Home » অর্থনীতি » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৭)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৭)

শ্বেতসন্ত্রাস :: তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্র

আনু মুহাম্মদ

LAST 3চীনে বিপ্লবী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। অন্যদিকে এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন, বৃটেন, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ভারত প্রভৃতি রাষ্ট্র। মাও সেতুং প্রথম বিদেশ সফরে যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। এবং স্বাক্ষরিত হয় চীনসোভিয়েত চুক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভরকেন্দ্র বদলে যায়। বৃটেনের পক্ষে আর নেতৃত্বদানের অবস্থা ছিলো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ বিধ্বস্ত। ওদিকে প্রবল শক্তি নিয়ে বিশ্ব দরবারে হাজির সোভিয়েত ই্উনিয়ন। সুতরাং সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের উত্থানের কারণে বিশ্বজুড়ে হুমকির মুখে পতিত পুঁজিবাদী শক্তিকে সমর্থন দেবার সামর্থ্য থাকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হয়ে উঠলো পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার নতুন নেতা, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কেন্দ্র।

তাই দ্রুতই তাইওয়ান ও কোরিয়া হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য সৃষ্টির প্রধান অবলম্বন। এর আগে কুওমিনটাং এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা কোনো কাজে দেয়নি। চিয়াং কাই শেক, তার নেতৃত্বাধীন কুওমিনটাং বাহিনী ও তার সমর্থক ধনিক গোষ্ঠী মূল ভূখন্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ঘাঁটি গাড়ে ফরমোজা দ্বীপে যা পরে তাইওয়ান নামে পরিচিতি পায়। এই দ্বীপ চীনের অংশ ছিলো বহুকাল আগে থেকে, সপ্তদশ শতকে কিং সম্রাটের সময় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। উনিশ শতকের শেষে জাপান এটি দখল করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর আবার তা চীনের কর্তৃত্বে আসে। জাপানী উপনিবেশকালে ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় সেখানে বসবাসরত চীনা মানুষেরা। তবে এই উপনিবেশকালেই এই দ্বীপে শিল্পায়ন, রেলপথ ও অন্যান্য পরিবহনের বিস্তার, সুসংগঠিত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামো গড়ে ওঠে।

প্রথমদিকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও এবং বিরক্তি দেখালেও যুক্তরাষ্ট্র চিয়াং ও তার সহযোগীদের পুনর্বাসনে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছে তার আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবেই। বিপ্লবী সরকারও তাদের আর তাড়া করেনি, কিন্তু বরাবর তারা এই দ্বীপ চীনের অংশ বলে দাবি করে এসেছে। তাইওয়ান নামে পরিচিত হলেও সরকারিভাবে এর নাম ‘চীন প্রজাতন্ত্র’। তাইওয়ানে আগে থেকেই মানুষ ছিলেন প্রায় ৬০ লাখ। তার সাথে যোগ হলো চিয়াং কাই শেকএর সাথে যাওয়া ২০ লাখ। এর প্রধান অংশ ছিলো সেনাবাহিনীর লোকজন। এছাড়া ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদরাও ছিলেন। স্থানীয় মানুষজনের সাথে সংঘাত তৈরি হয়েছে প্রায়ই। চিয়াং সামরিক শাসনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা ছিলো অঢেল। মাকিন পরিকল্পনা ছিলো একদিকে সামরিক শক্তি হিসেবে এটিকে গড়ে তোলা, একে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এবং তাইওয়ানে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ নিশ্চিত করে পাল্টা একটি মডেল দাঁড় করানো। সে অনুযায়ী, এই সময়কালে শিল্পায়নের ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়। চীন বিরোধী আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক তৎপরতায় যুক্তরাষ্ট্র অনেকখানি ভর করেছে এই দ্বীপরাষ্ট্রের ওপর।

তাইওয়ানে ১৯৪৯ সালে প্রবর্তিত সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে ১৯৮৭ পর্যন্ত। চিয়াং এর পর তার পুত্র দেশের প্রধান হন। নিজেদের শাসন ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৯ থেকে কয়েক বছরে পুরো দ্বীপ জুড়ে ব্যাপক নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়। কমিউনিস্টপন্থী বা কুওমিনটাং বিরোধী কাউকে মনে হলেই তার বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতো। এই অপরাধে এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রে প্রায় দেড়লাখ মানুষকে খুন অথবা কারাবাসের শিকার হতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলো যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য যে, এসব নির্যাতিত পরিবারের প্রতি এই ‘শ্বেতসন্ত্রাস’ কালে যে অন্যায় করা হয়েছে তার জন্য প্রায় ৬০ বছর পর, মাত্র গত ২০০৮ সালে, তাইওয়ান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে।

চীনে বিপ্লবী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়া যুদ্ধ শুরু করে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধের পেছনে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনসোভিয়েত যুদ্ধে পরিণত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান চীনকে মোকাবিলার জন্য সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করেন তাইওয়ান প্রণালীতে। তবে তাইওয়ানকে ভর করে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার মিত্র দেশের অনেকেই একমত ছিলো না।

মার্কিনী এই ভূমিকা বিচ্ছিন্ন কিছু ছিলো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সেসময়টি ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও শ্বেত সন্ত্রাস যা ম্যাককার্থিজমের কাল। বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা, মিডিয়া, সাহিত্য, সঙ্গীত, গবেষণা এমনকি হলিউডে চলচ্চিত্র জগতে তখন ‘বাম’ বা ‘কমিউনিস্ট’ বিরোধী চিরুণী অভিযান চলছিলো। শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়েছেন, জেলে ঢুকেছেন, উধাও হয়ে গেছেন, অপদস্থ হয়েছেন, কুৎসা অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। এগুলো করা হয়েছে খুবই গোছানো সুসংগঠিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। সিআইএ এফবিআই তখন এইকাজে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী।

চীন নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণার সাথে যুক্ত অনেক ব্যক্তিও এর শিকার হন। এরকম একজনের নাম উইলিয়াম হিনটন। যাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ফানশেন চীনের বিপ্লবী রূপান্তর বোঝার জন্য অবশ্যপাঠ্য।।

(চলবে…)