Home » মতামত » উন্নয়ন পরিসংখ্যান রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া কাম্য নয় – মানব পাচার সম্পর্কে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

উন্নয়ন পরিসংখ্যান রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া কাম্য নয় – মানব পাচার সম্পর্কে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

Rohingya and Bangladeshi migrants who arrived in Indonesia by boat eat as they recover from their journey inside an aid station in Kuala Langsa. হোসেন জিল্লুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। রাজনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও সুশাসন বিষয়ের গবেষক। তিনি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। মানব পাচারের কারণ, এর ফলে সৃষ্ট সামাজিক সংকট এবং চলমান উন্নয়ন আলোচনার অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার : অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশীরা মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পরে বিপদসংকুল সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো এবং ফলশ্রুতিতে গণকবরের সন্ধান পাওয়াসহ নানা ঘটনা ঘটছে। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

. হোসেন জিল্লুর রহমান : মানুষ ভাগ্যান্বেষণে দীর্ঘকাল ধরে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং ইতিহাসের মধ্যেই এই ধারা চলমান। কিন্তু অভুক্ত বিপন্ন অবস্থায় সমুদ্র যাত্রা, অনিশ্চিত অবস্থায় ভেসে থাকা, গণকবরের সন্ধান লাভসহ যে সব নৃশংস ঘটনাবলী ঘটছে তা একটি নতুন মাত্রা ও দিক বলেই মনে হচ্ছে। অবৈধ পথে মানুষ যেতেই পারেন এবং এমন ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু তার সাথে যে চরম নিরাপত্তাহীনতা, নিদারুন অমানবিক কর্মকাণ্ড ও নৃশংসতা দেখা যাচ্ছে তা সবার জন্যেই উদ্বেগের কারণ। উদ্বেগের কারণ এখানে যে, যারা যাচ্ছেন তারা জিম্মি হয়ে পড়ছেন, আবার কেউ কেউ হয়তো মুক্তিপণের মাধ্যমে ফিরে আসছেন এতে মনে হচ্ছে আমরা ঘটনার খুবই একটি খন্ডচিত্র দেখতে পাচ্ছি মাত্র। এই যে গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে মালয়েশিয়ায়, অথচ কিছুদিন আগেও ওই দেশটির পক্ষ থেকে এমনটি থাকার কথা অস্বীকার করা হয়েছিল। কাজেই এমনটাও ধারণা করা যায় এবং বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তাতে হয়তো আগামীতে আরও বড় কিছু দেখা যাবে। পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণে উদ্বেগের যে কারণটি তাহলো অবৈধ যাত্রার একটি পথ খুলেছে, আসলে বিষয়টি ঠিক তেমনটি নয়। যদি মনে করা হয় এটা শুধুই কালো অর্থনীতির একমাত্র বিষয়, আসলে তাও নয়। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক চক্র এবং অপরাধজগতের অনেকেই নিশ্চয়ই জড়িয়ে গেছে। সে জন্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিদেশ যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে এসব বিষয়গুলো নতুন সংযোজন এবং এর পরিধি অনেক বিস্তৃত বলেই আমাদেরকে গভীর উদ্বেগাক্রান্ত করেছে।

আমাদের বুধবার : বাংলাদেশীরা এসব বিপদ, প্রতিকূলতা, ঝুকি আর শংকা মাথায় নিয়েও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এর অর্থনৈতিক কারণ কি?

. হোসেন জিল্লুর রহমান : মানব পাচারে যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা বিশ্লেষণ করলে বলতেই হবে বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে যে অনেকগুলো অদৃশ্য বিষয় এবং ফাকফোকর রয়ে গেছে, এসব বিষয়গুলো পুরোটাই এখন সামনে চলে এসেছে। রাজনৈতিক সুবিধার্থে উন্নয়ন পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধিসহ নানা কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলে বিচার করতে হবে, উন্নয়ন কি? উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন, কর্মসংস্থান। উন্নয়নের অন্যতম বিষয় হচ্ছে, কর্মসংস্থান। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, উন্নয়ন নিয়ে যে আলোচনাগুলো চলছে তাতে পরিসংখ্যানগত কিছু আলোচনা এবং বড় বড় অবকাঠামোগত বিষয় কিংবা নতুন প্রযুক্তির আমদানি এসব কথা ঘুরেফিরেই আসে। কিন্তু কর্মসংস্থান যে আমাদের মতো অনুন্নত দেশের উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য সে বিষয়টি এখন সামনে চলে এসেছে এবং দেখা যাচ্ছে, ওই ফাকফোকরগুলো রয়ে গেছে। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির কথা বলা হলেও প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ লাখ নতুন নারীপুরুষ শ্রম বাজারে যুক্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা তাদের জন্য কর্মসংস্থান যোগান দেয়ার যে চ্যালেঞ্জটি, সেখানে ব্যাপক ঘাটতি রয়ে গেছে। আমাদের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলেও শিক্ষার বিস্তার ঘটছে এটা ঠিক, কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রসার ঘটছে না। তাছাড়া শিক্ষার মধ্যে দক্ষতা তৈরির অভাব লক্ষ্যণীয়। যেমন ধরুন ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশে কাজ করে তাদের দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। কারণ এখানে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। একদিকে শ্রম শক্তির দক্ষতার অভাব, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। প্রবৃদ্ধির যে গল্প বলা হচ্ছে সেখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়টি সীমিত। আর সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে সমস্যাটির উৎস কোথায়? আমি মনে করি উন্নয়নের যে গল্প বলা হচ্ছে এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিসংখ্যান ব্যবহৃত হওয়ার কারণে যে চ্যালেঞ্জগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রবণতা থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের আদৌ উন্নয়ন হচ্ছে কি হচ্ছে না, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার নিরীখে তার নির্মোহ বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। আর এটা অর্থনীতিবিদদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে না পারলে আমরা যা দেখছি তা কিন্তু থামবে না। কারণ অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্ট বেপরোয়া পরিস্থিতি যদি বিদ্যমান থাকে তাহলে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কিছুতেই থামবে না।

আমাদের বুধবার : এটাই কি একমাত্র কারণ?

. হোসেন জিল্লুর রহমান : যে বেপরোয়া প্রবণতা তা যে একেবারে না খেতে পারার কারণে সৃষ্টি হয়েছে তা নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের ফলে মানুষের চাহিদাও বেড়েছে। এখন একাংশের চাহিদা হচ্ছে কিছুটা স্বচ্ছল জীবন। বাংলাদেশে অর্থনীতির ক্ষুধার বিষয়টি অনেকাংশে দূর হয়েছে, কিন্তু মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা গ্রামীণ মানুষের মধ্যেও কিছুটা স্বচ্ছল জীবনের আকাঙ্খা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাপকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার ফলেই এই সংকট তৈরির একটি অন্যতম কারণ।

আমাদের বুধবার : আপনাকে ধন্যবাদ।।