Home » অর্থনীতি » বিশ্বে কারা গরিব, কত গরিব, কেন গরিব

বিশ্বে কারা গরিব, কত গরিব, কেন গরিব

বিশ্বে দৈনিক সোয়া ডলারে বেচে আছেন ১২৫ কোটি মানুষ

জাইদা গ্রিন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

last 2যুক্তরাজ্যের ওভারসিস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (ওডিআই) নতুন একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন লোক দিনে ১ দশমিক ২৫ ডলারের কম আয়ে বাস করে বলে বিশ্বব্যাংক যে হিসাব দিয়েছিল, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিশ্বে ১ দশমিক ২৫ ডলারের কম আয় দিয়ে বেঁচে আছে বলে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সম্ভবত আসল সংখ্যাটি হবে এর চেয়ে একচতুর্থাংশ বেশি। এদেরকে গণনা করা হয়নি বলে প্রকৃত সংখ্যাটি অনেক কম হয়েছে।’

এতে বলা হয়, চরম দারিদ্রে বসবাসকারী ৩৫ কোটি লোক হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী বৈশ্বিক দারিদ্র সংখ্যা যদি একচতুর্থাংশ কম হিসাব করে থাকে, তবে বলা যায়, আড়াই শ’ কোটিরও বেশি লোক, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি, দিনে দুই ডলারের কমে বেঁচে থাকে।

সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত অংশটি, যেখানে লোকজন গৃহহীন থাকে কিংবা এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে থাকে, যেখানে গবেষকেরা পৌঁছাতে পারেননি, গৃহস্থালীসংক্রান্ত সমীক্ষায় বাদ পড়ে গেছে। প্রতিবেদনের প্রধান লেখক এলিজাবেথ স্টুয়ার্ট বলেন, দারিদ্র, শিশু ও মাতৃমৃত্যু নিয়ে তথ্যের যে প্রকট স্বল্পতা রয়েছে, সেটাই এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার। যদি দারিদ্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয় দিনে ৫ ডলারের কম নিয়ে বাঁচা, তবে বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী ৪০০ কোটির বেশি লোক, মোট মানুষের দুইতৃতীয়াংশ, চিহ্নিত হবে গরিব হিসেবে।

অন্যদিকে বিশ্বের মাল্টি মিলিয়নিয়ার ও বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ ফুলেফেপে উঠছে। তারা সুপারকার, ইয়ট ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের দিকে নতুন উদ্যমে ঝুঁকছে। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরজীবী আর্থিক অভিজাতন্ত্রের সিন্ধুকে অকল্পনীয় পরিমাণ অর্থ জমা হচ্ছে। আর এর বিপরীতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র, কৃচ্ছ ও যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রামে হিমশিম খাচ্ছে।

গত মার্চে ফর্বসের ম্যাগাজিনের হিসেবে বলা হয়, ২০১৫ সালে বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে নতুন উচ্চতা ৭ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন হয়েছে। ২০০০ থেকে বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের মোট সম্পদ বেড়েছে ৮ গুণ। ম্যাগাজিনটিতে বলা হয়, তেলের অস্বস্তিকর মূল্য এবং ইউরো দুর্বল হয়ে পড়লেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের স্পর্শ করতে পারেনি, তাদের অবস্থা বরং আরো ভালো হয়েছে।

অক্সফাম চ্যারিটির মতে, আগামী বছর বিশ্বের শীর্ষ এক শতাংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদ নিচে থাকা ৯৯ শতাংশকে ছাড়িয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ তার অর্ধবার্ষিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বলেছে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক জটিলতার আগেকার পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হারের প্রত্যাবর্তন কবে হবে তা জানা নেই। আইএমএফের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রধান প্রধান কোম্পানির মুনাফা বিপুল হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগ ছয় বছর আগে অর্থনৈতিক সঙ্কটপরবর্তী মন্দার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘোষণার পর থেকে কেবল কমছেই। এতে বিশ্বের উৎপাদনমুখী শক্তি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে জলাঞ্জলি দিয়ে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নীতিনির্ধারকদের বৈশ্বিক আর্থিক এলিটদের কল্যাণে এককভাবে প্রয়াস চালানোর প্রমাণও উলে#খ করা হয়।

ওডিআই সমীক্ষায় উল্লে#খ করা হয়, শতাধিক দেশে জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধন করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর যথাযথ হিসেবে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২৬টি দেশে ২০০৯ সাল থেকে শিশু মৃত্যুর কোনো তথ্য সংগ্রহ করা হয় না। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে শিশু জন্মদানের সময় দুই লাখ ২০ হাজার থেকে চার লাখ নারীর মৃত্যু হয়েছে। বেসামরিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচটি জন্মের একটির কম স্থান পায়।

অনেক সমীক্ষা অনেক আগের। এর ফলে গবেষকেরা পুরনো তথ্যের ওপর নির্ভর করেন, কিংবা অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে আগাম কিছু অনুমান করে নেন। চরম দারিদ্রে থাকা লোকজন সম্পর্কে সবচেয়ে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে চার বছর আগে। সাবসাহারা আফ্রিকার ৪৯টি দেশের মাত্র ২৮টিতে ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল নাগাদ পারিবারিক আয় সমীক্ষা চালানো হয়েছে। বোতসোয়ানার দারিদ্র হিসাব করা হয় ১৯৯৩ সালের গৃহ জরিপ থেকে।

দারিদ্রের সংজ্ঞা নিয়ে ভিন্নমত দেখা দেওয়ায় দারিদ্রের হিসাব নির্ণয় আরো কঠিন করে তুলেছে। অনেক এনজিও তাদের নিজস্ব জাতীয় দারিদ্রসীমার আলোকে হিসাব করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, থাইল্যান্ডে সরকারি দারিদ্রসীমা দিনে ১ দশমিক ৭৫ ডলার এবং দারিদ্র হার ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। অবশ্য নাগরিক সম্প্রদায় গ্রুপগুলো দারিদ্রসীমা হিসেবে করে দিনে ৪ দশমিক ৭৪ ডলার করে। এই হিসাব অনুযায়ী, দেশটির গরিব মানুষের হার দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংস সঙ্ঘাতের ফলে সব ধরনের গবেষণায় খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, সমীক্ষা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, অবকাঠামো ধবংস করে, নথিপত্র শেষ করে দেয়। সামাজিক খাতে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায়। যুক্তরাষ্ট্র একাই গত বছর ৪৯৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে প্রতিরক্ষা খাতে। অথচ জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বিশ্ব থেকে ক্ষুধার অভিশাপ নির্মূলের জন্য বছরে দরকার মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলার।

দারিদ্র, বৈষম্য ও সামরিক সঙ্ঘাতের এই অস্থির পর্যায় পুঁজিবাদীব্যবস্থার ঘৃণ্য ফসলের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হলো সমাজে প্রাধান্য বিস্তারকারি অর্থনৈতিক অভিজাততন্ত্রকে সমৃদ্ধ করা, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে।।