Home » রাজনীতি » ভেস্তে গেছে রূপরেখা প্রনয়ন ॥ দল গোছাচ্ছে বিএনপি

ভেস্তে গেছে রূপরেখা প্রনয়ন ॥ দল গোছাচ্ছে বিএনপি

সাঈদ খান

DIS 4উদ্যোগ নিতে নিতেই অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে ‘আগামী নির্বাচন এবং সম্ভাব্য সরকার কাঠামো’ নিয়ে বিএনপি’র রূপরেখা প্রদান কার্যক্রম। দলের ভেঙ্গেপড়া সাংগঠনিক অবস্থা কাটিয়ে দল পূনর্গঠন এবং সংগঠন গোছানোর দিকেই এখন বেশি নজর বিএনপি’র। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দলের সাংগঠনিক ৭৫ জেলায় নতুন কমিটি গঠনের পর দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অন্তত ৪২টি জেলা সফর করার পর আবারো আগামীর নতুন আন্দোলন কর্মসূচীর চিন্তা ভাবনা রয়েছে বলে দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন। এছাড়া বছরের শুরুতেই ৯২ দিনের টানা অবরোধ হরতালে বিভিন্ন মামলার আসামী হয়ে আটক এবং আত্মগোপনে থাকা দলের শীর্ষ এবং জেলা নেতাদের মুক্ত করার ব্যপারেও ভাবছেন তারা। প্রয়োজনে কিছু কিছু বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সাথে আপোষও করার চিন্তা রয়েছে বলে জানান তারা। তাই সহসাই সরকার বিরোধী কেনো আন্দোলন বা কর্মসূচী ঘোষণার চিন্তা নেই দলটির। এই সময়ে শুধু মাত্র পেশাজীবী ও বিভিন্ন সমর্থক সংগঠনের কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

সিটি নির্বাচনের পর পরই দল এবং জোটের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে রূপরেখা ঘোষনার কথা জানিয়েছিলেন বিএনপিপন্থী শতনাগরিক কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু দল থেকেই তার এই ঘোষণার পালে আর হাওয়া লাগেনি। উপরন্তু দলের কিছু কিছু নেতার বিরাগভাজন হতে হয়েছে তাকে। ফলে নিজে থেকে আর কোনো ধরনের উদ্যোগ না নেয়ার কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক এমাজউদ্দিন। শুধু বিএনপি চেয়ারপারসন এবং দেশের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা রক্ষায় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্বটুকুই পালন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজে দলের কেউ না জানিয়ে,বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় ২০১৫এর ৫ জানুয়ারী থেকে শুরু করে টানা ৯২ দিনের আন্দোলন সফল হয়নি। এছাড়া দলের কিছু শীর্ষ নেতার রহস্যজনক ভূমিকাকেও দায়ী করেন তিনি। বলেন, উচিৎ ছিলো এধরনের কর্মসূচীতে যাওয়ার আগে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়া। আর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অবস্থাও ভালো নয়। শীর্ষ পদের অনেকেই মামলার আসামী হয়ে জেলে। আবার অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। এছাড়া অনেক নেতাই ক্ষমতাসীনদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসা বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের সরকার বিরোধী কোনো কর্মসূচীতে তাদের পাওয়া যায় না। ফলে এই মূহুর্তে দলীয় নীতিগত যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য দলীয় চেয়ারপারসন কারো ওপর নির্ভর করতে পারছেন না। যে কোনো সিদ্ধান্ত তাকে নিজেকেই নিতে হচ্ছে এবং নিচ্ছেন বলে জানান নেতা।

এছাড়া জামায়াত ইস্যুতে দলের জাতীয় নির্বাহী পরিষদ এবং উপদেষ্টা পরিষদে দেখা দিয়েছে মতানৈক্য। অনেকে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোট ভাঙ্গার পক্ষে। তাদের মতে, বিএনপির মতো দলের জামায়াতের সাথে জোট করা জরুরী বা প্রয়োজনীয় নয়। বরং জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করলে বিএনপি আরো শক্তিশালী থাকতো। আবার অনেকে আন্দোলনের মাঠে জোটগত নয়, যুগপৎ ভাবে জামায়াতের সাথে থাকার পক্ষে। আবার অনেকে জামায়াত ছাড়া আন্দোলন ও নির্বচনে বিএনপিরই ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন। এটিও বিএনপির সাংগঠনিক অচল দশার কারণ বলে মনে করছেন অনেক নেতা। আবার অনেকে মনে করছেন, শুধুমাত্র জোটে থাকার কারণে কিছূ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, বিএনপি দিন দিন জামায়াত নির্ভর দল হয়ে যাচ্ছে।

বিএনপির একজন উর্ধতন নেতা বলেন, আমরা দল পূনর্গঠনে মনোনিবেশ করেছি। এই মূহুর্তে শুধু জামায়াত নয়, ২০ দলীয় জোটকেই আপাতত বিলুপ্ত করলে কোন ক্ষতি হবে না।

শুধু জামায়াতকে বাদ দিলে তারা ভুল বুঝতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তবে এই মুহুর্তে ২০ দলীয় জোটেরই কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করছি না। পরবর্তী সময়ে আবার যখন আন্দোলন এবং নির্বাচনের প্রশ্ন আসবে তখন জোটের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এদিকে বিএনপির তৃণমূল নেতাদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, বিগত তিন মাসের আন্দোলন কর্মসূচীতে কেন্দ্রের নেতাদের রহস্যজনক ভূমিকায় তারা হতাশ। এ কারণে তৃণমূলের নেতাদের অনেকেই দলের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা গুটিয়ে নিয়েছেন। তবে কেউ কেউ আবার তাকিয়ে আছেন কেন্দ্রের দিকে। কেন্দ্রে যদি শক্তিশালী নেতৃত্ব না আসে বা কর্মসূচী ঘোষণা করে মাঠে নামার মতো সাহসী নেতৃত্ব না আসে, তাহলে দলের সাথে নিজেদের সম্পর্ক ত্যাগ করার চিন্তা করছেন অনেকে।

কথা হয় বাগেরহাট জেলা বিএনপির নেতা মিলন শেখের সাথে। গত পচিশ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পৃক্ত তিনি। গত দেড় বছরে জড়িয়েছেন অন্তত অর্ধশত মামলায়। এখন তিনি আত্মগোপনে আছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জেলার অধিকাংশ নেতাকর্মীই একাধিক মামলার আসামী হয়ে কেউ কারাগারে আবার অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। জেলায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার নেতাই এখন খুজে পাওয়া মুশকিল। তৃণমূল বিএনপির এই নেতা বলেন, অনেক কর্মীই শুধূ বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার কারণে মামলা হামলায় সর্বশান্ত হয়েছেন। অনেকে হারিয়েছেন জীবিকা নির্বাহের অবলম্বনও। দলীয় আইনজীবীদের কাছে মামলা নিয়ে গেলে টাকা ছাড়া আইনী সহায়তাও দিতে চায় না। গত দুই মাসে এ কারণেই বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত দুই শতাধিক কর্মী দল ত্যাগ করেছেন।

ফরিদপুর জেলা যুবদলের পদস্থ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাকিয়ে আছি ম্যাডামের দিকে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পূনর্গঠন না করলে এবং জেলা কমিটি থেকে আপোষকামী নেতাদের নেতৃত্ব থেকে না সরালে, দল ত্যাগ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কারণ হিসেবে এই নেতা বলেন, ক্ষমতাসীনদের সাথে সমঝোতাকারীরা যদি ঘুরে ফিরে আবারো নেতৃত্বে আসে দলের পরিনতি আরো ভয়াবহ হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ জানান, চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দল পূনর্গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে বিভিন্ন মামলার আসামী হয়ে দলের যেসব নেতা কারাগারে আছেন, তাদের মুক্ত করার ব্যপারেও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে দলের এক স্থায়ী কমিটির সদস্যের তথ্য মতে, মামলা থেকে মুক্ত করতে কোনো কোনো ইস্যুতে সরকারের সাথে আপোষ করার কথাও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভাবা হচ্ছে।

অনেক নেতাই বলেছেন, সকল মেয়াদ উত্তীর্ন অংগ ও সহযোগী সংগঠনের সব ইউনিটের কমিটি গঠন করতে হবে। নেতাকর্মীদের তৃনমুলের ভোটে নির্বাচিত করে দায়িত্ব দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহন করলে দল আবারো ঘুরে দাড়াতে পারবে, আর পকেট কমিটি করা হলে দল আগের মতেই থাকবে, কোনই উন্নতি হবেনা।

বর্তমানে বিএনপি তাহলে কে চালাচ্ছে বা কিভাবে চলছেএমন প্রশ্নের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একক সিদ্ধান্তে চলছে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল। স্থায়ী কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ বা জাতীয় নির্বাহী পরিষদের কারো ওপরই নির্ভর করতে পারছেন না তিনি। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসও করতে পারছেন না বলেও জানা গেছে। এ নিয়ে চেয়ারপারসন ঘনিষ্টজনের মতে, বেগম জিয়ার সাথে দেখা করে অনেকেই অনেক ধরনের পরামর্শ এবং করনীয়ের ব্যাপারে বলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই গ্রহণ করেন। তাদের মতে, বিগত আন্দোলন কর্মসূচীতে অনেকের পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু এর ফলাফল সুবিধাজনক না হওয়ায় এ পথে হাটছেন তিনি।

বিএনপির নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের এক নেতা জানান, আপাতত দল গোছানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছি। দলের সাংগঠনিক ৭৫ জেলায় পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠনের পর পরবর্তী করনীয় নির্ধারণ করা হবে। তিনি জানান, সাংগঠনিক জেলাগুলোতে কমিটি গঠনের সাথে সাথে সহযোগী এবং অংগ সংগঠনের কমিটিও পূনর্গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে। অনেকটা অগ্রগতিও আছে এসব কাজের। বছরের শেষ দিকে বেগম খালেদা জিয়া অন্তত ৪২টি সাংগঠনিক জেলা সফর করে আন্দোলনের প্লাটফর্ম গঠন করবেন। এর পর নতুন আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে বলে জানান এই নেতা।

এর বাইরে আন্তর্জাতিক মহলের সাথেও যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে বলে জানাগেছে। কারণ বিগত আন্দোলন কর্মসূচীতে পেট্রোলবোমা, জ্বালাও পোড়াও এবং জামায়াতের সাথে সম্পৃক্তরা বিষয়ে বিদেশীদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার ব্যপারে কয়েকজন ঘনিষ্ট নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন বেগম জিয়া। তাদের মাধ্যমে প্রভাবশালী দেশ এবং জাতিসংঘের কাছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, গণতন্ত্র, সরকারের ভূমিকা এবং বিগত নির্বাচনে অনিয়ম দুর্নীতি তুলে ধরছেন বেগম জিয়া। আবার নিজেও ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন।।