Home » অর্থনীতি » সমুদ্র আর সড়কে ‘এক পথ – এক রাস্তা’ :: চীনের নতুন কৌশল

সমুদ্র আর সড়কে ‘এক পথ – এক রাস্তা’ :: চীনের নতুন কৌশল

ওয়েডেল মিনিক, ইন্টারন্যাশনাল ডিফেন্স নিউজ

অনুবাদ: আসিফ হাসান

LAST 4পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। আর এই বদলে চীনের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। চীন বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হতে যাচ্ছে। তবে প্রচলিত পন্থায় নয়। নতুন নতুন উদ্ভাবন তাকে যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জগুলোকে ভালোমতোই মোকাবিলা করছে। এমনই একটি পরিকল্পনা চীনের ‘এক এলাকা এবং এক রাস্তা’ (ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড ওয়ান রোড) উদ্যোগ। এটা এমন এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে যা চীনকে এই অঞ্চলে অবিসংবাদিত ভূরাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

এই পরিকল্পনায় নতুন নতুন সড়ক এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে এক সুতায় গাঁথার জন্য নতুন নতুন পথের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন ভূখকে সংযুক্ত করার এই পরিকল্পনার দুটি অংশ রয়েছে। একটি হলো ‘সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্ট’যা মধ্য এশিয়ার পার্বত্যময় অঞ্চল দিয়ে ইউরোপের সাথে চীনকে যুক্ত করবে। আরেকটি রয়েছে ‘সামুদ্রিক সিল্ক রোড’যা সমুদ্রের মাধ্যমে আফ্রিকার বন্দরগুলোর সাথে চীনকে সম্পর্কযুক্ত করবে। এটা পরে সুয়েজ খাল দিয়ে ভূমধ্যসাগরে চীনকে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।

চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং এই উদ্যোগকে প্রাচীন সিল্ক রোড হিসেবে অবহিত করতে চাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি আসলে বোঝাতে চাইছেন, তাদের পরিকল্পনা নিছকই অর্থনৈতিক। সত্যিই কি তা? অনেকেই কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে দ্বিমত প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। এই যেমন সাংহাই জিয়াও তং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটেজি স্টাডিজের ঝুয়াং জিয়ানঝুং বলেন, ‘এক বেল্ট এবং এক রাস্তা পরিকল্পনা প্রধানত অর্থনৈতিক চিন্তা থেকে নেয়া। তবে এতে রাজনৈতিক উপাদান রয়েছে, আছে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও। এর লক্ষ্য হচ্ছে যৌথ উন্নয়ন, অভিন্ন সমৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা।’

এসব লক্ষ্য অর্জিত হলে তা বিশ্ববাসীকে আরেকটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সেই দুশ্চিন্তার নাম সন্ত্রাসবাদ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়া মানে মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যকে স্থিতিশীল করা। এ কারণেই তাই ঝুয়াঙের মতো বিশেষজ্ঞরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই অঞ্চলের কল্যাণের জন্য স্থিতিশীলতাপূর্ণ শক্তি হিসেবে এই উদ্যোগকে আরো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা।

চীন কিভাবে এসব নতুন রুটের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যে দ্বিধা রয়ে গেছে। কারণ এসব রুটের অনেকগুলো আফ্রিকার উপকূলে এবং মধ্য এশিয়ার হওয়ায় জলদস্যূ এবং ইসলামি চরমপন্থীদের হামলার শিকার হওয়ার শঙ্কা রয়েই গেছে। তবে নতুন রুট চালু করলেই হবে না এগুলোর জন্য প্রয়োজন লজিস্টিক হাব, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, বিমানবন্দর, রেললাইন, আধুনিক মহাসড়ক, বন্দর ও সামরিক উপাদান, যা যেকোনো সঙ্কটে দ্রুত সাড়া দেওয়া নিশ্চিত করবে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর মানে হলো দীর্ঘ পাল্লার, ফিক্সড উইঙ কার্গো বিমান, মালাক্কা প্রণালি ও সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলে সক্ষম হালকা জাহাজ, হাসপাতাল জাহাজ, এবং ‘যুদ্ধবহির্ভূত কার্যক্রম (এমওওটিডব্লিউ)’ সম্পাদনে সক্ষমতা বাড়ানো। অবশ্য ‘বেল্ট ও রাস্তা’র এই ধারণাটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন জেমস হোমস। মার্কিন নেভাল ওয়্যার কলেজের এই চীনা নৌবাহিনী বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক গুরুত্ব নেই। তবে এর মাধ্যমেই মিত্রদের সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়া থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে চীন।

চীন যদি ইউরেশিয়ায় একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা সৃষ্টি এবং অন্যদের বোঝাতে পারে যে, এর ব্যবস্থা আমেরিকার চেয়ে উন্নত, তবে সে তাদেরকে বড়শিতে গেঁথে ফেলতে পারে। হোমস বলেন, টোপ একবার কাজে লাগলে অংশীদারদের কাছ থেকে দাবি বাড়তেই থাকবে। চূড়ান্ত পযায়ে হয়তো সে অংশীদারদেরকে বলবে তাদের বন্দরে মার্কিন জাহাজ প্রবেশ সীমিত বা নিষিদ্ধ করতে। এখানেই সরাসরি নিরাপত্তা ও সামরিক সংশ্লিষ্টার বিষয়টি চলে আসে। হোমস মনে করেন না যে, এটা বর্তমান সময়ের বার্লিনবাগদাদ রেলওয়ে, যা আরব উপসাগরে পৌঁছার জন্য ইউরোপের সাথে উসমানিয়া সাম্রাজ্যকে সংযোগ করেছিল সেই ১৯০০এর শুরুর দশকে। এটা তেমন নয়, বরং এটা নিরাপত্তা, সামরিক এবং অর্থনৈতিকসংশ্লিষ্টপূর্ণ পরোক্ষ কূটনৈতিক প্রকল্প।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটিতে এশিয়াপ্যাসিফিক সিকিউরিটি প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ পরিচালক প্যাট্রিক ক্রনিন বলেন, ‘চীনের এক বেল্ট, এক সড়ক উদ্যোগের পেছনে দুরভিসন্ধি খুঁজে পাওয়া খুবই সহজ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তা হবে বাস্তবতার বিপরীতে ¯্রফে স্লোগান’। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে চীনের যে বদনাম হয়েছে, তা ঘোচাতে এই উদ্যোগকে বলা যেতে পারে ‘সফট পাওয়ার’ বিকল্প। আমেরিকাও ‘সফট পাওয়ার’ প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু সেটা করার জন্য যে উদ্ভাবনী শক্তি দরকার তা এই পরাশক্তিটির নেই দেশে ওই ঘরানার বুদ্ধিজীবিরা হতাশ।

চীনা সফট পাওয়ার প্রয়াসের একটি নজির হলো এশিয়ান অবকাঠামো ব্যাংক (এআইআইবি)। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির লক্ষ্য অবকাঠামো উন্নয়নে আঞ্চলিক প্রতিবেশিদের সহায়তা এবং ‘এক এলাকা, এক রাস্তা’ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে আমেরিকার এশিয়া নীতির ভারসাম্য পুনঃবিন্যাসের প্রয়াসকে মোকাবিলা করা। আবার বিশেষজ্ঞরা এআইইইবি প্রতিষ্ঠাকে চীনা দৃষ্টিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) প্রতি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিছু পেতে হলে কিছু দিতেই হবে। আমেরিকার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চীন যাদেরকে তার কাছে টানতে চায়, তাদেরকে নগদ কিছু দিতেই হবে। এ ব্যাপারে চীনের দীর্ঘ ঐতিহ্যও রয়েছে। সেই রাজরাজদের আমলেও চীনের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের উপহার ও পার্থিব উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

বেল্ট ও রোডের বর্তমানে পরিকল্পনাটির সামুদ্রিক অংশটি কেবল সম্প্রসারণ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) নৌবাহিনী অসংখ্য যুদ্ধবহির্ভূত কার্যক্রম তথা এমওওটিডব্লিউ পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে একটি হলো ২০০৮ সাল থেকে ইডেনে উপসাগরে জলদস্যূদের প্রতিরোধ। এছাড়া এই মে মাসেই পিএলএ নৌবাহিনী যুদ্ধপীড়িত ইয়েমেন থেকে তার নাগরিকদের উদ্ধার করেছে। এছাড়া ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত লিবিয়া থেকে নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার কাজও করেছে।

ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি প্যাসিফিক কমান্ড স্কলার ক্রিস্টোফার শারম্যানের মতে, এসব কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য চীনা নৌবাহিনী নতুন করে বিন্যস্ত করা হচ্ছে। নতুন একটি নৌবহরও গঠিত হতে পারে। চীনা নৌবাহিনী হয়তো এমনভাবে ঢেলে সাজানো হবে, যাতে করে দূর সাগরেও তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। শ্রীলঙ্কা, পূর্ব আফ্রিকা এবং সম্ভব হলে ইন্দোনেশিয়া থেকে সহায়তাও অব্যাহত রাখতে হতে পারে।।