Home » রাজনীতি » অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র এবং কথিত উন্নয়ন

অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র এবং কথিত উন্নয়ন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 1চতুর্থ মেয়াদে দেশ শাসনকালে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ভুলতে বসেছে। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় খোলসা করে দিয়েছেন, ‘তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তবে বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। মালয়েশিয়ায় মাহথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন শেখ হাসিনাও সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই গণতন্ত্রই তারা মেনে চলবেন’। ‘বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না’ এই বক্তব্যের ইঙ্গিতটি পরিস্কার। মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্য যদি তার নেত্রী বা দলের হয়ে থাকে (নিশ্চয়ই তাই, কারন এর বিপক্ষে কেউই মুখ খোলেননি), ধরেই নিতে হবে যে, তারা এত গণতন্ত্র বিলিয়েছেন তা অধিক মাত্রায় হয়ে গিয়েছিল এবং এখন মাত্রা কমাতে চাচ্ছেন।

প্রথমেই তারা মাত্রা কমাতে শুরু করেছেন অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রনের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেছেন। কালাকানুনের বেড়াজালে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রন করছেন এবং নানা সুযোগসুবিধা বিতরণ করে একটি ‘দলদাস বুদ্ধিজীবি শ্রেনী’ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রধান বিরোধী দলকে কোনঠাসা করতে করতে প্রায় নিশ্চিহ্ন করার উপক্রম করেছেন। বলা বাহুল্য, তারা এতসব করছেন, যাতে তাদের কথিত ‘অল্প গণতন্ত্র’ থাকে এবং দেশ শনৈ শনৈ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। যদি অতীত থেকে শিক্ষা নেই তাহলে দেখা যাবে, এই আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে (বাকশাল) রূপান্তরিত হয়েছিল এবং সবদল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল।

বাংলাদেশ জন্মের পর নির্বাচনবিহীন একদলীয় শাসন কায়েম করে ভুলটি করেছিল আওয়ামী লীগ, সেই ভুলের ভয়াবহ পরিনাম এবং ট্রাজেডি গোটা দেশ ও জাতিকে নিক্ষিপ্ত করেছিল এক অন্ধকার গহ্বরে। ইতিহাসের সব ভুলের ফল হয়তো একরকম নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতাগুলি মূল্যবান। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দেশের ভবিতব্য নির্ধারন করে দেয়া হয়েছিল পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থার নামে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার থেকে একদলীয় ব্যবস্থার দিকে। জাতীয় সংসদে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘আমি টু থার্ড মেজরিটি, তবু আপনারা এমেন্ডমেন্ট করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করেছেন। এই সিটে (প্রধানমন্ত্রীর) আমি আর বসব না, এটা কম দুঃখ নয় আমার, স্পিকার সাহেব, তবু আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি। শাসনতন্ত্র উত্তরণে সুষ্ঠ শাসন কায়েম করতে চাই। This is our second revolution, second revelation,আমাদের। এই revolutionএর অর্থ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এর অর্থ অত্যাচারঅবিচারনির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আমি চাই এই হাউস থেকে স্পিকার সাহেব, আপনার মাধ্যমে দেশবাসী দলমত নির্বিশেষে সকলকে বলব, দেশকে ভালবাস, চারটি প্রিন্সিপলকে ভালবাস। জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজম। তোমরা আসো, কাজ কর, দরজা খোলা’ (সূত্র: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে চতুর্থ সংশোধনী পাশের প্রাক্কালে শেখ মুজিবের ভাষন, গ্রন্থ: বাঙালি কন্ঠ, পৃ: ৩৭৩ )

আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দফা শাসনকালে (১৯৯৬২০০১) তারা কিংকর্তব্যবিমুঢ় ছিল এবং যে আয়োজনটি করে রেখেছিল তাতে পরের মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন হওয়া ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছিল না। তাদের সে আকাঙ্খা পূরণ না হওয়ায় ২০০৮ সালে পূনর্বার ক্ষমতাসীন হবার পরে তারা জাতীয় সংসদে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তারা সরাসরি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেনি বটে কিন্তু প্রধান বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কাজটি শুরু করে। বিএনপি যাতে পরবর্তী নির্বাচনে না আসতে পারে সেজন্য একের পর এক ফাঁদ তৈরী করে। অবিবেচক, অপরিনামদশী ও জামায়াতের সাথে গাঁটছড়ায় আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়া বিএনপি নেতৃত্ব এই ফাঁদে আটকে যেতে যেতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বসে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সুযোগ করে দেয় একটি একক নির্বাচন সম্পন্ন করতে। ঐ নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি মিলে সরকার গঠন করে এবং সংসদে সরকারী ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ কার্যত: অঘোষিত একদলীয় শাসন ব্যবস্থার কবলে পড়ে অনেকটাই ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন ঘটায়।

দীর্ঘকাল একদলীয়, সামরিক, সামরিক আদলে বেসামরিক শাসন থেকে নব্বইয়ের দশক থেকে গণতন্ত্রের পথে একটি যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরপর তিনটি নির্বাচন ছিল অংশগ্রহনমূলক, নিরপেক্ষ ও মুক্ত। গড়ে উঠেছিল একটি নির্বাচনমূখী গনতন্ত্রের ধারা। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা বা মূল্যবোধ ছিল না, উল্টো নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ছিল রাজতন্ত্রের মত উত্তরাধিকার চর্চা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, আমলাতন্ত্র ও বেসামরিক বাহিনীগুলোকে দলীয়করণ করে ব্যক্তির ইচ্ছাধীন করে তোলা হয়। দেশ পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠেন একক এবং ক্ষমতার দিক থেকে সুউচ্চ স্থানে। নামে সংসদীয় বা মন্ত্রীসভা শাসিত সরকার বলা হলেও প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাই হয়ে ওঠে মূখ্য। এর ফলে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা গণতন্ত্র বা উন্নয়নকোনটিরই পরিপূরক নয়। এখানে সব রাজনৈতিক নেতৃত্বই চেয়েছে, নির্বাচিত হয়ে একনায়কের মত দেশ চালাতে। এজন্যই প্রধান কাজ হিসেবে তারা হাতে নেয় দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার কাজ। ফল হাতেনাতে, গণতান্ত্রিক কাঠামো কাগজেকলমে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং ক্ষমতাসীনরা তো বলবেইতারা বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না।

১৯৯৬ বা ২০০৮ সালে নির্বাচিত হবার পর দলটির কাছ থেকে এমন বক্তব্য শোনা যায়নি। ২০১৪ সালে একক ও প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন করার পর সম্ভবত: দলটি অনুধাবন করে যে, গণতন্ত্র নিয়ে আর মাতামাতি করা যাচ্ছে না, জনগন আর বিশ্বাস করবে না। সুতরাং বিকল্প হিসেবে গণতন্ত্রের দখল নিয়েছে উন্নয়ন। জনগনকে উন্নয়ন স্বপ্নের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে এবং উস্কে দিতে হবে সেই বিতর্ক উন্নয়ন না গণতন্ত্র, কোনটি বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরী। এ জন্যই উদাহরন হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে মালয়েশিয়ার মাহথির মোহাম্মদ বা সিঙ্গাপুরের লিকুয়ান মডেল। স্বপ্ন তৈরী করা হচ্ছে গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে চটজলদি পৌঁছে যাওয়া যাবে ঐ মডেলে। সারাক্ষণ প্রচার চলছে চারপাশে বইছে উন্নয়ন জোয়ার। জিডিপি’র সাফল্যের সাতকাহন। বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের গল্প। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, উড়াল সেতু, আধুনিক ডিজিটালাইজড দুনিয়ার ঝলকানিসর্বোপরি একটি উন্নয়ন মিথ তৈরী করা হচ্ছে। গণতন্ত্র চলে যাচ্ছে নির্বাসনে! না, বেশিদিন নয়, মাত্র ২০৪১ সাল পর্যন্ত। তারপর আবার বেশি বেশি গণতন্ত্র! দেশ ফিরে আসবে।

দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্খায় বর্তমান শাসকদের মনোজগতে এখন ঠাঁই করে নিয়েছে আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। এই ধারণার পক্ষে এশিয়ার দুটি দেশ তাদের উদাহরন মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। গণতন্ত্রহীন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে মালয়েশিয়া গত ৫৬ বছরে দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন করেছে এবং ঐ শাসনের ধারাবাহিকতা চলছে। অন্যদিকে, গণতন্ত্রের গলা টিপে রেখে উন্নয়নের গতিধারা চালু রেখে প্রয়াত নেতা লিকুয়ান তার দেশকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিন রোজগেরে দেশের একটিতে পরিণত করেছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গতিধারাটি বজায় রাখতে তারা গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠালেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ছিলেন কঠোর। আর দুর্নীতির ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। লিকুয়ান সবসময়েই মেনে চলেছেন, দুর্নীতির চাকা চালু রেখে উন্নয়নের রথ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। চুরি করা টাকা পাচারের লোভ সামলাতে না পারলে কোন পদ্ধতিই এগোবে না। সার কথা ছিল, ফুটোনি করে ধারের টাকায় ঘি খাওয়া যাবে না।

উদাহরন হিসেবে ক্ষমতাসীনদের কাছে এসব খুব যুৎসই নয়, তারপরেও উল্লে#খ করা হয়েছে এ কারনে যে পৃথিবীর অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত একটি অপরাধ প্রবন দেশে এই মডেল চালুর কথা বলা হচ্ছে। এখানকার রাজনীতিকরা ভুলতে বসেছেন, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। কার্যকর গণতন্ত্রে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হয়। সংসদীয় নজরদারি বা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতায় ভারসাম্য থাকতে হয়। সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে, স্বাধীন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, এ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের মত প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করা। তাহলেই রাষ্ট্রে সুষম উন্নয়ন সম্ভব, যার অংশীদার হতে পারে সকল জনগন। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনরা এসব কিছু উপেক্ষা করে আচমকাই গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত মালয়েশিয়া মডেলের কথা ভাবছেন কি করে? উদাহরণ তো রয়েছেই, দীর্ঘ উন্নয়ন যাত্রায় দক্ষিণ কোরিয়ার জনগন গণতন্ত্রের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। মালয়েশিয়ায়ও এখন এ দাবি সার্বজনীনতা পাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ‘উন্নয়ন, সুশাসন ও রাজনীতির মালয়েশিয়া মডেল কি বাংলাদেশে খাটবে?’ শিরোনামে লেখা প্রবন্ধে অনেক প্রশ্ন রেখেছেন। অন্তিমে যে সিদ্ধান্ত টেনেছেন, তাতে বাংলাদেশে যে মালয়েশিয়া মডেল চলবে না, সেটিই পরিস্কার করেছেন। মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও পরিবর্তনের কথা উলে#খ করে বলেছেন, সেখানে সর্বস্তরে গনতন্ত্রায়নের দাবি এখন খুবই জোরালো। তার মতে, ‘দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এই মডেল চালু করা তো দুরের কথা, খোদ মালয়েশিয়াতেও তথাকথিত মালয়েশিয়া মডেলের ভবিষ্যত হয়ে পড়েছে প্রশ্নবিদ্ধ’।

উপমহাদেশের ক্ষেত্রে অমর্ত্য সেন খুবই প্রাসঙ্গিক। ভারতবর্ষের মানুষ সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন, তা বিবেচনায় নিয়েই তিনি লিখেছেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষ সবসময়ই একক কর্তৃত্ব বা মতাদর্শ মেনে না নিয়ে বরং মুক্ত আলোচনা ও তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়েই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজেছে। এ কারনেই পূর্ব এশিয়ার তুলনায় ভারতবর্ষের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রে বেশি আগ্রহী’। অমর্ত্য সেনের এই বিশ্লে#ষনটি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই যথার্থ। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকচিক্য কখনই এদেশের জনগন গণতন্ত্রের আকাঙ্খার সাথে মিলিয়ে ফেলেননি। ষাট দশকে পাকিস্তানের দোর্দন্ডপ্রতাপ শাসক আয়ুব খান এবং তার বাংলাদেশী সংস্করণ এরশাদ জনগনকে কখনই অল্প গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বা আস্থাশীল করতে পারেনি। কারণ উদারনৈতিক সংবিধানকেন্দ্রিক আইনের শাসন ছাড়া গণতন্ত্র বা মাহথির মডেল যাই বলা হোক না কেন সবকিছুই পর্যবসিত হয় নিপীড়নমূলক স্বৈরশাসনে। বাংলাদেশ কি তার সর্বশেষ উদাহরণ হতে চলেছে?