Home » অর্থনীতি » চীন :: অস্ত্র বাজারের নতুন মহাজন

চীন :: অস্ত্র বাজারের নতুন মহাজন

চীনা অস্ত্রের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে পাকিস্তান ৪১ শতাংশ, বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ ও মিয়ানমার ১২ শতাংশ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last-1বিশ্ব অস্ত্র বাজারে উত্তাপের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। জার্মানিকে পেছনে ফেলে এই দেশটিই এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক। অবশ্য তৃতীয় হলেও বাজারে মোট বিক্রিত অস্ত্রে তাদের রফতানির পরিমাণ খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যেখানে সম্মিলিতভাবে ৫৮ শতাংশ অস্ত্র রফতানি করে, সেখানে চীন করে মাত্র পাঁচ শতাংশ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এ তথ্য ওঠে এসেছে।

চীনা হিস্যা মাত্র পাঁচ শতাংশে দিয়ে কিন্তু আসল চিত্র বোঝা যাবে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল নাগাদ চীনা অংশ বেড়েছে ১৪৩ শতাংশ। অথচ এই সময়ে আগের পাঁচ বছরের তুলনায় বৈশ্বিক অস্ত্র হস্তান্তর বেড়েছে ১৬ শতাংশ। আর এর আগে বিশ্ব বাজারে চীনা অস্ত্র ছিল তিন শতাংশ। রফতানিকারকদের কাতারে তার স্থান ছিল নবম। তারা বিক্রি করত যুদ্ধবিমান, জাহাজ, পিস্তল ইত্যাদি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চীনের অভ্যন্তরীণ অস্ত্র শিল্প বেশ শক্তিশালী হয়েছে। তারা এখন চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, নেভি ফ্রিগেট, নানা ধরনের তুলনামূলক সস্তা, সাধারণ ও নির্ভরযোগ্য ছোট অস্ত্র বিক্রি করছে, যেগুলো সারা বিশ্বে বিভিন্ন সঙ্ঘাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দীর্ঘ দিন চীন ছিল প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের কাছ থেকে তারা অস্ত্র কিনত। কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বিদেশী প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে তারা এখন ওই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। অবশ্য বিমানের ইঞ্জিনের মতো সবচেয়ে সূক্ষ্ম ডিজাইন ও অত্যাধুনিক অংশগুলো নির্মাণে তারা এখনো পিছিয়ে আছে।

চীন ৩৫টি দেশে অস্ত্র রফতানি করে। চীনা অস্ত্রের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে পাকিস্তান (৪১ শতাংশ), বাংলাদেশ (১৬ শতাংশ) ও মিয়ানমার (১২ শতাংশ)। চীন ১৮টি আফ্রিকান দেশেও রফতানি করে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনা বিক্রির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে ভেনেজুয়েলায় সাঁজোয়া যান, পরিবহন ও প্রশিক্ষণ বিমান, আলজেরিয়ায় তিনটি ফ্রিগেড, ইন্দোনেশিয়ায় জাহাজ বিধবংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নাইজেরিয়ায় ড্রোন।

মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা সামরিকবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ফিলিপ সান্ডার্সের মতে, চীনের তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে তা হলো তাদের অস্ত্রের দাম কম, সহজে অর্থায়ন করা যায় এবং স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি বন্ধুপ্রতীম সম্পর্ক থাকা। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাথে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর দহরমমহরম কম এমনটা কিন্তু কেউ দাবি করতে পারে না। তার মতে, সাধারণভাবে বলা যায়, চীন বহনযোগ্য দামে মাঝারি মানের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দেয়, যা দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার অর্থ সঙ্কটে থাকা সেনাবাহিনীগুলোর জন্য আকর্ষণীয় হয়ে থাকে।

অস্ত্র রফতানির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে জেএফ১৭ বিমান উৎপাদন, সি৮০২ জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি এবং তুরস্কের কাছে এইচকিউ৯ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির সমঝোতা। তুরস্কের কাছে অস্ত্র বিক্রিটা বেশ আলোচিত। কারণ এর মাধ্যমে ন্যাটোর অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চীন উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো বাজারও হাতে রেখেছে, এই দুটি দেশে পাশ্চাত্যের দেশগুলো অস্ত্র বিক্রি করে না। উভয় দেশই চীনের কাছ থেকে স্যাটেলাইট জ্যামিং ও সাইবার যুদ্ধকৌশল করায়ত্ত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষুব্ধ হওয়ারই কথা।

চীন উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন প্রযুক্তিও সস্তায় দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে ইয়িলং, উইং লুং বা পটেরোড্যাকটিল মডেলটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে পড়েছে। তবে চীন এসব বিক্রির ব্যাপারে খোলাসা করে কিছু না বলায় ঠিক কতটি দেশ কী সংখ্যায় এগুলো কিনছে তা বলা যাচ্ছে না। চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকারী সিসিটিভি পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জু গুয়ানগুইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, দুটি নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত মনুষ্যবিহীন ড্রোন চীন ১০ লাখ ডলার করেই বিক্রি করেছে। অথচ একই মানের যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমকি১ প্রিডেটরের দাম এর চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও সৌদি আরব এসব চীনা ড্রোন কিনেছে বলে গুজব রয়েছে।

তবে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা হলো ৩১ শতাংশ, অন্তত ৯৪টি দেশে তারা অস্ত্র বিক্রি করে বলে সিপরির হিসাবে জানা যাচ্ছে। মার্কিন রফতানির ৪৮ শতাংশ গ্রহণ করে এশিয়া ও ওশেনিয়াভুক্ত দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যে যায় ৩২ শতাংশ, ইউরোপে ১১ শতাংশ। আর বিশ্ব বাজারে রাশিয়ার অংশ হলো ২৭ শতাংশ। এর ৩৯ শতাংশ কেনে ভারত যে দেশটি অস্ত্র আমদানিতে বিশ্বে সবার ওপরে। চীন কেনে রাশিয়ার অস্ত্রের ১১ শতাংশ। এর পর রয়েছে আলজেরিয়া।।