Home » অর্থনীতি » ‘বিপন্ন মানুষের ব্যাপারে সরকার চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে’ – বাংলাদেশী মানব পাচার সম্পর্কে জেনারেল মুনীরুজ্জামান

‘বিপন্ন মানুষের ব্যাপারে সরকার চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে’ – বাংলাদেশী মানব পাচার সম্পর্কে জেনারেল মুনীরুজ্জামান

LAST 1মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান (অব.), নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক খ্যাতিমান বিশ্লেষক। তিনি প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এ্যন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজএর প্রধান। বর্তমানে চলমান ভয়াবহ মানব পাচারের কারণ, কারা জড়িত, এর প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আমাদের বুধবারএর সাথে।

আমাদের বুধবার: মানব পাচারের বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করবেন?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: এটি নিঃসন্দেহে একটি মানবিক বিপর্যয় এবং এদেশের মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি, জীবনজীবিকার উপরে সত্যিকার অর্থে ভয়াবহ এক আঘাত। সমস্যাটি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু এর সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী যে কর্মকাপরিচালিত হওয়া প্রয়োজন ছিল তা না হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আপনি জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মানব পাচার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো অবস্থায় নেই অনেক দিন ধরে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সবারই জানা এ সমস্যাটি সম্পর্কে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগী হয়নি বলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

আমাদের বুধবার: এর কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: নানা কারণ চিহ্নিত করা যায়। তবে নানা কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে দারিদ্র। মানুষের কর্মসংস্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, সে ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যে তুলনায় বা হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। ফলে অভ্যন্তরীন কর্ম বাজারে সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় এসব মানুষ নিজ নিজ তাগিদেই কর্ম অন্বেষায় বিদেশী পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। তাছাড়া অবৈধ পন্থায় বিপজ্জনক পথে বিদেশে যাবার যে ঝুকি ও বিপদ রয়েছে সে সম্পর্কে যে জ্ঞান জনমনে থাকার কথা বা সরকারের দিক থেকে যেভাবে প্রচারপ্রচারণা এবং কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত ছিল তা করা হয়নি। এ কারণেই এসব সাধারণ মানুষ দালাল চক্রের হাতে পরে, ভুল পথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

আমাদের বুধবার: সরকারি পর্যায়ে বা ‘জি টু জি’ (দুই সরকারের মাধ্যমে) পদ্ধতিতে জনশক্তি রফতানির বিষয়টিকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: ‘জি টু জি’তে প্রধানত মালয়েশিয়ার সাথে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে যা হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। আগে মালয়েশিয়ায় বেসরকারি খাতে যেখানে বছরে এক থেকে দেড় লাখ জনশক্তি রফতানি করা যেতো, তা জি টু জি চালু হওয়ার পরে নেমে এসেছিল পাচ হাজারে। নামে জি টু জি থাকলেও বাস্তবে জনশক্তি রফতানির ধারা একেবারেই নিম্নগামী পর্যায়ে পৌছে গেছে। এখানে অন্য আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, অন্যান্য যে জনশক্তি বাজার তাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে দুটো চাপ এক সাথে সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আগে যে হারে জনশক্তি রফতানি হতো তা কমতে কমতে বলতে গেলে বন্ধই হয়ে গেছে। সৌদি আরবে সাম্প্রতিককালে বাজার খুলেছে অর্থাৎ জানালা খুলেছে। তবে এখনো পর্যন্ত যে হারে জনশক্তি রফতানি হওয়ার কথা, তা শুরু হয়নি। ফলে বিভিন্ন স্থানে যে জনশক্তি বাজার ছিল তা হয় সংকুচিত হয়ে গেছে অথবা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মানুষ বিকল্প পথগুলোকেই বেছে নিয়েছে বাধ্য হয়ে।

আমাদের বুধবার: লিবিয়া, ইয়েমেন, ইরাকে যে বড় জনশক্তি বাজার ছিল সেখানকার পরিস্থিতি তো খুবই খারাপ

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: হ্যাঁ, ওই সব এলাকায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় নতুনরা তো যাচ্ছেনই না, আগে থেকে যারা ছিলেন তারাও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় উদগ্রীব হয়ে হয়ে ফিরে এসেছেন অথবা ফেরার চিন্তা করছেন। কাজেই নতুন বাজার যদি সৃষ্টি করা না হয়, তাহলে যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছিলেন তাদের পথগুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে যেকোনো পন্থায়, যে কোনোভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন।

আমাদের বুধবার: এই মানব পাচারের সাথে কারা জড়িত থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: এক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত থাকার কারণে প্রাথমিকভাবে এবং প্রধানত দোষী বা দায়ী যদি কাউকে করতে হয় তা হচ্ছে, দেশীয় দালাল বা যে চক্রটি কাজ করছে তারা। আপনি জানেন যে, বিশ্বজুড়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের এটি একটি অবৈধ বাণিজ্য। কাজেই এতো বড় অর্থের যে বাণিজ্য সেখানে তা আর দেশীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না বা থাকতে পারে না এবং স্বভাবতই আন্তর্জাতিক চক্র এর সাথে যুক্ত হয়, কাজ করে। এটি আসলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় একটি সমস্যা। দালাল শ্রেণী যারা স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করছে, তারা আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে যোগাযোগ এবং সহযোগিতায়ই তাদের এই অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু দালাল গোষ্ঠীই জড়িত তাই নয়, এর সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মানুষেরা জড়িত হয়ে যায় সরাসরি কিংবা কিছুটা পরোক্ষভাবে হলেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সরাসরিই জড়িত থাকে। সর্বোপরি এটা হয়ে থাকে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়, নতুবা এটা সম্ভব নয়, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এখানে তো একজন দু’জন মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন না। টেকনাফে যে এলাকা দিয়ে মানব পাচার হয়ে আসছিল তা মালয়েশিয়া পোর্ট নামেই স্থানীয় ও অন্যান্য অনেকের কাছে পরিচিত। কাজেই এটা লুকিয়ে ছাপিয়ে হচ্ছিল না, খোলামেলাভাবেই চলছিল। খোলামেলাভাবে বেআইনী কাজ তখনই হতে পারে যখন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর যোগসূত্র থাকে। যদি এমনটা না হয় তাহলে এ ধরনের বেআইনী কর্মকাকোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ মানুষ যাচ্ছে, নৌযানে মানুষ উঠছে, যাচ্ছে সবার সামনে দিয়ে অর্থাৎ একটা আন্তর্জাতিক অপরাধমূলক অপারেশন সবার সামনে দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে! এটাই হচ্ছে প্রমাণ ওই যোগসাজসের। আপনি এটাও লক্ষ্য করেছেন যে, যখনই দেশীবিদেশী মিডিয়ায় মানব পাচারের কথা প্রচার হতে শুরু করলো, দেশীবিদেশী চাপ সৃষ্টি হলো, তখনই তারা হঠাৎ করে জেগে উঠলো। মাঠ পর্যায়ে যে কয়জন দোষী ব্যক্তি ছিল তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হলো। ক্রসফায়ারে দেয়ার প্রধান কারণ হলো যে, মানব পাচারের যোগসূত্রতার যে বিস্তৃত জালটা রয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে লুকিয়ে ফেলা হলো। এর সাথে কারা আছে, কারা এর উপরে আছে তা আর জানতে পারা যাবে না। কারা কারা জড়িত ছিল তাও আর জানা যাবে না। উচিত ছিল আইনী প্রক্রিয়ায় নিয়ে এসে কারা কারা এর সাথে যুক্ত তারা পুরো নেটওয়ার্কটাকে খুজে বের করা। কিন্তু এখন যেটা হলো, সাম্প্রতিক চাপ সৃষ্টির ফলে এটি কিছুদিন স্তিমিত থাকবে, পরে আবার তা চালু হয়ে যাবে।

আমাদের বুধবার: যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, যেমন ভয়াবহতার সৃষ্টি হয়েছে সেক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: সরকারের কোনো ভূমিকা দেখছি না, শুধুমাত্র স্থানীয় কয়েকজন দালাল বা দালাল চক্রের নেতাকে ক্রসফায়ারে দেয়া ছাড়া। আর এটাই হচ্ছে সরকারের প্রতিক্রিয়া। অথচ সরকারের প্রতিক্রিয়া থাকা উচিত ছিল, সম্পূর্ণ বিষয়াদি এবং প্রক্রিয়াটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে তা বন্ধের লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সর্বোচ্চ মানবিক বিপর্যয়ে পরা দুর্গত এই হাজার হাজার মানুষকে ফিরিয়ে আনা। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে যারা আছে, আন্দামান এবং মালয়েশীয়ইন্দোনেশীয় সমুদ্র উপকূলে জাহাজে করে যারা ভেসে বেড়াচ্ছেন সে সব অসহায় মানুষকে দেশে ফিরিয়ে আনা। এমন অনেক নৌযানও আছে যাতে কোনো নাবিক বা ক্রু এখন আর নেই, পালিয়ে গেছে, ওই সব জাহাজ কেউ চালাচ্ছে না, বিপজ্জনকভাবে জাহাজ ভেসে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে। বহু জাহাজে জ্বালানি তেল পর্যন্ত নেই। পানি নেই, খাবার নেই। এ অবস্থায় মানুষ মারা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের চরম এক পরিস্থিতি চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে দিয়ে ওই সব বিপন্ন মানুষকে উদ্ধারের ব্যবস্থা নেয়া। অথবা যেসব দেশগুলোর উপকূলে জাহাজগুলোকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, সে সব দেশগুলোর সাথে আলাপআলোচনা করে, সমঝোতায় এসে তাদের এটা বোঝানো যে, মানুষগুলোকে কূলে উঠতে দেয়া হোক, আমরা ওয়াদা করছি তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবো। তাহলে হয়তো ওই সব দেশ বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া সহযোগিতায় রাজি হবে। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ বা এর কোনো আলামত লক্ষ্যণীয় নয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে এই অসহায়, বিপন্ন মানুষগুলোর ব্যাপারে সরকারের চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। দুঃখ হয় যখন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, এটা আমার সাবজেক্ট নয়, এটা দেখার দায়িত্ব নেই। তাহলে দায়িত্বটা কার? রাষ্ট্রকে তো তার নাগরিকদের দায়িত্ব নিতেই হবে, অন্তত তার চরম দুর্ভোগে। মনে রাখতে হবে বৈধ বা অবৈধ যে পথেই তারা বিদেশে গিয়ে রেমিট্যান্স পাঠায় তার উপরই বাংলাদেশ বেচে আছে। ২৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের যে বড়াই আমরা করি তা তো তাদেরই পাঠানো অর্থ। কিন্তু আমাদের কর্তব্য পালন এবং দায়িত্ববোধটি কোথায়? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে তাদের ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি?

আমাদের বুধবার: সরকারের কাছ থেকে আর কি প্রত্যাশা আপনার ছিল?

জেনারেল মুনীরুজ্জামান: এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ, জরুরি অবস্থা। স্বাভাবিকভাবে যা হয় এবং অন্যান্য দেশে যা ঘটে থাকে তাহলো এমন সংকটকালীন মুহূর্তে মন্ত্রীসভার জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এক বা একাধিকবার, দায়িত্ব বন্টন করা হয়, অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। যেমনটা সম্প্রতি ভারতীয় নাগরিকদের ইয়েমেন থেকে সরিয়ে বা ফিরিয়ে আনার সময় ভারত সরকার করেছিল। দফায় দফায় মন্ত্রীসভার জরুরি বৈঠক হয়েছিল। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিজে জাহাজে থেকে সরেজমিন পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আমাদের সরকারের কাছ থেকে একটি বিবৃতিও আসেনি, জরুরি বৈঠক তো দূরের কথা। মানুষগুলোকে উদ্ধারের জন্য যে জরুরি তাগিদবোধ থাকা উচিত, তা তাদের নেই। সরকারের চরম উদাসীনতা এবং শৈথিল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুঃখের সাথে বলতে হয়, নাগরিক বা সুশীল সমাজের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পর্যন্ত শোনা যায়নি। এটা বলতেই হবে রাষ্ট্র হিসেবে, জাতি হিসেবে আমরা আমাদের দুর্গত, বিপন্ন মানুষদের প্রতি চরমতম উদাসীনতা দেখাচ্ছি।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।