Home » আন্তর্জাতিক » ১৮৫৭’র সিপাহী বিপ্লব :: ইউরোপীয়দের দৃষ্টিতে

১৮৫৭’র সিপাহী বিপ্লব :: ইউরোপীয়দের দৃষ্টিতে

last 3সিপাহী বিপ্লব বৃটিশ ভারতীয় অঞ্চলের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই সিপাহী বিপ্লব বহুমাত্রিক এবং নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বৃটিশরা এই বিপ্লবী ঘটনাকে গণ্য করে বিদ্রোহ হিসেবে। তবে ইউরোপীয়সহ অনেক গবেষকই আসলে বৃটিশদের ওই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত নন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবটি হয়েছিল তৎকালীন ভারতের বহু স্থানে, এমনকি কলকাতায়ও। আর এই বিপ্লবটি শুরু হয়েছিল মে মাসের ১০ তারিখে। ইউরোপীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বছর চারেক আগে শাশ্বতী মজুমদার সম্পাদনা করেন ‘ইনসারজেন্ট সিপয়স, ইউরোপ ভিউস দ্য রিভল্ট অফ ১৮৫৭’ শীর্ষক বইটি। এই বইটির একটি আলোচনা তুলে ধরা হলো।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ একটি বহুমাত্রিক, জটিল ও বহু বিতর্কিত ঘটনা। বৃটিশরা এটিকে বর্বর ও বিক্ষুব্ধ সিপাহীদের বিশ্বাসঘাতকপূর্ণ বিদ্রোহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করলেও ঠিক সেই সময়েই লন্ডন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদপত্রের জন্যে পাঠানো প্রতিবেদনে কার্ল মার্কস এই ঘটনাকে ‘প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যথার্থ বস্তুনিষ্ঠতারই পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিনায়ক দামোদর সাভারকার মতো জাতীয়তাবাদীরা বলেছেন, এই বিদ্রোহ কেবল গুটিকয় সৈনিকের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং এটি ছিল বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে পরিচালিত সুস্পষ্ট এক বিদ্রোহের পরিকল্পিত ঘটনা।

অতি সম্প্রতি ২০১১ সালের ২৮ মার্চ তারিখে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর হিস্টরিক্যাল রিসার্চের প্রতিষ্ঠা দিবসে দেয়া এক বক্তৃতায় জেভি নায়েক এই মতের পক্ষে আরও জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ১৮৫৭ সালের মহান বিদ্রোহকে সঠিকভাবে ‘প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যান্য মহান বিপ্লবের মতো এটিরও প্রথমে উন্মেষ ঘটেছিল। মানুষের চিন্তার জগতেই। মুষ্টিমেয় একদল মহারাষ্ট্রীয়র ১৮৫৭ পূর্ববর্তী লেখালেখি ও কর্মকান্ডে এর প্রমাণ মেলে।

এটিকে নিয়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবেত্তারা যখন পরস্পরের সাথে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত বাদবাকি ইউরোপ তখন এই বিদ্রোহের তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলী, এর সামরিক সাফল্য ও শেষ পর্যন্ত একে দমন করতে পারার ঘটনাকে কিভাবে মূল্যায়ন করছিল সেদিকে সেদিন খুব একটা নজর দেয়া হয়নি। ‘বিদ্রোহী সিপাই : ইউরোপের চোখে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ’ গ্রন্থটি এই ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণা থেকে দৃষ্টি ফেরানোর এক অভিনন্দনযোগ্য প্রয়াস। সম্পাদক শাশ্বতী মজুমদার অত্যন্ত পান্ডিত্যপূর্ণ ১৭টি প্রবন্ধ দুই ভাগে বিন্যস্ত করে এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। একটি অংশের শিরোনাম ‘সংবাদ ও মন্তব্য’ এবং অন্য অংশের শিরোনাম ‘ঘটনা ও গল্প’। ভারতীয় সৈন্যদের বিদ্রোহের ঘটনা ক্রমশ প্রকাশিত হতে শুরু করলে এ সবের প্রতি জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, হাঙ্গেরীয়, চেক এবং বুলগেরীয় সংবাদপত্র, সাময়িকী, বুদ্ধিজীবী এবং বিশ্লেষকরা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন প্রথম ভাগের সাতটি প্রবন্ধে তা তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগের ১০টি প্রবন্ধই অত্যন্ত উচুমানের গবেষণাধর্মী। ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলী জার্মানি, ইতালি, পর্তুগাল এবং স্পেনের লেখকদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে কিভাবে, কতোটা প্রভাবিত করেছিল এই প্রবন্ধগুলোতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্ভবত এই প্রথম এ জাতীয় একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা গেলো এবং এটি এই জাতীয় ভবিষ্যত গবেষণার দ্বারও খুলে দিল বলে মনে করা যায়।

শাশ্বতী মজুমদার সংকলনটিতে বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী একটি ভূমিকা লিখেছেন। তাতে তিনি ১৮৫৭ সালের ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাবলীর প্রতি ইউরোপীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সূক্ষ্ম একটি মতভিন্নতা প্রকাশ করে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৮৪৮ সালের বিপ্লবী আন্দোলনগুলো ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও সে সব ঘটনার নৈতিক দিকগুলো ইউরোপজুড়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি উদার ও প্রগতিশীল ধ্যানধারণার অংকুরোদগম ঘটিয়েছিল। একই সময়ে পুজিবাদ নতুন বাজার খোজার তাড়না অনুভব করছিল। এই তাড়না সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিকাশের শক্তি যোগায় এবং তথাকথিত ‘সভ্যকরণ অভিযান’ পরিচালনার পক্ষে যুক্তি দাড় করাতে ঔপনিবেশিকতাকে সাহায্য করে। ভারত নিষ্ক্রিয় ও অপরিবর্তনশীল, প্রাচ্যবাদীদের বহুল প্রচলিত এই ধারণাকেও আকস্মিক একটি ঝাকুনি দেয় সিপাহী বিদ্রোহ। ফলে ইউরোপ বুঝতে পারে, তাদের ফরাসি বিপ্লবের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ একট ঘটনা দূরবর্তী এই অঞ্চলটিতে ঘটতে চলেছে। তারপরও অনেকেই ভারতীয় এই বিদ্রোহকে সমর্থন জানায়নি। এমনক জার্মানির উদারনৈতিক পত্রিকা ফোকজেইটুং (জনগণের সংবাদপত্র) এই মর্মে মন্তব্য করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবকে সমর্থন করা গেলেও ভারতীয় বিদ্রোহকে সমর্থন করা যায় না। কারণ যে সাংস্কৃতিক মানে পৌছাতে পারলে একটি বিপ্লব তার যথার্থতা দাবি করতে পারে ভারতীয় বিদ্রোহের ক্ষেত্রে সেই সাংস্কৃতিক মান অর্জিত হয়নি। একটি কথা মনে রাখা দরকার, উনিশ শতকজুড়ে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমের মাধ্যমে নতুন বাজার দখলের লক্ষ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। শাশ্বতী মজুমদার উল্লেখ করেছেন, বিদ্রোহটি এমন এক সময় সংঘটিত হয়েছিল যখন জাতিগত তত্ত্বকে সবে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদানের চেষ্টা চলছিল। এই তত্ত্বের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে শ্বেতকায়দের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়। শ্বেতকায়দের এই শ্রেষ্ঠত্বের জোরেই পৃথিবীতে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব বৈধতা পায় এবং এরই পথ ধরে পরবর্তীতে জার্মান নাৎসিরা বিশ্বব্যাপী জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের বিজয় কেতন ওড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছিল।

সম্পাদক জানিয়েছেন, সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনাটি ঔপন্যাসিকদের নিকট এতটাই আদরনীয় ও আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল যে, ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হতে হতে এই বিষয়কে উপজীব্য করে অন্তত ৭০টি ইংরেজি উপন্যাস প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলী ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকদের সাহিত্যিক চিন্তাভাবনাকে বিপুলভাবে আলোড়িত করেছিল। সে জন্যই বিষয়টি নিয়ে ফরাসি, ইতালীয় এবং জার্মান ভাষায় বেশ কিছু উপন্যাস প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

এ সবের মধ্যে ফরাসি ঔপন্যাসিক জুলভার্নের উপন্যাসের কথা সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয়। ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার কারণে তার উপন্যাসগুলো সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছিল। যদিও স্বাতী দাসগুপ্তা তার ‘অনুবাদে হারিয়ে গেছে : জুলভার্ন ও ভারতীয় বিদ্রোহ’ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, জুলভার্নের উপন্যাসের কোনো কোনো অধ্যায়ের পুরোটাই ইংরেজী অনুবাদের সময় বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ সে সব অধ্যায়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণের চিত্র অংকিত ছিল।

জার্মানদের প্রতিক্রিয়া

ভারতীয় বিদ্রোহ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণকারী তিন জার্মান নাগরিকের মতামত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন ক্লডিয়া রিচেল। এই তিন জার্মান হলেন লেখক থিওডর ফনটেন, সাংবাদিক এডগার বুয়ের এবং বিপ্লবী ভিলহেম লিবনেকট। ভিলহেম ছিলেন কার্ল মার্কসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন সহযোগী। ভারতে বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার সময় এরা তিনজনই ছিলেন লন্ডনে। ফনটেন পুরো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাটিকেই বাজে বলে আখ্যায়িত করেন এবং ভারতীয় বিদ্রোহের উপর সংবাদ ছাপানোর ব্যাপারে অনমনীয় মতপার্থক্য প্রদর্শনের দায়ে তাকে নিও প্রশিচ জিটাং পত্রিকার সম্পাদকের পদটিও ছাড়তে হয়েছিল। বুয়ের দেখিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যে সব রাজনীতিক লন্ডনে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, ১৮৫৭ সালের ঘটনার প্রভাব কীভাবে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলেছিল বা বাধাগ্রস্ত করেছিল। ভিলহেম লিবনেকট বিভিন্ন জার্মান পত্রিকা এবং জার্মান ও ইংরেজি ভাষায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার জন্য লিখতেন। তিনিও কার্ল মার্কসের মতোই ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাগামহীন শোষণ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবে তিনি ভারতের শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন। সে যাই হোক, তিনি ভারতীয় বিদ্রোহীদেরই পক্ষাবলম্বন করেন এবং শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এই বিদ্রোহের ন্যায্যতার কথা প্রচার করে বেড়ান।

দূরবর্তী অঞ্চলেও প্রতিধ্বনি

১৮৫৭ সাপলের ভারতীয় বিদ্রোহের ঢেউ দূরের বুলগেরিয়ায় গিয়েও আঘাত হানে এবং এই বিদ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বুলগেরীয়রাও অটোমান শাসনের হাত থেকে মুক্তি লাভের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বিপুল তথ্য বহুল এক প্রবন্ধে রাসমিজোসি দেখিয়েছেন, বুলগেরীয় বিপ্লবী ও খ্যাতিমান লেখক সার্গেই স্টয়িকভ রাশকোভস্কি কীভাবে ভারতীয় সৈন্যদের এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে চিহিৃত করতে পেরেছিলেন। যদিও তথ্যের জন্য তাকে বৃটিশ সংবাদপত্র এবং সাময়িকীর ওপরই প্রধানত নির্ভর করতে হয়েছিল। তিনি তার স্বল্পায়ু তবে প্রগতিশীল সাময়িকী বুলগারস্কা নেভনিস্তার প্রথম পৃষ্ঠায় ভারতীয় ঘটনাবলীর সংবাদ ছেপেছিলেন। ১৮৫৭ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১৮৫৭ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, সিপাহী বিদ্রোহ অপরাজেয় বৃটিশ শক্তির মনোবল দুর্বল করে দিয়েছিল এবং এই শক্তি পুরোপুরিভাবেই ভারতীয় সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তিনি লেখেন, ভারতীয় সৈন্যদের সহযোগিতা ছাড়া সব ধরনের সরকারি পরিষেবাই মুখ থুবড়ে পড়বে। রাজস্ব আদায় ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা হয়ে পড়বে অকার্যকর। সাময়িকীটির সব সংখ্যাতেই ভারতীয় বিদ্রোহের খবর ছাপা হয়েছে এবং এই বিদ্রোহ যে ধীরে ধীরে ব্যাপকতা পাচ্ছিল তার ওপরও মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তথ্যের জন্য মূলত বৃটিশ সূত্রগুলোর ওপরই তাকে নির্ভর করতে হতো বলে মঙ্গল পান্ডের ফাঁসির ঘটনাটি তিনি ছাপাতে পারেননি। তবে মনে প্রাণেই তিনি ছিলেন বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী একজন মানুষ। এ কারণেই বিদেশী শক্তি বিতাড়নে ভারতীয়দের প্রচেষ্টাকে তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

মার্গিট কোয়েভসের প্রবন্ধটির এই সংকলনে একটি গবেষণানিষ্ঠ সংযোজন। হাঙ্গেরির বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে উদ্ধৃতি সংগ্রহ করে তিনি দেখিয়েছেন, ভারতে সংঘটিত ১৮৫৭ সালের ঘটনাবলী সম্পর্কিত তথ্যাদি প্রকাশ পেতে শুরু করলে হাঙ্গেরির লেখক এবং সাংবাদিকরা সেগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যে বর্ণ এবং ধর্মগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল একথাও তারা অবগত ছিলেন। তবে ভারতের ঘটনাবলীর ব্যাপারে তাদের কৌতূহল থাকলেও এগুলোর প্রতি যে তাদের সমর্থনও ছিল তার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বর্তমান ভারতবর্ষের ‘ক’জনইবা জানেন, স্যার জন রেকদির ছদ্মনামে হারমেন অটোমার ফ্রেডরিক গুডশে ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত বিদ্রোহের ঘটনাকে অবলম্বন করে নিনা সাহিব বা ভারতে বিদ্রোহ নামে অতি জনপ্রিয় একটি উপন্যাস লিখেছিলেন? উপন্যাসটির ওপর লিখিত আলোচনায় অনিল ভাট্টি দেখিয়েছেন, এই উপন্যাসের মধ্যেই ভারত সম্পর্কে জার্মানদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিফলন ঘটেছে। নিনা সাহিব নামটি আসলে আমাদের নানা সাহেব পেশবার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ নানা সাহেব পেশবা ছিলেন ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান নেতা। উপন্যাসে দেখা যায়, নানা সাহেবের আইরিশ স্ত্রীকে স্থানীয় ইংরেজরা ধর্ষণ এবং হত্যা করে। এ ঘটনা নানা সাহেবের ভেতরকার ব্যাঘ্র প্রকৃতিকে আরও বেশি ভয়ংকর করে তোলে এবং তিনি একটি দস্যু দলের সরদারে পরিণত হয়ে যান। প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসটি যে সময়কার সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছিল। উপন্যাসটিতে ঘাতপ্রতিঘাত আর লোমহর্ষক হত্যা, ধর্ষণ এবং প্রতিশোধপরায়ণ দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে।

অনিল ভাট্টি দেখিয়েছেন, রেকটলিফ তার উপন্যাসে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের সমালোচনার পাশাপাশি দুর্বলকে পরাজিত করে সবল টিকে থাকার ডারউইনিয় তত্ত্বেরও সমাবেশ ঘটিয়েনে। ভাট্টি মনে করেন, উপন্যাসটির মধ্যদিয়ে ভারত সম্পর্কে ঊনিশ শতকীয় জার্মান ভাষাভাষী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির একটি সামগ্রিক চিত্র ধরা পড়েছে। উপন্যাসটি একটি উন্নততর সাহিত্যকর্ম ও দার্শনিক গ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে।

সংকলনটিতে অন্তর্ভুক্ত উল্লেখযোগ্য আরেকটি প্রবন্ধ হচ্ছে ‘১৯ শতকের একটি ইন্দোপর্তুগিজ উপন্যাসে ভারতের বিদ্রোহ’। এভারটন ভি মাচাডো লিখিত এ প্রবন্ধটি ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন জোআও পেড্রো ভিসেন্ট ফসটিনো এবং মঞ্জুলতা শর্মা। এ প্রবন্ধটি থেকেই আমরা প্রথম ইন্দোপর্তুগিজ উপন্যাস অস বারহামানস সম্পর্কে জানতে পারি। উপন্যাসটির পটভূমি ১৮৫৭ সালের ফয়েজাবাদ। উপন্যাসটির লেখক ফ্রান্সিসকো লুইজ গোমেজ পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সাংবাদিক। পর্তুগিজ পার্লামেন্টের নির্বাচিত একজন সদস্য ফ্রান্সিসকো লুইজ অর্থনীতি এবং ইতিহাস নিয়েও বিস্তর লেখালেখি করেছেন। উল্লিখিত উপন্যাসটিতে হিন্দু বর্ণবাদকে আক্রমণ করা হয়েছে এবং সমালোচনা করা হয়েছে ভারতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের।