Home » অর্থনীতি » কৃষি পণ্যের দরপতন :: গ্রামে মন্দা, সংকটে কৃষক

কৃষি পণ্যের দরপতন :: গ্রামে মন্দা, সংকটে কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর থেকে

dis-5কৃষি পণ্যের দর পতনে দক্ষিণ পশ্চিমের জেলাগুলোতে কৃষক চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। দফায় দফায় ধানের দরপতনে চাষি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যারা অপরের জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছেন, তাদের এখন মাথায় হাত। বাজারে ধানের ক্রেতা মিলছে না। আড়াই মাসের ব্যবধানে প্রতি মন মোটা ধানের দাম দেড়’শ টাকা থেকে দুশো টাকা পর্যন্ত কমেছে। এখনও গোলা ও ঘরে বিপুল পরিমান ধান মজুত রয়েছে। জেলাগুলো হচ্ছে মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা। আমন মৌসুমে এসব জেলায় প্রায় ৩০ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছিল বলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সুত্রের খবর।

চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জানুয়ারি মাসের প্রথমে প্রতিমন মোটা ধান রত্না, স্বর্ণা ও বিআর৩৩’র দাম ছিল সাড়ে ৭’শ টাকা থেকে ৮’শ টাকা। বর্তমানে ওই জাতের ধানের দাম প্রতি মন ৬’শ টাকায় নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও ৬’শ টাকার কমেও বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম নির্ভর করে অটোচালকল ও চাতাল ব্যবসায়ীদের চাহিদার উপর। হরতাল অবরোধ শুরুর পর ধান চালের ব্যবসায়ে ধ্বস নেমেছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের চালের প্রধান মোকাম হচ্ছে কুষ্টিয়ার খাজানগর। তাছাড়াও ঝিনাইদহের শৈলকুপা, হাটগোপালপুর, ডাকবাংলা, কালীগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, সদর ও আলমডাঙ্গা, যশোরের চৌগাছা, পুরাপাড়া, নাভারন, নওয়াপাড়া, ঝিকরগাছা, মাগুরা সদর, আড়পাড়া ও শত্রুজিতপুরে অটো রাইচ মিল ও চাতালে চাল তৈরি হয়। আগে এসব রাইচ মিল ও চাতালে তৈরি চাল ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান যেত। পেট্রোল বোমা হামলার ভয়ে ট্রাক মালিকদের অনেকেই রাস্তায় ট্রাক নামাতে ভয় পান। ফলে চালের চালান পাঠানো কমে যায়। অটো রাইস মিল ও চাতাল মালিকদের গুদামে বিপুল পরিমান ধান চাল মজুত রয়েছে। খাজানগরের এক চাল ব্যবসায়ী জানান, তাদের ৫টি অটো মিলের মধ্যে ৪টি বন্ধ রাখা হয়েছে। দেশে চালের এ বৃহৎ মোকামে অধিকাংশ চাল কল ও চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছে কমপক্ষে ৩০ হাজার চাতাল শ্রমিক। বেকার শ্রমিকেরা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। এদের বেশির ভাগই নারি শ্রমিক। এসব শ্রমিকেরা দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন। অন্যান্য চালের মোকামগুলোতেও একই অবস্থা চলছে। ঝিনাইদহের ডাকবাংলার এক মিল মালিক বলেন, লোকসান এড়াতে তিনি তার ২টি অটো রাইস মিল বন্ধ রেখেছেন।

গুদামে প্রচুর চাল মজুত রয়েছে। মোটা চালের ক্রেতা নেই। মোটা চাল প্রতি কেজির দাম ২৪ থেকে ২৫ টাকায় নেমে এসেছে। চিকন চালের চাহিদা থাকলেও দ র পতন হয়েছে। বাজারে মোটা ও চিকন চালের দামের ফারাক ২০ থেকে ২২ টাকা। কথিত মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের চাষি আবু সালেহ বলেন, এক’শ মনের বেশি আমন ধান পেয়েছিলেন। স্বর্ণা জাতের ধান উঠার পর প্রতি মন সাড়ে ৭’শ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। কয়েক দিন আগে ৬’শ টাকা মন দরে বিক্রি করেছেন। এখনও গোলায় ৩৫ থেকে ৪০ মন ধান আছে। বোরো ধান উঠতে শুরু করছে। আরো দর পতনের আশংকা কৃষকের। শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের মাসুদ রেজা পান্না জানান, ঘরে এখনও প্রায় এক’শ মন ধান মজুত রয়েছে। অন্যান্য বছর এ সময় ধানের দাম বাড়ে। চাষি ধান বিক্রি করে বোরা আবাদের সার, কীট নাশক ও সেচের পানি খরচ যোগায়। এবার তা হয়নি। গত বছর এ সময় প্রতি মন মোটা ধান ৮’শ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছিল।

কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলায় তামাক একটি অর্থকরি ফসল। তামাক কোম্পানী গুলোর নানান লোভ দেখায়। কোম্পানীগুলো তামাকের ন্যায্য দাম দিচ্ছেনা। অভিযোগ তারা চাষিদের ঠকাচ্ছে। সুযোগ বুঝে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে চাষিদের কাছ থেকে ফড়িয়া ব্যাপারিরা তামাক কিনছে। চাষির উৎপাদন খরচ উঠছে না।

ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া জেলা ব্যাপক ভুট্টা চাষ হয়েছে। কিন্ত্র দাম পড়ে গেছে। প্রতি মন ৪’শ থেকে সাড়ে ৪’শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মন খুলে কিনছে না, দাম পাচ্ছে না চাষি। দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারি জেলা হচ্ছে যশোর ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া। এবার লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত জমিতে সবজি চাষ হয়। একেবারে ভরা মৌসুমে হরতাল অবরোধ শুরু হয়। সবজির ব্যাপারিরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সবজির হাট গুলোতে আসতে পারেনি। একেবারে পানির দরে সবজি বিক্রি করতে চাষি বাধ্য হয়। মেহেরপুরের উজলপুর গ্রামের চাষি বাবুল মিয়া বলেন, এক সময় সবজি অবিক্রিত হয়ে যায়। কপি গরু দিয়ে খাওয়ায় চাষি। যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর গ্রামের চাষি ইজাজুল ইসলাম বলেন, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মূলা ক্ষেত নষ্ঠ করে বোরো ধান চাষ করেছে চাষি। ধানের দরপতনে চাষি ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে তিনি আশংকা করেন।

যশোর ও ঝিনাইদহ জেলায় প্রচুর ফুলের চাষ হয়। হরতাল অবরোধের জন্য ফুলের চাহিদা একেবারে পড়ে যায়। এক ঝোপা গাদা ফুল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। অনেক চাষি ক্ষেত থেকে ফুল তুলে ফেলে দেয়। রজনীগন্ধা গোলাপ পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। লোকসান গুনতে হয়েছে ফুল চাষিদের।

দেশের প্রধান তুলা উৎপাদনকারি এলাকা হচ্ছে পশ্চিমের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও যশোর। দেশে উৎপাদিত তুলার শতকার ৭০ ভাগ এ অঞ্চলে উৎপাদন হয়। গত বছর সরকার প্রতিমন তুলার (বীজসহ) দাম ধার্য করে ২৫’শ ২০ টাকা। এবার কমিয়ে ১৯’শ ২০ টাকা করা হয়েছে। এতে তুলা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আশংকা করা যাচ্ছে আগামীতে চাষি তুলার চাষ কমিয়ে দিবে।

কৃষি পণ্যের দর পতনের প্রভার পড়েছে গ্রামের অর্থনীতিতে, মন্দা চলছে। চাষির হাতে নগদ অর্থের টান পড়েছে। এ কারনে চাষের জমির দাম কমেছে। যে জমি গত বছর ৫ লাখ টাকা বিঘা বিক্রি হত, সে জমির দর আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায় নেমে এসেছে। কোন কোন এলাকায় জমির ক্রেতা মিলছে না।