Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৮)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৮)

পাল্টে দেয়ার কাহিনী :: ফানশেন

আনু মুহাম্মদ

Last 3চীনে বিপ্লবী সরকার ক্ষমতাসীন হবার আগে থেকেই লালফৌজ নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সোভিয়েত এলাকা বা মুক্তাঞ্চলে ভূমি সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের শেষদিকে খসড়া কৃষি আইন প্রণয়ন করা হয় এবং তা ঘোষণা করা হয় একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর। মুক্তাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে এই আইন কার্যকর করতে করতে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নানারকম সংযোজন বিয়োজনও চলতে থাকে।

এই আইনের ১ নম্বর ধারায় বলা হয়, সামন্তবাদী ও আধা সামন্তবাদী শোষণমূলক কৃষি ব্যবস্থার চিরসমাপ্তি ঘটানো হবে এবং ‘লাঙল যার জমি তার’ এই নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। ২ নম্বর ধারায় বলা হয়, সামন্তপ্রভুদের ভূমি মালিকানার অধিকার বিলুপ্ত করা হবে। ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়, সংস্কারের আগে গ্রামের মানুষের ওপর চাপানো সকল ঋণ বাতিল করা হবে। ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়, গ্রামে জোতদারের সব জমি গ্রহণ করবে গ্রামের চাষী সমিতি। এই জমিসহ গ্রামের সকল জমি নিয়ে সমিতি গ্রামের সকল মানুষের মধ্যে (নারীপুরুষশিশুবৃদ্ধ) বিতরণ করবে। বিতরণের সময় বেশি উর্বর কম উর্বর বিবেচনা করতে হবে।

কৃষি বিপ্লবের বিভিন্ন পর্যায় আমাদের ক্রমে ব্যাখ্যা করতে হবে। তার আগে উইলিয়াম হিনটন এবং তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু কথা বলতে হবে। চীন বিপ্লবের প্রত্যক্ষদর্শী এবং এর গদ্যকার বিদেশিদের মধ্যে অন্যতম হলেন এই উইলিয়াম হিনটন। ১৯১৯ সালে শিকাগোতে জন্ম গ্রহণের পর অল্প বয়স থেকেই জাপান কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ায় ইংলিশ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছিলেন। অর্থের অভাবে হোটেলে ঘটিবাটি পরিষ্কার করেও জীবিকা নির্বাহ করেছেন অনেক সময়। ১৯৪২ সালে তিনি এডগার স্নোরেড স্টার ওভার চায়না পড়বার পর সবকিছু উল্টেপাল্টে যায়। স্নো এবং এই বই সম্পর্কে আমি আগে কিছু আলোচনা করেছি। মার্কসবাদ নিয়ে লেখা না হলেও এই বই হিনটনকে মার্কসবাদ ও বিপ্লবী লড়াইয়ে আকৃষ্ট করে।

১৯৪৫ এ হিনটন ’ইউ এস অফিস অব ওয়ার ইনফরমেশন’এর একজন সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন। সেসময় কুওমিনটাং ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার আপোষ আলোচনাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেসময়ই তাঁর মাও সেতুং ও চৌ এন লাইএর সঙ্গে আলাপের সুযোগ হয়। ১৯৪৭ সালে যুদ্ধোত্তর বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে জাতিসংঘ থেকে চীন সরকারকে কিছু ট্রাক্টর দেয়া হয়। এবং এগুলোর সাথে চীনে আসেন কয়েকজন প্রশিক্ষক, এদের একজন ছিলেন হিনটন। এগুলো দেয়া হয় কুওমিনটাং এলাকায়। হিনটন মুক্তাঞ্চলেও যান এবং দুই অঞ্চলের পার্থক্য তাকে আরও প্রভাবিত করে।

জাতিসংঘের কাজ শেষ হলেও তিনি থেকে যান মুক্তাঞ্চলে, মুক্তাঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংলিশ শিক্ষক হিসেবে। ১৯৪৮ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রামে ভূমি সংস্কার সহযোগী দল পাঠানো হয়। তিনি এইরকম একটি দলে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং চাংজির লংবো নামক গ্রামে ভূমি সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। এই গ্রামে তিনি অবস্থান করেন একটানা আট মাস, রাতদিন ছোট বড় সভা সমিতিতে যোগ দেন এবং নোট রাখেন বিস্তারিত। গ্রামের মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে হিনটনের, পরের কয়েক দশকেও যার ছেদ পড়েনি।

১৯৫৩ সালে কোরিয়া যুদ্ধের অবসানের পর হিনটন দেশে ফেরেন তাঁর বিপুল পরিমাণ দলিল দস্তাবেজ নোট সহ। মার্কিন বিমানবন্দরে কাস্টমস এগুলো বাজেয়াপ্ত করে এবং সব তুলে দেয় কুখ্যাত ‘সিনেট কমিটি অন ইন্টারনাল সিকিউরিটি’র হাতে। তখন দেশজুড়ে এই কমিটির নেতৃত্বে শ্বেতসন্ত্রাস চলছিলো। হিনটন এফবিআইসহ নানা সংস্থার একটানা হয়রানির মধ্যে থাকেন বহুবছর। তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়, সব ধরনের শিক্ষকতার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। মায়ের জমিতে কৃষিকাজ করেই তিনি এইসময়ে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। কিন্তু তারপরও এই সময়ে তিনি অবিরাম চীন বিপ্লবের পক্ষে কথা বলেন এবং আদালতের লড়াই চালিয়ে যান। পনেরো বছর পর তিনি আদালতের রায়ে সব কাগজপত্র ফেরত পেয়েছিলেন। এরপর এগুলোর ভিত্তিতে তিনি লংবো নামক সেই গ্রামে ভূমি সংস্কারের বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে লেখেন ফানশেন গ্রন্থ। সব বড় প্রকাশক এই বই প্রকাশে অস্বীকৃতি জানানোর পর মান্থলি রিভিউ প্রেস এটি প্রকাশ করে। প্রায় ৭ শ’ পৃষ্ঠার এই বই বহু হাজার কপি বিক্রি হয় এবং প্রায় সাথে সাথেই দশ ভাষায় অনুবাদ হয়। এর ভিত্তিতে ডেভিড হেয়ার নামে বিখ্যাত নাট্যকার নাটক রচনা করেন এবং প্রথম তা মঞ্চস্থ হয় লন্ডনে। পরে অন্য প্রকাশকেরাও এর অন্য সংস্করণ প্রকাশ করে।

ফানশেন নাম ও এই বই সম্পর্কে হিনটন ভূমিকাতে লেখেন, ‘প্রতিটি বিপ্লবই নতুন নতুন শব্দ নির্মাণ করে। চীনা বিপ্লব সম্পূর্ণ নতুন এক শব্দভান্ডারই নির্মাণ করেছে। এই শব্দভাণ্ডারে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ফানশেন। এর আক্ষরিক অর্থ ‘শরীর ঘোরানো’ বা ‘পাল্টে দেওয়া’। চীনের কোটি কোটি ভুমিহীন ও দরিদ্র কৃষকের কাছে এর অর্থ উঠে দাঁড়ানো, জোতদার জোয়াল ছুঁড়ে ফেলা, জমি ঘর উপকরণ যন্ত্রপাতি পাওয়া। এর অর্থ আসলে এর থেকেও বেশি। এর অর্থ কুসংস্কার ছুঁড়ে ফেলা, বিজ্ঞান অধ্যয়ন করা, নিরক্ষরতা দূর করা এবং পড়তে শেখা। এর অর্থ নারীকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে দেখা বন্ধ করা এবং নারীপুরুষে সমতা আনা, গ্রাম প্রশাসন আমলাদের হাত থেকে মুক্ত করে নির্বাচিত পরিষদের হাতে দেয়া। এর অর্থ এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করা। সেজন্যই এই বইএর নাম ফানশেন। লং বো গ্রামের মানুষেরা কীভাবে এক নতুন বিশ্ব নির্মাণ করেছেন এটা তারই কাহিনী।’

(চলবে…)