Home » প্রচ্ছদ কথা » ওই মানসিক রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই

ওই মানসিক রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই

আমীর খসরু

coverবাংলাদেশী অভিবাসন প্রত্যাশীদের মরিয়া হয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার ফলশ্রুতিতে নানা নৃশংস, অমানবিক কর্মকাণ্ডের কথা আমরা প্রতিদিনই জানতে পারছি। যে সব ঘটনা আমরা জানছি তা অতীতে কখনই ঘটেনি এবং কিছুদিন আগে পর্যন্তও শোনা যায়নি। এমন সব ঘটনা যা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে শোনা এবং দেখা যাচ্ছে, হাজারে হাজারে বাংলাদেশীর জীবন কিভাবে ইতোমধ্যে বিনাশ হয়েছে, বিপন্ন হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এক এক করে যে সব ঘটনার সন্ধান মিলছে, উদঘাটিত হচ্ছে তা রীতিমতো শুধু ভয়ংকরই নয়, ভয়াল দুঃস্বপ্নেরও। কেন তারা বিদেশ যাচ্ছেন, তাদের যাওয়া উচিত কি উচিত নয় এই বিপদের দিনেও সরকার সেসবের চুলচেড়া বিশ্লেষণে নেমেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন অর্থাৎ যারা এখনো জীবন নিয়ে অসহায় অবস্থায় বেচে আছেন তাদের উদ্ধার করা, তাদের পাশে দাঁড়ানো সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ যেমন দৃশ্যমাণ নয়, তেমনি কোনো পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে না। উল্টো যেসব সাধারণ মানুষ একটু উন্নতর জীবনের আশায় কিংবা জীবন বাচাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশবিভূঁইয়ে তাদের নিয়ে পুরো রাষ্ট্রটি যেন ঠাট্টাতামাশায় নেমেছে।

ওই সব মানুষের বিদেশে যাওয়া উচিত হয়েছে কি হয়নি তা নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রীতিমতো যে গবেষণা হচ্ছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সরকার প্রধানের বক্তব্যেই। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যারা অবৈধভাবে বিদেশ যাচ্ছে, তারা নিজেদের জীবন বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। আমি মনে করি দালালদের পাশাপাশি ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অবৈধ পথে বিদেশগামীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ হতে পারে’। প্রধানমন্ত্রী একই বক্তৃতায় যারা বিদেশ যাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য বলেন – ‘টাকার সন্ধানে অবৈধ পন্থায় পরদেশে পাড়ি দেওয়া এই মানুষগুলো মানসিকভাবে অসুস্থ’।

শুধু প্রধানমন্ত্রীই এ এমন কথা বলে থেমে নেই, এখন ক্ষমতাসীনদের পক্ষের অনেকেই সরকার প্রধানের এই কথার প্রতিধ্বনি করছে। এমন কি কক্সবাজারের পুলিশের এসপি বলেছেন – ‘দাগী অপরাধীরাও সাগর পথে বিদেশ যাচ্ছে’। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বিদেশগামীদের অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করানোর চেষ্টাটি যথেষ্ট সচলভাবে জারি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মোতাবেক যারা অবৈধ পথে বিদেশ যাচ্ছে তারা মানসিক রোগী। তাহলে এ প্রশ্নটি আসতেই পারে, যখন জোর গলায় বলা হয় প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ বেড়েছে বা রেমিট্যান্স বেড়েছে, তখন কি এমনটা চিন্তা করা হয় যে, বহু মানসিক রোগীই আমাদের অর্থনীতির এক বিশাল শক্তি। তাদের অর্থের উপর নির্ভরশীল আমাদের সরকার, প্রশাসন, বড় বড় স্থাপনা নির্মাণসহ সবকিছু। যখন এই মানসিক রোগীরা দেশে অর্থ প্রেরণ করেন তখন কি এটা যাচাইবাছাই করা হয় যে, ওই অর্থ কি বৈধ পথে যাওয়া বাংলাদেশীদের, না অবৈধ পথে গিয়ে বহু চেষ্টায় বৈধতা যোগাড় করে পাঠানো বাংলাদেশীদের অর্থ? কখনই এটা যাচাইবাছাই করা হয় না। আর যদি নাই হয়ে থাকবে তাহলে এখন এ কথা বলা হচ্ছে কেন? আরও বলা হয়েছে, তারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধ, পরামর্শ উপেক্ষা করে ভোটারবিহীন নির্বাচনে কি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় না? দুর্নীতির কথা যখন দুনিয়াজুড়ে প্রচার করা হয়, তখন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না? যখন হত্যা, গুম, নারী নির্যাতনের কথা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতির কথা, মানবাধিকারের প্রশ্ন উত্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, তখনো কি ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না?

শ্রমিকদের উন্নয়নসহ জনমানুষের উন্নয়নের নানা গল্প আর কথা বলা হচ্ছে। উন্নতি যদি হবেই, তাহলে সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে, চেনা পথপ্রান্তরকে বাদ দিয়ে, বাবামাস্ত্রীপুত্রকন্যা, স্বজনদের দেশে ফেলে রেখে নানা বিপদের কথা জেনেও বিদেশ যাচ্ছে কেন? ধরে নেয়া যাক, অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় অনেক টাকা উপার্জনের জন্য বিদেশ যাচ্ছে, সোনার হরিণের পেছনে ছোটার আশায়। কিন্তু তা কি সবার ক্ষেত্রেই ঘটছে? উন্নয়নের অর্থ কি বড় স্থাপনা? উন্নয়নের অর্থ কি বিশাল এক বাজেট উপস্থাপন? উন্নয়নের অর্থ কি প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অংকের মারপ্যাচ? উন্নয়নের অর্থ যদি হয় জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন, তা কতোটুকু হয়েছে? প্রতি বছর বিশ লাখ মানুষ শ্রম বাজারে আসছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)’র এক হিসাব মতে বাংলাদেশে বেকার মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি। এই জনশক্তির জন্য চাকুরির সংস্থান কতোটা হয়েছে? কর্মসংস্থানের সংখ্যা বেড়েছে না কমেছে? এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৮’র নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার এবং নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাতে পরিবার প্রতি একজনের চাকুরি দেয়া হবে বলে বলা হয়েছিল। পরবর্তীকালেও এই প্রতিশ্রুতি তাদের দিক থেকে জারি রাখা হয়েছিল। নির্বাচনী ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচন, বেকার সমস্যা সমাধান, গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানসহ নানা কথা বলা হয়েছিল। ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে অন্তত ৮৫ শতাংশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ওই সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে কি? অর্থনীতির নানা তথ্য ও তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, দারিদ্র্য কমেছে। বাস্তব অবস্থা কি তাই? সরকারি হিসেবেই বলা হচ্ছে, বর্তমানে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছেন সাড়ে ৫ কোটি মানুষ। তাহলে কোন হিসেবে বলা হচ্ছে উন্নয়নের কথা। আওয়ামী লীগ ২০০৯’র নির্বাচনী ইশতেহারে রূপকল্প বা ভিশন ২০২১ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করে এই ভিশন তরুণদের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়েছিল। যে তরুণের বয়স ২০০৯এ ছিল ১৮ বছর, তার বয়স এখন ২৪। সেই তরুণতরুণীদের কতোজন চাকুরি পেয়েছেন, কতোজনেরই বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে?

বরং বিদেশের শ্রম বাজার ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাতের শ্রম বাজার বলতে গেলে বন্ধ। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া, ইয়েমেন থেকে হাজার হাজার বাংলাদেশী চলে এসেছেন বাধ্য হয়ে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার সাথে সরকারি পর্যায়ে অর্থাৎ জি টু জি ভিত্তিতে শ্রম বাজার চালু হলেও যে জনশক্তি গেছে তার সংখ্যা কোনোক্রমেই ৭ হাজারের বেশি হবে না।

যারা ভিটেমাটি বেচে, ধারদেনা করে বিদেশে যায়, তাদের শাস্তি দেয়ার আদেশ এসেছে। কিন্তু মানব পাচারের কালো অর্থনীতির সাথে যে সব বিশাল মানুষগুলো এবং চক্র জড়িত তাদের ব্যাপারে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তবে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? ৫ জন কথিত মানব পাচারকারীকে ক্রসফায়ারে দেয়া ছাড়া কোন ব্যবস্থাটি নেয়া হয়েছে কার্যকরভাবে? যারা সহায়সম্বল খুইয়ে বিদেশে গেছেন বা যাচ্ছেন তাদের কোন বিবেচনায় মানসিক রোগী বলা হচ্ছে? আর যারা মানব পাচারকারী তাদের তো কোনো রোগবালাই খুজে পাওয়া যায় না। যারা ভাগ্যোন্নষনে বিদেশে গিয়ে জীবন নিয়ে বেচেন আছেন তাদের না হয় বিচার হলো, কিন্তু যারা গণকবরে মাটি চাপায় জীবন দিয়েছেন, যাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে, তারা কি বিচার থেকে রেহাই পাবেন, না তাদের বিচার হবে এবং দেয়া হয়ে মরণোত্তর শাস্তি?

মানব পাচার, গণকবরের সন্ধান, সমুদ্রে ভেসে থাকা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কি কেউ নেই? সরকারের ভূমিকার কথা বলা হলো। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে খ্যাত বিএনপি কি সামান্য সহানুভূতি জানিয়েছে এই অসহায় মানুষদের প্রতি, করেছে কোনো প্রতিবাদ? অন্যান্য দলগুলোই বা কি করছে? এরা করবে না। কারণ, ক্ষমতাসীন হওয়ার স্বপ্ন আছে, আছে লেজুড় ধরে ক্ষমতার আশেপাশে থাকার। সেই স্বপ্নই আসলে তাদের বাধ্য করেছে জনগণের বিপক্ষে দাড়াতে। কারণ সব ক্ষমতালিপ্সু দলের জন্যই এসব বিপন্ন অসহায় মানুষগুলো শুধুই সংখ্যা মানুষ নয়। আর আমাদের দলদাস কথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী? তাদের দিক থেকেও কোনো কথা নেই। থাকার কোনো কারণও নেই। কারণ দাসদের বিবেক বলে কিছু থাকতে নেই।।