Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নভেরা – সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এক কিংবদন্তী

নভেরা – সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এক কিংবদন্তী

ফ্লোরা সরকার

last 7নভেরা’ নামটি উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকা দি’র নাম’ গানটির কথা অথবা বোদলেয়ারের ‘বলো রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো’ কবিতাটার কথা মনে পড়ে যায়। নভেরা যেন এই গান আর কবিতার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে আছেন। কবে,কখন নভেরা নামটা, মল্লিকা দি’র মতো আমরা বিস্মৃত হয়েছি জানিনা। জানিনা, নভেরা, বোদলেয়ারের মতো বুঝতে পেরেছিলেন কিনা, মানুষের ভালোবাসা এক রহস্যাবৃত অনুভূতি, যার স্পর্শ পাওয়া যায় না কোনোদিন। বোদলেয়ার যেমন চলিষ্ণু মেঘদলকে ভালোবেসেছিলেন নভেরাও হয়তো তেমনি প্যারিসকেই ভালোবেসেছিলেন শেষ পর্যন্ত। সেই প্যারিসের বুকেই গত ৬ মে, ২০১৫, তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরই সঙ্গে শেষ হলো, বাংলাদেশের প্রথম নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদের কর্মময় জীবনের এক বিশাল অধ্যায়। যে অধ্যায় শুরু হয়েছিলো এমন এক সময়ে, যে সময় এই দেশের নারীরা ভাস্কর্য দূরে থাক, ঠিক মতো লেখাপড়াই শুরু করতে পারেনি, অন্দর মহলই ছিলো তাদের বিশ্ব মহল। মহান এই শিল্পীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে তার কর্মময় জীবন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করা যাক।

চেষ্টা এই কারণে, নভেরা এবং তার কাজ সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায়না। পৃথিবীর প্রকৃত গুণী শিল্পীরা, তাদের কাজ নিয়ে এতো নিবিষ্ট থাকেন যে, নিজের সম্পর্কে সারাজীবন একরকম উদাসীনই থেকে যান। তার উপর নভেরা ছিলেন একজন ভাস্কর। শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম, যেমন সাহিত্য, সিনেমা অথবা চিত্রকর্ম ধরে রাখার একটা না একটা উপায় থাকে, কিন্তু ভাস্কর্য ধরে রাখার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। শিল্পের এই মাধ্যমটি যেহেতু বিশাল আকৃতির হয়ে থাকে, তাই নিজের দেশের বাইরে যদি কোনো কাজ করা হয়, তাহলে সেগুলো সংগ্রহ করে রাখা খুবই কষ্টসাধ্য একটা কাজ। আর তাই ব্যাংককে করা তার কাজগুলো অথবা প্যারিসের কাজ সম্পর্কে আমরা খুব একটা অবগত হতে পারিনা। তবে, নভেরা শুধু এই দেশের প্রথম আধুনিক ভাস্করই ছিলেন না, ছিলেন অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একজন শিল্পী।

নভেরার জন্ম ১৯৩০ সালে। কোলকাতার লরেটো স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশানের পর পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় চলে আসেন এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। কোলকাতায় থাকার সময়েই নাচ শিখেছেন কিছুদিন, ভালো গান গাইতে পারতেন আর মাটি দিয়ে মডেলিং করতেন। তার মা মাটি দিয়ে পুতুল,পাখি, ঘরবাড়ি বানাতেন। সম্ভত মায়ের এই পুতুল গড়া তাকে ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট করেছিলো, যা পরবর্তীতে তাকে ভাস্কর হবার দিকে উদ্দীপিত করে। বাবা সাঈদ আহমেদ অবসর গ্রহণ করে আদি নিবাস চট্টগ্রামে চলে যান সবাইকে নিয়ে,কলেজে ভর্তি হন নভেরা। ইতিমধ্যে তার বিয়েও হয় একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে এবং কিছুদিন পর তা ভেঙ্গেও যায়। চট্টগ্রামে থাকতেই নভেরা কবি নজরুলের জন্মজয়ন্তী উৎসবে সেখাকার জুবিলী হলে নাচ পরিবেশন করেন, যা সেই সময়ে বেশ আলোড়ন তোলে। কলেজে থাকতেই নভেরা বুঝে গিয়েছিলেন, এই সামান্য পরিসর তার জন্যে না। ভাস্কর্যের বিশাল আকৃতির মতোই তার পরিসর আরো বড় কোনো জায়গায় অপেক্ষমান।

১৯৫০ সালে তিনি চলে যান লন্ডনে। ১৯৫১ সালে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের, ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ডিজাইনের মডেলিং ও স্কাল্পচার কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে সেই সময়ে কর্মরত অধ্যক্ষ ডক্টর ক্যারল ভোগেল, নভেরার প্রত্যয়নপত্রে লেখেন,‘তার কাজের মধ্যে গভীর পর্যবেক্ষনের চিহ্ন স্পষ্ট, তার নিজস্বতা আছে, আছে বিভিন্ন কম্পোজিশান সম্পর্কে গভীর ভাবে ভাবার প্রবণতা। তার পোট্রের্টগুলো যেন জীবন্ত চিত্রকর্ম। যদিও পশ্চিমা আঙ্গিকে তাকে শিখতে হয়েছে, কিন্তু নভেরার ভাস্কর্যগুলো বুঝিয়ে দেয়, তার মনের গভীর অচেতনে থেকে গেছে পূর্বের ঐতিহ্য এবং স্মৃতির প্রভাব। আমি সন্তুষ্ট এবং ভবিষ্যতে সে একজন বড় মাপের শিল্পী হবে বলে আশা রাখি।’ কাজেই আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয়না, ভবিষ্যতে নভেরা আহমেদ কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। লন্ডনে থাকতেই, এখাকার অনেক বড় বড় শিল্পী এবং মানুষের সাহচর্যে আসেন। যেমন জয়নুল আবেদীন, নাজির আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান প্রমুখ। হামিদুর রহমানের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে সব থেকে বেশি। দুজন মিলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে আর্ট গ্যালারি আর ভাস্কর্য দেখে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারি করেন। ১৯৫৬ সালে দুজন ঢাকায় ফেরেন। শুরু হয় নভেরার কর্মময় সময়।

১৯৫৬ থেকে ১৯৬১ ছিলো নভেরার কর্মজীবনের সব থেকে উল্লেখযোগ্য সময়। এই সময়টা যেন নভেরার ভাস্কর জীবনের স্বর্ণযুগ হয়ে আছে। এই সময়টাতেই তিনি নির্মাণ করেছেন তার শ্রেষ্ঠ কাজগুলো। একদিকে যেমন রিলিফ আর্টের কাজ করেছেন, তেমনি নির্মাণ করেছেন ভাস্কর্য দেশে এবং বিদেশে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের উপর কাজ করার জন্যে ভিয়েতনাম পর্যন্ত ছুটে গেছেন। ষাটের দশকে সোভয়েত এবং আমেরিকার মাঝে ঠান্ডা লড়াইয়ের কালে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ভিয়েতনাম থেকে ফিরে এসে, সেই যুদ্ধের উপর নির্মিত ভাস্কর্য দিয়ে প্রদর্শনী করলেন ব্যাংককে। তবে তার আগে ১৯৫৭ সালে আরো একটি ঐতিহাসিক কাজ শুরু করেন। আমাদের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির মিনার, শহীদ মিনার গড়ার কাজে হাত দেন শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে। যদিও ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সেনা শাসন শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে কাজটা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু নভেরার নাম এই মিনারের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায় চিরদিনের জন্যে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ভাস্কর্যের প্রদর্শনী করেন। ১৯৬১ সালে করেন লাহোরে। লাহোরে প্রদর্শনীর পর তিনি চলে যান প্যারিসে, আর ফিরে আসেন নাই।

প্যারিসে তার শেষ প্রদর্শনী হয় ১৯৭৩ সালে। ১৯৯৭ সালে তাকে একুশে পদক দেয়া হলেও তিনি আসেননি। নভেরা শুধু প্রচার বিমুখ একজন শিল্পী ছিলেন না, শিল্পকে তিনি কখনো পণ্য হতে দেননি। জীবনের চেয়ে শিল্পকে তিনি বড় করে দেখেছিলেন। তাই কোনো পদক বা প্রদর্শনীর প্রতি তার কোনো মোহ ছিলোনা। প্যারিসের প্রদর্শনীতেও তিনি যাননি। একেবারে শেষের দিনে ফরাসী স্বামীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রদর্শনীতে পাখি নিয়ে বেশকিছু চিত্রকর্ম করেছিলেন। পাখির মতো স্বাধীন এক জীবন চেতনা তার ভেতর সব সময় কাজ করেছে। তার সব কাজেই ছিলো একটা ব্যতিক্রমি বিষয়। বম্বেতে (মুম্বাই) যখন বৈজন্তীমালার কাছে নাচ শিখতে যান, তিনি বেছে নিলেন কথাকলি নাচ। যে কথাকলি দ্রাবিড় সময় থেকে শুরু হয়েছিলো। সাম্যবাদে বিশ্বাস রেখেও তিনি ছিলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী। ভাস্কর্যের মতো কঠিন শিল্প বেছে নেয়ার সময়েও দেখা যায়, তিনি বিমূর্ত ভাস্কর্য বেছে নিয়েছেন। এটা সেই সময়, যখন আমাদের দেশে ভাস্কর্য দেখার, বোঝার এবং উপলব্ধি করার দৃষ্টি তৈরি হয়নি। হেনরি মুর দ্বারা প্রভাবিত হলেও, নিজস্বতা বজায় রেখেছেন। আর তাই গ্রামীন জীবনের চিত্র তাকে আকর্ষণ করতো খুব বেশি। ১৯৬০ সালে ‘ইনার গেজ’ প্রদর্শনীর চাইল্ড ফিলোসফার ভাস্কর্য মানুষ আজও ভুলতে পারেনা। এমনকি হোলি ওভার আনহোলি, ওয়ার্ক অন ইস্ট পাকিস্তান সাইক্লোন, প্রোগ্রেস, ম্যান অ্যান্ড ওয়োম্যান আজও মানুষ স্মরণ করে। তিনি নিজের সঙ্গে কখনো প্রতারণা করতেন না। নিজের ইচ্ছাকে কখনোই অন্যের কাছে বলি দিতেন না। অন্যকে খুশি করার কোনো প্রবণতা তার ছিলোনা। যখন যেমন ইচ্ছা, সেই ইচ্ছার কাছে তিনি ছিলেন শতভাগ সৎ। আর তাই তার ভাস্কর্যগুলোও সততায় গড়া। নভেরার সব থেকে আকর্ষণ ছিলো বহিরাঙ্গনে ভাস্কর্যের প্রতি। একটা শহরে যত বেশি সংখ্যায় ভাস্কর্য সেই শহরের উন্মুক্ত স্থানে যেমন, পার্কে, বড় রাস্তার মোড় বা খোলা জায়গায় থাকবে, মানুষ তত বেশি সেদিকে আকৃষ্ট হবে, ভাস্কর্য ভালোবাসতে শিখবে। ভাস্কর্য মানুষের সঙ্গে একাত্মা না হলে, ভাস্কর নির্মিত হবে কি করে ? গান শুনতে শুনতে যেমন গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি হয়, তেমনি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে ভাস্কর্যের প্রতিও তেমনি মানুষের ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। নভেরার এই স্বপ্ন হয়তো আজও পূরণ হয়নি। কারণ, তার মতো বড় মাপের ভাস্কর আমরা খুব কম পেয়েছি আমাদের দেশে। তবে, একটা কাজ আমরা করতে পারি। নভেরার জীবিত অবস্থাতেই যখন আমরা তাকে বিস্মিৃত হয়েছি, আজ তিনি নেই, মৃত মানুষ আরো দ্রুত বিস্মিৃত হয়। আমরা যদি আমাদের জাতীয় যাদুঘরের সামনে অথবা বিশেষ কোনো বড় স্থানে, তার একটা বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ করে রাখতে পারি, ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্তত এইটুকু অনুধাবন করবে, এই দেশে একজন ‘নভেরা আহমেদ’ ছিলেন, যাকে আমরা দেখিনি, তার সময়ের মানুষেরাও তাকে ভালো ভাবে দেখেনি, চিনতেও পারেনি। কিন্তু তিনি এমন একটি পথ করে দিয়েছিলেন, যে পথ ধরে নারীরা সাহসী হয়ে তার মতো শিল্পী হবার বাসনা পোষণ করেছিলো। এদেশের শিল্পের ইতিহাসে তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। নভেরা আহমেদ সময়ের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন। আমাদের দেশে তার মতো অগ্রগামী মানুষের বড় অভাব। ভবিষ্যত প্রজন্ম সেই ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে আশান্বিত হবে, ভাববে, তারাও তার সেই পথ ধরে তাদের সময়গুলো অগ্রগামী করে যেতে পারে।।

১টি মন্তব্য

  1. অসাধারণ লিখেছেন

    “কাজেই আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয়না, ভবিষ্যতে নভেরা আহমেদ কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।”

    “একটা কাজ আমরা করতে পারি। নভেরার জীবিত অবস্থাতেই যখন আমরা তাকে বিস্মিৃত হয়েছি, আজ তিনি নেই, মৃত মানুষ আরো দ্রুত বিস্মিৃত হয়। আমরা যদি আমাদের জাতীয় যাদুঘরের সামনে অথবা বিশেষ কোনো বড় স্থানে, তার একটা বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ করে রাখতে পারি, ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্তত এইটুকু অনুধাবন করবে, এই দেশে একজন ‘নভেরা আহমেদ’ ছিলেন, যাকে আমরা দেখিনি, তার সময়ের মানুষেরাও তাকে ভালো ভাবে দেখেনি, চিনতেও পারেনি।”