Home » অর্থনীতি » পানি আগ্রাসন :: আজ যদি মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকতেন

পানি আগ্রাসন :: আজ যদি মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকতেন

. ইনামুল হক

last 4[১৬ মে ছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবী, পরিবেশ রক্ষা, কোটি কোটি মানুষের জীবনজীবিকার স্বপক্ষে এবং পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ওই দিনে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসকদের সব বাধা ও নিষেধ উপেক্ষা করে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফারাক্কা লংমার্চের। মওলানা ভাসানী শুধু বাংলাদেশ নয়, এই অঞ্চলের একমাত্র নেতা যিনি সারাজীবন সঠিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদের ঘোর বিপদ সম্পর্কে সজাগ এবং সতর্ক ছিলেন। পানি আগ্রাসনের মাত্রা, তীব্রতা এবং বিস্তৃতি সবই দিনে দিনে বাড়ছে, আর সাথে সাথে বেড়েই চলছে মওলানা ভাসানীর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান একজন বড় মাপের নেতার অভাবও। মহান এই নেতার প্রতি আমাদের বুধবারএর শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নিবন্ধ প্রকাশ করা হলো।।]

বাংলার ইতিহাস পড়ে আমি যে দু’জন নেতাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে বসাই তাঁরা হলেন মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব। তবে মওলানা ভাসানীর কথা বারবার মনে আসে। বাংলায় আরও কিছু বড় নেতা জন্মেছিলেন, যেমন চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং হোসন শহীদ সোহরাওয়ার্দী । কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে আমাকে হতাশ করেছেন। চিত্তরঞ্জন দাশের অবদান হিন্দু মুসলিম ঐক্যের ’বেঙ্গল প্যাক্ট’, কিন্তু তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। সুভাষচন্দ্র বসু বাংলায় জন্মেও তিনি বাংলার চেয়ে সর্বভারতীয় নেতা হওয়াটাই বেশী জরুরী ভেবেছিলেন। পরবর্তী বিশাল মাপের নেতা শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলা ভাগের আগে ও পরে দুর্বল ভূমিকার জন্যে গৌণ হয়ে গেছেন। 

মানুষের জীবনে সফলতা আছে, ব্যর্থতাও আছে। একজন নেতাও একজন মানুষ, তাই তিনিও ব্যর্থ হতে পারেন। মওলানা ভাসানী সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের জন্যে ক্ষমতায় যাবার পরিকল্পনা করেননি। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর মুখপাত্র ছিলেন না, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর মুখপাত্ররা তাঁর দলে ছিলো। এইসব নেতারা তাঁকে মোল্লা আখ্যা দিয়ে পরিত্যাগ করে নিজেরাই পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কারণ, তাদের মধ্যে জনগণের নেতা হবার কোন গুণ ছিলো না। মওলানা ভাসানী মজলুম জনগণের নেতা ছিলেন যে জনগণের মধ্যে আছে শ্রমিক কৃষক সকলে। তাই তিনি জনগণের নেতা হয়ে বেঁচে আছেন। শেখ মুজিব তাঁর লক্ষ্যার্জনে ক্ষমতায় যাবার পরিকল্পনা করতেন। তিনি ক্ষমতায় গেছেনও। কিন্তু তিনি যে দায়িত্ব পেয়েছিলেন তা এতো বড় ছিলো যে তিনি তা’ পালন করতে পারলেন না বা তাঁর সহযোগীদের মধ্যে ছিলো দুর্বৃত্ত এবং নকল মানুষ। শেখ মুজিব যখন বিপদে পড়লেন তখন এসব নকল সহযোগীরা তাঁকে ত্যাগ করে শত্রুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

মওলানা ভাসানীর নাম বার বার বাংলার জনগণের মুখে আসে যখন দেশ ছেয়ে যায় দুর্নীতিতে, বিশৃঙ্খলায় আর অত্যাচারে। যখন জনগণের তথাকথিত প্রতিনিধিত্বকারী দুর্বৃত্তরা কালো টাকা আর মাস্তান বাহিনীর জোরে জনগণের সম্পদ লুটপাট করে, দখলের পর দখল করে সরকারী সম্পদ, অবলীলাক্রমে আত্মসাৎ করে জনগণের সঞ্চিত অর্থ। যখন রাজনৈতিক দলগুলি বাগাড়ম্বরপূর্ণ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিরীহ জনগণকে ভোট নামক প্রহসনমূলক নিপীড়নে অংশগ্রহণে বাধ্য করে। মওলানা ভাসানীর নাম বার বার বাংলার নিপীড়িত জনগণের মুখে আসে কারণ তাদের পাশে দাড়ানোর এখন কেউ নেই। বাংলাদেশের পানিসম্পদ নিয়ে যে আগ্রাসন শুরু করা হয়েছে, সে বিষয়ে কার্যকরভাবে বলার কোন লোক আর নেই।

বাংলাদেশের বড় বড় নদী যথা গঙ্গা (ভাটিতে পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র (ভাটিতে যমুনা) এবং বরাক (ভাটিতে মেঘনা) ছাড়াও ছোট বড় আরও অনেক নদীর পানি ভারত, নেপাল, চীন, মায়ানমার ও ভূটান থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে। মায়ানমার থেকে আসা তিনটি নদীসহ ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এইসকল আন্তর্জাতিক নদনদীর সংখ্যা মোট ৫৭। এইসব আন্তর্জাতিক নদনদী ছাড়াও আরও কিছু বড় নদী আছে যেগুলি ভারতেই উৎপন্ন হয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে। এগুলি হলো কৃষ্ণা, কাবেরী, পেন্নার, গোদাবরী, মহানদী, সূবর্ণরেখা, নর্মদা, তাপ্তী, ইত্যাদি। ভারতের সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের হিসাব মতে, ভারতের প্রতি বছর মোট পানিসম্পদের যোগান ১৮৮ মিলিয়ন হেক্টর মিটার। এরই একটি বড় অংশ ১০১ মিলিয়ন হেকটর মিটার পানি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এইসব নদীগুলির পানিসম্পদ হরণের জন্যে রয়েছে ভারতের লোভ এবং রয়েছে অব্যাহত আগ্রাসন।

মওলানা ভাসানীর নাম বার বার বাংলার নিপীড়িত জনগণের মুখে আসে কারণ তাদের পাশে দাড়ানোর এখন কেউ নেই। বাংলাদেশের পানিসম্পদ নিয়ে যে আগ্রাসন শুরু করা হয়েছে, সে বিষয়ে কার্যকরভাবে বলার কোন লোক আর নেই।

ভারত সরকার ষাটের দশকে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ শুরু করে। গঙ্গার পানি বন্টনের কোনরকম চুক্তি ছাড়াই ১৯৭৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ভারত একতরফাভাবে ব্যারেজটি চালু করে। এর ফলে গঙ্গার পানির একটা বিরাট অংশ পরিবর্তিত পথে ভাগিরথী দিয়ে কলকাতার দিকে যেতে থাকে এবং বাংলাদেশ অংশে পদ্মা নদীর পানি হঠাৎ করে কমে যায়। ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ শেষে চালু হওয়ার সময়েই শেখ মুজিবকে ভারতের সাথে একটি চুক্তি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। কিন্তু শেখ মুজিবের অকালমৃত্যুর ফলে এব্যাপারে কোন অগ্রগতি হয়নি। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের উত্থান ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক শিথিল করে দেয়। ১৯৭৬ সালের গোড়ায় ফারাক্কার মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহার শুরু হলে ভাটিতে বাংলাদেশের নদীগুলোতে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বাংলার মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ঐ সময় ১৯৭৬ সালে অসুস্থ অবস্থায় পিজি হাসপাতালে ছিলেন। তিনি দেখলেন ফারাক্কার প্রতিক্রিয়াজনিত দেশের এই মারাত্মক পরিস্থিতিতে সরকার কোন কিছুই করতে পারছে না। তিনি আরও দেখলেন, দেশ পরিচালনায় বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাব। হাসপাতালে থাকা অবস্থাই তিনি মনস্থির করে ফেললেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই তিনি ঘোষণা দিলেন, ১৬ মে তিনি ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ করবেন। ঐদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা এক পত্রে তিনি বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখার ভারতের আগ্রাসী পরিকল্পনা বন্ধ করার অনুরোধ জানান। ৪ মে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর পত্রের জবাব দেন। কিন্তু ভাসানী ঐ পত্রে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি ‘ফারাক্কা মার্চ’ করার স্থির সংকল্পের কথা ইন্দিরা গান্ধীকে পুনরায় জানিয়ে দেন।

মওলানা ভাসানীর জীবনে সর্বশেষ গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা ফারাক্কা অভিমুখে তাঁর লং মার্চ। ভাসানীর বয়স তখন ৯১ বছর। এই বয়সেও তাঁর উদ্দীপনা, দিকনির্দেশনা সমগ্র জাতিকে আলোড়িত করেছিলো। এই দেশপ্রেমিকের ডাকে দেশ পুনরায় জেগে ওঠে। ১৬ মে ভাসানী এই লং মার্চের নেতৃত্ব দেন। সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর আহবানে সাড়া দেয়। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলার মানুষ শান্তি চায়, তবে ফারাক্কার সমস্যার সমাধানও চায়। তিনি লং মার্চে অংশগ্রহণকারী জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তারা যেন শত উস্কানীতেও সীমান্ত অতিক্রম না করে। ১৭ মে বিকেলে কানসাটে পৌঁছে তিনি এই মিছিলের যাত্রা সমাপ্তি ঘোষণা করেন। ফারাক্কা মিছিলের বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। ভাসানী ২৩ জুন পুনরায় ইন্দিরা গান্ধীকে এক পত্রে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের জন্যে লেখেন।

মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চের কারণে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার চাপের মুখে পড়ে। এরপর ফারাক্কার বিষয়টি তারা জাতিসংঘে উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়। তারা ফারাক্কার মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের নদী প্রবাহ, ফসল উৎপাদন, ও জনজীবনের উপর কি বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এবং সমুদ্রের লবনাক্ততা উজানের দিকে ধেয়ে আসা জনিত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত প্রতিবাদ লিপির উপর ফারাক্কার বিষয়টি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হিসেবে গৃহীত হয়। এরপর ভারত বাংলাদেশের সাথে একটি সম্মানজনক চুক্তি করতে বাধ্য হলে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর দুই দেশের সরকারপ্রধানগণ ১ম গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ঐ চুক্তিতে বাংলাদেশকে ন্যুনতম ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি দেবার গ্যারান্টি ছিলো।

আজ তিস্তা নিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে মওলানা ভাসানীর মতো নেতার অভাব বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। আজ যদি মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে গজলডোবা ব্যারেজ লং মার্চ করতেন। তিনি বাংলাবান্ধা পর্যন্ত যেতেন, যেখান থেকে অনতিদূরে একটি লিংক ক্যানালের মাধ্যমে মহানন্দা হয়ে মেচী নদীতে পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি বলতেন, বাংলাকে মরুভূমি করে রাজস্থান গুজরাটের মরুভূমিকে সুজলা সুফলা করার হীন প্রচেষ্টা রুখে দিতে হবে। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিতেন, বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরকেও চিঠি দিতেন। তার তৎপরতার কারণে বাংলাদেশ সরকারও তিস্তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফেরাম তথা জাতিসংঘে নেবার সাহস পেতো। তার সাহসিকতা ও আন্দোলনের চাপে বাংলাদেশ সরকার তার নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারতো।

তিস্তার পানি কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের যে প্রভূত ক্ষতি হয়েছে তা’ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শুধূ বিগত বছর নয়, ১৯৮৭ সালে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ চালু হবার পর থেকেই তিস্তার পানি কমছে ও বাংলাদেশের ক্ষতি হয়ে চলছে। ভারত তিস্তার পানি মহানন্দা খালের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে বিহারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই খালটি পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি জেলায় বিস্তৃত তিস্তা সেচ প্রকল্পের ডান তীরের প্রধান খাল বললেও এটি ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ খালের ১ নং খালের কাজ করছে ও তিস্তা অববাহিকা থেকে মেচী অববাহিকাতে পানি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনায় ৩০টি এই ধরনের খাল প্রকল্প আছে, যার মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির অববাহিকা থেকে পানি প্রত্যাহার করে রাজস্থান ও গুজরাটের থর মরুভূমি এলাকায় নির্মীয়মান সেচ প্রকল্প এবং দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে নিয়ে যাওয়া হবে।

উনিশ’শ পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ভারতের পরিকল্পনাবিদরা দেশব্যাপী আন্তঃনদী সংযোগের প্রস্তাব করে। কিন্তু সিন্ধু ও গঙ্গা অববাহিকার পানি নিয়ে পাকিস্তানের সাথে বিরোধ ভারতের বিরোধ বাধে। ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে Indus Waters Treatyস্বাক্ষরিত হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে কোন সমঝোতা বাদেই ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে। ১৯৭৫ সালে এই ব্যারেজ চালু হলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৭৭ সালের প্রথম ফারাক্কা চুক্তি পানির যে ভাগাভাগি করে তা ভারতের জন্য চূড়ান্তভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। কারণ ঐ চুক্তিতে শুকনা মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সরবরাহের গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। এরপরই ভারতের কাছ থেকে ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি এনে গঙ্গায় ফেলা তথা আন্তঃনদী সংযোগ প্রস্তাব আসতে থাকে।

১৯৯৯ সালে বিজেপি ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা পূনরায় জেগে ওঠে। এবার পরিকল্পনাটি ছিল স্পষ্ট, উত্তর পূর্ব ভারতের বাড়তি পানি পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে নিতে হবে। তবে ভারতের ভেতর দিয়েই অর্থাৎ উত্তর বঙ্গ, শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে ব্রহ্মপূত্রের পানি পশ্চিমে নেয়ার পরিকল্পনা করা হলো। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অখন্ড ভারত ও হিন্দুত্বের জিগির এবং দক্ষিণ ভারতের বুদ্ধিজীবীদের উৎসাহে পরিকল্পনাটি অচিরেই সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। কিন্তু বাধ সাধলো বিহার, আসাম, পশ্চিম বঙ্গ ইত্যাদি রাজ্যের জনগণ ও বুদ্ধিজীবীরা। এই পরিকল্পনাতে তাদের কোন উপকার নেই বরং আছে কোটি কোটি মানুষের উচ্ছেদ আর পরিবেশ বিপর্যয়।

নদী বা খালের ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে পানি তুলে নেয়া কিংবা পানিপ্রবাহে বাধা দিয়ে আংশিক বা সম্পূর্ণ প্রবাহ অন্যত্র চালান করা পানিসম্পদ হরণ করা ঐতিহাসিকভাবে অবৈধ। কারণ এইরূপ কাজ ঐ নদী বা খালের ভাটিতে অবস্থিত জনসাধারণ এবং জীবসকলের জীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে। তবে অতীতে শক্তির বলে কিংবা নদীর উজান ও ভাটির উভয় অংশের জনসাধারণের কল্যাণে আপোষে পানিপ্রবাহে বাধা দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের ২১ মে ১৯৯৭ সাধারণ সভায় বাংলাদেশসহ ১০৬ দেশের সম্মতি ও চীনসহ ৩ দেশের আপত্তিতে Non-navigational uses of International Watercoursesবিষয়ক কনভেনশনটি গৃহিত হয়েছে। ঐ আন্তর্জাতিক কনভেনশনে একই নদীর অববাহিকায় দুটি সার্বভৌম দেশের আপোষ ফর্মুলায় ঐ নদীর প্রবাহে বাধা দেবার বা উন্নয়নমূলক কাজ করার সুযোগ আছে। ঐ কনভেনশন ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে পানি ভাগাভাগির চুক্তি হয়েছে তা’ একটি বৈধ আন্তর্জাতিক আইন বলে মেনে নেয়।

তবে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির ৯ নং ধারায় কোন দেশ একতরফা নয় বরং উভয় দেশের মিলিক সম্মতিতে অভিন্ন নদীর উপর হস্তক্ষেপের কথা বলা আছে। কিন্তু ভারত তা’ না মেনে একতরফাভাবে উজানে গঙ্গা ও অন্যান্য নদীগুলির উপর হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলধারা সনদটি বিগত ১৭ আগস্ট ২০১৪ কার্যকর হয়েছে। ঐ কনভেনশনের ৭.১ ধারায় অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের বেলায় অন্য দেশের ক্ষতি না করার, এবং ৭.২ ধারায় ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণ দেবার কথা বলা হয়েছে। ঐ আইন অনুযায়ী আমরা তিস্তার পানি প্রত্যাহারের জন্য ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারি। তবে বাংলাদেশের ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর উপর ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আগামী দিনে আমাদের ভেতর থেকেই একজন মওলানা ভাসানীর মত নেতার আবির্ভাব হতে হবে।।

লেখক: প্রকৌশলী

Email: minamul@gmail.com