Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (তৃতীয় পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (তৃতীয় পর্ব)

LAST 5আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

১৯৬৫ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় ডেনিস হিলি হোয়াইট হলে আনুষ্ঠানিকভাবেই একটি অস্ত্র বিক্রয় বিভাগ চালু করেন। এর কাজই ছিল ঘুষ প্রদান করা। পরবর্তী সময়ে দ্য গার্ডিয়ানের কাছে দেয়া এক সাক্ষাতকারে হিলি বেশ খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেন, ‘ঘুষ লেনদেন অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আমার মনে আছে, মার্কিন কিংবা জার্মান অথবা পশ্চিমা বন্ধুদের কাছে অস্ত্র বিক্রয়ের সময় এ কাজটি আমরা প্রায় করিইনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে আপনি যদি অস্ত্র বিক্রি করতে চান তবে ঘুষ আপনাকে দিতে হবেই’।

লেল্যান্ড মোটর গাড়ি ও ট্রাক কোম্পানির এককালীন চেয়ারম্যান স্যার ডোনাল্ড স্টক দুর্নীতির কলাকৌশল বাতলে দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রথমেই খুজে বের করতে হবে ক্রয়বিক্রয়ের নিয়ন্ত্রণটি কাদের হাতে রয়েছে। এরা অবশ্যই সরকার কিংবা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি নন। যখনই সে সব ব্যক্তিকে খুজে পাওয়া যাবে তখন থেকেই তাদের পেছনে লেগে থাকতে হবে। এক সময় না এক সময় বেচতে পারার কাজটি সম্পন্ন হবেই’।

লেবার সরকারের মন্ত্রীদের তিনি জানান, বড় ধরনের বহু অস্ত্র বেচাকেনার ঘটনা ঘটেছে, কেউ অস্ত্র কিনতে চেয়েছে এ জন্য নয়, বরং এব বেচাকেনায় কমিশন বাণিজ্য জড়িত ছিল, এই কারণে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা এমওডিতে নিযুক্ত স্থায়ী সচিব এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘স্যার ডোনাল্ড স্টক আসলে ইঙ্গিত করেছেন, অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই ঘুষ প্রদান জরুরি হয়ে পড়ে’। হোয়াইট হলে বিদেশীদের ঘুষ প্রদানের জন্য বড় একটি তহবিল বরাদ্দের চাইতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একটি মোটর গাড়ি উপহার দেয়া কিংবা তার স্ত্রীকে কোম্পানির খরচে বারমুডায় অবকাশ যাপনে পাঠিয়ে দেয়াকে অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করতেন স্থায়ী অর্থ সচিব। তিনি বলেন, পার্লামেন্ট ঘুষ প্রদানের জন্য অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করবে না কিংবা এ জাতীয় তহবিল সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে তাও নয়। কিংবা যদি সম্ভাব্য ঘুষ গ্রহিতার কাছে এমনটা মনে হয়, তার ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি একদিন জানাজানি হয়ে যেতে পারে এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে শোরগোল শুরু হয়ে যেতে পারে তবে পুরো প্রক্রিয়াটিই জট পাকিয়ে যাবে। সুতরাং এমন একটি কাজ করতে যাওয়া সরকারি প্রশাসনের জন্য খুবই জটিল ও বিপজ্জনক হবে।

অবশ্য এ সমস্যার একটি সমাধানও বের করা হয়। আর সেটি হলো ঘুষের অর্থ লেনদেনের জন্য বিদেশে একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ এবং প্রয়োজন দেখা দিলে এ মধ্যস্থতাকারীকে চেনার কথা যেন অস্বীকার করারও সুযোগ থাকে। এ জাতীয় ব্যক্তি ‘ফিক্সার’, ‘ব্যাগম্যান’, ‘ইন্টারমেডিয়ারিজ’ কিংবা ‘এজেন্ট’ হিসেবে পরিচিত। স্টকস বলেন, ঘুষ লেনদেনে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের চেয়ে এ জাতীয় ব্যক্তিরাই অনেক বেশি নিরাপদ। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত অস্ত্র কেনাবেচার কোম্পানিগুলোতেই এ জাতীয় ছায়া ব্যক্তিদের খুজে পাওয়া যায়।

রেমন্ড ব্রাউন পর্ব

হোয়াইট হলে প্রথম প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রয় প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান রাচেল লিমিটেডের রে ব্রাউন। ত্রিকোণাকৃতির গোঁফধারী গোলগাল মুখের এই ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ীটি বেশ আমুদে স্বভাবের মানুষ। ডেনিস হিলির চোখে তিনি উদ্ধত, তবে ধূর্ত। তাকে অস্ত্র রফতানির জন্য এজেন্ট নিয়োগের অনুমতি দেয়া হয় এবং এক্ষেত্রে তিনি চাতুর্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বনের কথা স্বীকার করেছেন। তার জবানিতে, ‘আমি প্রস্তাব করলাম, আমরা এমন ক্ষেত্রে এজেন্ট নিয়োগ করব যেখানে প্রতীয়মান হয়, সম্ভাব্য ক্রেতাদের ঘনিষ্ঠজনদের সাহায্য ছাড়া অস্ত্র বিক্রয়ের কাজটি সম্ভব হবে না। খেয়াল রাখতে হবে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেতে যাওয়া ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানটি যেন স্বনামধন্য হয় এবং তাদের কাছ থেকে নেয়া সহযোগিতা ও বিনিময়ে তাদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের প্রক্রিয়াটি যেন হয় ভদ্রোচিত ও যুক্তিগ্রাহ্য’। কূটনীতিকদেরও বলে দেয়া হয়েছিল, তারা যেন রেমন্ড ব্রাউন এবং তার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রয়ের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করেন। তবে অভিজাত পরিবারগুলো থেকে আগত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত অনেক কূটনীতিকই এ জাতীয় নোংরা কাজে সহযোগিতা প্রদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ভেনিজুয়েলায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত স্যার এন্থনি লিংকন তাদের একজন। তার সামরিক অ্যাটাসে এক তার বার্তায় জানান, ‘রাষ্ট্রদূত আমাকে এ কাজে জড়িত হতে নিষেধ করেছেন। যেহেতু শুরু থেকেই এর মধ্যে ঘুষ লেনদেনের ব্যাপারটি রয়েছে’।

লিংকনের সহকারী এক কর্মকর্তা লন্ডনকে জানান, আমার রাষ্ট্রদূত মনে করেন, আমাদের এ ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, এজেন্টের মাধ্যমে দুটি সরকারের মধ্যে ক্রয়বিক্রয় সংক্রান্ত যে সমঝোতা তৈরি হতে যাচ্ছে সেখানটায় ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কোনো উপাদান রয়েছে কিনা। আর যদি থেকে থাকে তবে সেটি (যদিও এক্ষেত্রে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়) কমিশন হিসেবে পণ্যমূল্যের মধ্যে সংযোজিত কিনা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে সেটি হস্তান্তরিত হচ্ছে কিনা। আজ হোক কিংবা কাল হোক ঘুষের বিষয়টি নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপিত হবেই। সুতরাং দূতাবাসের কোনো কর্মীই এ ব্যাপারে জড়িত হতে পারবে না এবং ক্রয়বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়টি এখনই হোক কিংবা পরেই হোক এজেন্টকেই দেখভাল করতে হবে’। এরপর তিনি অস্ত্র ক্রয়বিক্রয় সংক্রান্ত ডোনাল্ড স্টকের ধারণাটি উদ্ধৃত করেন। তাহলো প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের একেবারে নিম্নস্তরের কর্মকর্তাটি পর্যন্ত একান্তভাবেই ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের আশ্রয় অস্ত্র ক্রয়ের চাহিদাটি সৃষ্টি করবেন। আর এ জাতীয় চাহিদাকে আরও বেশি উসকে দিতে পারেন সে সব এজেন্ট যারা সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তিদের সামনে আর্থিক লাভের মুলাটি বেশ ভালোভাবেই ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। কৃত্রিম এই চাহিদাকে হয় তো আরও বেশি বেগবান করে তোলা সম্ভব। তবে ঘুষ প্রদান সম্পর্কিত সঠিক ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আর উসকে দেয়া ঠিক হবে না।

লন্ডনে ফিরে গিয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, এজেন্ট যেভাবে ভালো মনে করবেন সেভাবেই তিনি ঘুষের অর্থের লেনদেন করবেন। তার একজন সহকর্মী অবশ্য বিষয়টিকে আরও একটু শোভনীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝি যে ঘুষ কীভাবে লেনদেন হবে সে বিষয়টি সরাসরিভাবেই আপনি জানতে চাইবেন। কিন্তু দুঃখের সাথেই জানাচ্ছি, এক সরকারের সাথে আরেক সরকারের অস্ত্র কেনাবেচায় চুক্তি হয়। সেখানে অস্ত্রের দামের মধ্যে আমরা মধ্যস্থতাকারী এজেন্টের জন্য কমিশন বাবদ কোনো বরাদ্দ রেখেছি কিনা কিংবা অন্যভাবেও তার জন্য কোনো কমিশন রাখা আছে কিনা সে বিষয়টি আমরা স্পষ্ট করে বলিনি’।।

(চলবে…)