Home » বিশেষ নিবন্ধ » কেমন নগর সরকার চাই

কেমন নগর সরকার চাই

. তোফায়েল আহমেদ

LAST 2বিষয়টা কিছুটা বিদঘুটে আবদানের মতো। কী চাই, কীভাবে চাই এবং কার কাছে চাই সবটাই অস্পষ্ট। তবে এটা সত্য যে, যা পাচ্ছি তা পুরোপুরি কাম্য নয়। তাই নিঃসন্দেহে কল্যাণমুখী, সেবামুখী ও গণতন্ত্রমুখী পরিবর্তন চাই। আমাদের প্রচলিত নগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যা ‘পৌরসভা’ ও ‘সিটি করপোরেশন’এর আদলে পরিচালিত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসন ও সেবা ব্যবস্থা বা আধুনিক নগর ব্যবস্থা বিকাশে তা কতোখানি অনুকূল, তা বারবার আমাদের বিভিন্ন রকম প্রশ্নের মুখোমুখি করছে। ইদানীং বাংলাদেশে নগরায়ণ ও নগর উন্নয়ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে আলোচনাগুলোয় নগর সরকারের আইনগত, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত তথা প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে না। এখানে নগরের বৃদ্ধি ও ব্যাপকতা, উন্নয়ন ও পরকল্পনা, পরিবেশ, স্থাপত্য, যোগাযোগ ও যানবাহন, আবাসন, দারিদ্র্য, অভিবাসন এসব বিষয় অনেক বেশি প্রাধান্য পায়। বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় শাসন কাঠামোর আলোচনটাও সমতালে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল।

বাংলাদেশে ‘নগরনীতি’র খসড়া প্রণয়ন যা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৫ সালে সূচনা করা হয়, তাতে আমাদের বিকাশমান নগরগুলোকে ছয়টি বিভিন্ন আকার ও ধরনের নগরে শ্রেণী বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়। যথা মেগাসিটি (৫০ লাখের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা), মেট্রোপলিটন সিটি (৫ লাখ থেকে ৫০ লাখের নিচে জনসংখ্যা), আঞ্চলিক শহর/শিল্প শহর (দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ জনসংখ্যা), মাঝারি বা মধ্যবর্তী শহর বা জেলা শহর (৫০ হাজার থেকে দুই লাখের নিচে), ছোট শহর/উপজেলা কেন্দ্র বা উপজেলা শহর (২০ হাজার থেকে ৫০ হাজারের নিচে) এবং প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র বা গ্রোথ সেন্টার (২০ হাজারের নিচে যেকোনো সংখ্যার জনসংখ্যা)। এভাবে সারাদেশের পুরো এলাকাকে এই বিভাজনে যদি বিভক্ত করা হয়, তাহলে গ্রাম ও শহরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার যে বিভাজন, তা আর থাকে না। থাকে না ওপরনিচ প্রশাসনিক এককের স্তরবিন্যাস। সাথে সাথে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে সৃষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোরও আর প্রয়োজন থাকে না। খসড়া নগরনীতি এবং নগরের এই শ্রেণী বিভাগটি কার্যকর করলে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গ্রামশহরের বিভাজনটি উঠে যাবে এবং একটি এক স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার কাঠামো তৈরির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা শুরু হয়ে যাবে।

দেশ ও সমাজে ক্রমাগত নগরায়ণ প্রক্রিয়ার প্রতি লক্ষ্য রেখে স্থানীয় সরকার ওপরনিচ ও গ্রামশহরে বিভাজন আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই স্বাভাবিক নিয়মেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এ দেশেও পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই স্থানীয় সরকারের একীভূত একটি কাঠামোই থাকতে পারে যা মূলত মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হবে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো নগরায়ণের প্রকার, প্রকৃতি, মাত্রা ও আকার অনুযায়ী মেগাসিটি থেকে গ্রোথ সেন্টার, ছয়টি বিভিন্ন শ্রেণীর একটিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। আবার সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের অবস্থানও পরিবর্তন করবে।

শহর ও গ্রামের বিভক্তি বা প্রশাসনিক বিভাজন রেখা বিলুপ্ত করে স্থানীয় শাসন ও সেবা কাঠামো পরিবর্তনের এজাতীয় কোনো উদ্যোগ নেয়া হলে তা হবে আমাদের শতাব্দীকালের প্রাচীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর একটি মৌলিক সংস্কার। সেই সংস্কারের অংশ হিসেবে বর্তমানে রেগুলেটরি ও উন্নয়ন প্রশাসনের জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের স্তরভিত্তিক কাঠামোর পরিবর্তন হবে, পরিবর্তন হবে মন্ত্রণালয়অধিদফতর, পরিদফতরকেন্দ্রীক সেবা ব্যবস্থাপনার বিন্যাস। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাধীনে জেলাকে মাঠ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু রেখে যে প্রশাসনিক সংগঠন বিন্যাস করা হয়, কালের পরিক্রমায় এখন তা ক্ষয়িষ্ণু। তাই রেগুলেটরি ব্যবস্থায় প্রশাসনের সেই পূর্ব কাঠামো বজায় রেখে উন্নয়ন ও সেবা কাঠামোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী পৌর কাঠামো গ্রহণ করা যায়। বিষয়টি সুদূরপ্রসারী সংস্কারের চিন্তা হিসেবে আপাতত লালন করা যেতে পারে এবং এর ভালোমন্দ নিয়ে আলাপআলোচনা চলতে পারে।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী এএমএম মুহিত তার ‘জেলায় জেলায় সরকার’ শীর্ষক বইটিতে এবং তার ‘জেলা বাজেট’ পরিকল্পনা ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কারের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তাছাড়া নগর শাসন ব্যবস্থা তথা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে কার্যকর, দক্ষ, সেবামুখী করতে হলে এখানে আইন, প্রশাসন, অর্থায়ন ও কাঠামোগত অনেক সংস্কার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বিষয়। এখান থেকে মুখ লুকিয়ে শুধুমাত্র নির্বাচনী ডামাডোলে সীমিত থাকা যাবে না।

কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই ও লন্ডন এই চার শহরের নগর সরকার, তাদের গঠন প্রণালী ও কার্যক্রম সম্পাদনগত যে সব বৈশিষ্ট্য, সে সবের একটির সাথে অন্যটি হুবহু মেলে না। তবু কলকাতা ও লন্ডনের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। আবার অনুরূপ সাদৃশ্য রয়েছে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের মধ্যেও। চারটি আলোচিত নগরের কোনো একটিও অবিকল একই কাঠামোর কাজ করে না। প্রত্যেকের কাঠামোই ভিন্ন। কলকাতা আমাদের বাংলাদেশের অতি কাছের নগর, ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী। কলকাতা মহানগরের সরকার কাঠামোকে বলা হয় ‘মেয়রইনকাউন্সিল’ ব্যবস্থা, যা মূলত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার অনুচিত্র। এ ব্যবস্থাধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তা মূলত কাউন্সিলর নির্বাচন। গত ১৮ এপ্রিল কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের ১৪৪টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচন হয়ে গেল। এ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হবে ২৮ এপ্রিল। কাকতালীয়ভাবে ওই দিনই ঢাকা এবং চট্টগ্রামে আমাদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুটো নির্বাচনের প্রক্রিয়া, পদ্ধতি এবং করপোরেশন কাঠামোতে মৌলিক পার্থক্য থাকছে। কলকাতার ক্ষেত্রে নির্বাচিত কাউন্সিলররা নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে মেয়র নির্বাচিত করবেন। নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়। তাই সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দল থেকে মেয়র নির্বাচিত হন। সেই মেয়র ১০ জনের একটি ‘নির্বাহী পরিষদ’ গঠন করে তাদের মধ্যে দফতর বন্টন করেন। মেয়র একজন ডেপুটি মেয়রও নিয়োগ করেন। কলকাতা সিটি করপোরেশনের সাধারণ কাউন্সিলররা একজন সভাপতিও নির্বাচন করেন। তিনি কাউন্সিল সভায় সভাপতিত্ব করেন। পার্লামেন্টের স্পিকারের মতোই তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সভাপতির পদমর্যাদা ডেপুটি মেয়রের সমপর্যায়ের হলেও তার কোনো নির্বাহী দায়িত্ব থাকে না। সংসদে বিরোধী দলের মতো কাউন্সিলে বিরোধী পক্ষের প্রধানের বিশেষ মর্যাদা থাকে এবং বিরোধী দল বা অদলীয় কাউন্সিলররাও বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকেন, এমনকি কাউন্সিলের বিতর্কেও অংশ নিয়ে থাকেন। কলকাতা সিটি কাউন্সিলে মেয়র পরোক্ষভাবে নির্বাচিত এবং তিনি করপোরেশনের প্রধান রাজনৈতিক নির্বাহী। তার অধীনে প্রেষণে নিয়োজিত ‘মিউনিসিপ্যাল কমিশনার’ ও অন্য কর্মকর্তারা রাজ্য সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হয়ে থাকেন।

কলকাতা করপোরেশনের নিচের দিকে আঞ্চলিক পর্যায়ে বরো কাউন্সিল ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘ওয়ার্ড কমিটি’ রয়েছে। আঞ্চলিক ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ রয়েছে। দিল্লিতে আগের দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন যা এখন ত্রিধাবিভক্ত এবং নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, একই আইনে চলে না। নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে ধরতে গেলে কোনো নির্বাচনই হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ‘কমিশনার’ হিসেবে নিয়োজিত হন। বাকি সবাই মনোনয়নপ্রাপ্ত হয়ে এ করপোরেশনে আসেন। সরকারি কর্মকর্তা এমএলএ, এমপিএ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মোট ১০ থেকে ১২ জনের একটি কাউন্সিল গঠিত হয়।

মূলত ‘কমিশনার’ একটি সরকারি দফতরের মতো করেই নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন পরিচালনা করেন। দিল্লির অন্য তিনটি নবগঠিত করপোরেশন, যা উত্তর দিল্লি, দক্ষিণ দিল্লি ও পূর্ব দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন হিসেবে পুনর্গঠিত হলো, ওই সব সংস্থায় ওয়ার্ড পর্যায়ের নির্বাচনের পর পরোক্ষভাবে মেয়র নির্বাচিত হবেন। তবে মেয়রের নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে সীমিত। কলকাতার মতো ‘মেয়রইনকাউন্সিল’ পদ্ধতি এখানে কার্যকর হবে না। মেয়র হবেন আনুষ্ঠানিক প্রধান মাত্র। সরকার নিয়োজিত ‘মিউনিসিপ্যাল কমিশনার’ হবেন প্রতিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রধান। তবে কাউন্সিল বাজেট পাস, নীতি নির্দেশনাসহ সব কিছু পর্যালোচনা করার অধিকারী। অঞ্চল ভিত্তিক ডেপুটি কমিশনাররা আঞ্চলিকভাবে সেবা ও উন্নয়ন কার্যের জন্য সরাসরি কমিশনারের কাছে দায়ী থাকবেন। তবে দিল্লির কাউন্সিলরা বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ পাবেন। দিল্লির মতো মুম্বাইয়ের মেয়রও নির্বাহী দায়িত্ব প্রয়োগ করেন না। রাজ্য সরকার নিয়োজিত কমিশনার নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন। তবে কাউন্সিলররা পরিষদ সভা ও কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই সর্বত্রই দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সব ক্ষেত্রে মেয়ররা পরোক্ষভাবে কাউন্সিলরদের ভোটে নির্বাচিত হন।

লন্ডন শহরের ব্যবস্থাটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিল্লির অনুরূপ মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। লন্ডনে তিনটি ব্যবস্থা সমান্তরালভাবে কাজ করে। প্রথমত ২.৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ‘সিটি অব লন্ডন’, যা নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মতো ছোট পরিসরে কাজ করে। মেয়র এখানে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না। এটি একটি আলংকারিক পদ। পুরো লন্ডন শহরের একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে একদিকে ‘বৃহত্তর লন্ডন কর্তৃপক্ষ (Greater London Authority) পুরো লন্ডন শহরের ওপর, অন্যদিকে ৩২টি বরো কাউন্সিল পৃথকভাবে নিজস্ব এলাকায় পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল হিসেবে কাজ করে। এখানে ৩২টি বরোর প্রতিটি কাউন্সিলে প্রথমে কাউন্সিলর এবং কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে মেয়র নির্বাচিত হন। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কিংবা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে তখন কোয়ালিশন করে কাউন্সিল পরিচালনা করা হয়। বরোগুলোয় মেয়রইনকাউন্সিল প্রথাই মূলত অনুসরণ করা হয়। তবে বৃহত্তর লন্ডন কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে মেয়র সর্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হন। চার বছর পর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এবার ঢাকা এবং বাংলাদেশের নগর সংস্থাগুলোর কাঠামোর দিকে তাকালে কলকাতা, লন্ডন, দিল্লি, মুম্বাই আর বাংলাদেশের নগরের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। আমাদের শহরগুলোর অর্থাৎ করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়ররা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত এবং এককভাবে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। এখানে সাধারণ কাউন্সিলরদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। আমাদের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো মূলত মেয়রসর্বস্ব। মেয়রই এখানে এককভাবে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। সাধারণ কাউন্সিলারের অংশগ্রহণে সাধারণ সভা সব সময় সঠিকভাবে হয় না। স্থায়ী কমিটিগুলো প্রায়ই নিষ্ক্রিয়। দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের শহরনগরসহ সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ‘রাষ্ট্রপতি শাসিত’ সরকারের আদলে পরিচালিত হয়। এ কারণে এখানে কাউন্সিলর নির্বাচনে ভালো পেশাদার ব্যক্তির সমাবেশ ঘটে না। এখানে ঢাকার ক্ষেত্রে মেয়র পূর্ণ মন্ত্রীর, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে প্রতিমন্ত্রীর এবং বাকিগুলোর ক্ষেত্রে উপমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু কাউন্সিলররা এখানে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হন না। তাছাড়া বাংলাদেশে অঞ্চল বা ওয়ার্ড পর্যায়ে কার্যকরভাবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি। পৌরসভাগুলোর ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অনেক সুযোগ রাখা হয়েছে। তাছাড়া উন্নয়ন বরাদ্দ, নিয়োগ, বদলি ইত্যাদির সুবাদে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ সর্বাধিক। এসব নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কোথাও আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষিত হয় না, সরকারিভাবে নিরীক্ষা ও মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত, নগর পরিকল্পনার আইন কাঠামো বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রায় না থাকারই মতো। তাছাড়া শহরাঞ্চলে শহরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নাগরিক সংগঠনের কার্যক্রম, সর্বোপরি নাগরিক সংস্কৃতি এবং সিভিক সেন্স তুলনামূলকভাবে নি¤œমানের। তাই সামগ্রিকভাবে ‘নগর সরকার ব্যবস্থাকে সুচারুরূপে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, সভ্য ও সংস্কৃতিবান মানুষের কর্ম ও আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখানে নানামুখী সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের ব্যক্তিগত অভিমত, নগর সরকারের ধারণা ও কাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গব্যাপী পরিচালিত পুরসভা কাঠামো ও কলকাতা সিটি করপোরেশন ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। তাছাড়া রাজধানী শহর ঢাকার ক্ষেত্রে একাধিক কাজকর্ম সমন্বয়ের জন্য পুরো রাজউক এলাকা নিয়ে লন্ডন শহরের মতো একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি হতে পারে। অন্তত দিল্লি ও লন্ডনের দুটি ব্যবস্থাও তাই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

২০১৫ সালের ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই মহানগরের তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র প্রার্থীগণের নির্বাচনী ঘোষণাপত্র বা অঙ্গীকার পত্রে দুই মহানগরের সাধারণ সমস্যাগুলো যেমন উঠে এসেছে, তেমনিভাবে উচ্চারিত হচ্ছে নানামুখী সংস্কারের প্রসঙ্গও। আশা করি নির্বাচনের পাশাপাশি টেকসই সংস্কারের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। যথাযথ সংস্কার না করা হলে এ ব্যবস্থাটির ভঙ্গুরতা ও অসহায়ত্ব কাটবে না। কার্যকর কোনো নগর শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না।।

(লেখক :: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক)