সবাইকে তখনই ছেড়ে দেয়া হয়। এখন যদিও বলা হচ্ছে, সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ থেকে অভিযুক্তদের বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো ধরিয়ে দেয়ার পরেও যেখানে তারা ছাড়া পেয়ে যায়, সেখানে নতুন করে অভিযুক্তদের কিভাবে ধরা হবে? এভাবেই আমাদের সমাজে অন্যায় প্রশ্রয় পেয়ে চলেছে। অন্যায় কতটা প্রশ্রয় পেলে জনগণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কর্ণধারেরাও নীরব ভূমিকা পালন করে তার প্রমাণ এই ঘটনা। অথচ বুদ্ধিজীবি নামধারীরা কোথায়?

একজন নারী যখন শারীরিক ভাবে আক্রমণের শিকার হন, সেই নারী শুধু সেই সময়ের জন্যেই অপমানিত হন না, সেই অপমান তাকে সারা জীবন তাড়া করে বেড়ায়। শুধু সমাজে মুখ দেখাবার লজ্জায় নয়, নিজের কাছ থেকে এই লজ্জ্বা সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনা কোনোদিন। ২০০১ সালে, নিউ ইয়ারের রাতে, বাঁধন নামের মেয়েটিকে কিন্তু আমরা আর কোনোদিন দেখিনি। তার কোনো খোঁজও আমরা জানিনা। য়ারা সেদিন তাকে অপমান করেছিলো তারা কিন্তু এই সমাজে বুক ফুলিয়ে আজও ঘুরে বেড়ায়। কোনো শাস্তি হয়েছে বলেও জানা যায়নি। ঘুষ গ্রহণের মতো নারীর শালীনতাহানিও যেন একটা স্বাভাবিক বিষয়। আর এভাবেই সমাজে অন্যায়ের পাহাড় জমা হতে থাকে। একটা সমাজের সাংস্কৃতিক মান কোন স্তরে পৌছেছে, এসব ঘটনাই তা বলে দেয়। নরনারীর সম্পর্ক বলতে আজও আমাদের যা বোঝানো হয় তা হলো শুধু যৌনতাই নয়, বিকৃত যৌনতা। বহুদিনের পুঁঞ্জিভূত সামাজিক অবদমন, অশিক্ষা, স্থুল চিন্তা, বিচারহীন অন্যায় ব্যবস্থা ইত্যাদি তরুণ সমাজকে ক্রমেই এসব অপকর্মেঅপকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করছে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তা আরো বাড়ে। কাজেই এখনই সময় এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার, সময় এসেছে কিছু বিপদকামী তরুণদের হাত থেকে সমাজ, সংস্কৃতিকে রক্ষা করার। তবে এই কতিপয় তরুণের এই অধপাতের জন্য প্রধানত রাষ্ট্রব্যবস্থা, শাসক শ্রেণী এবং নির্ভরশীল পুঁজিপতিকেন্দ্রীক আর্থিক ব্যবস্থাকেই দায়ী করতে হবে। এর বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ানোরও এখনই সময়।