Home » শিল্প-সংস্কৃতি » রাষ্ট্রীয়ভাবে নিখোঁজ হওয়াদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (প্রথম পর্ব)

রাষ্ট্রীয়ভাবে নিখোঁজ হওয়াদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (প্রথম পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

last 7অবৈধ উপায়ে আসা যে কোনো সরকার, সেটা সেনাবাহিনী কর্তৃক অথবা নির্বাচন বর্হিভূত কিংবা যেনতেন নির্বাচন বা কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমেই হোক যে কোনো প্রকারেই শাসনকাজে নিয়োজিত হোক না কেনো, সেই সরকার স্বৈরতান্ত্রিক হতে বাধ্য। কেননা, জনগণের রায়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে কোনো সরকার নির্বাচিত না হলে, জনগণও তাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর সেই প্রত্যাখ্যানের জবাব আসে স্বৈরশাসনের মধ্যে দিয়ে। যে স্বৈরশাসন চলেছে পৃথিবীর নানা দেশে বিভিন্ন সময়ে। পুরো ষাট এবং সত্তরের দশক জুড়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চলেছে এসব স্বৈরশাসন, বিশেষত সেনা স্বৈরশাসন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত সাত বছর ধরে জেনারেল জর্জ রাফায়েল ভাইদেলারের নেতৃত্বে চলেছে চরম নির্যাতনমূলক সামরিক শাসন। নিখোঁজ আর হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। নিকারাগুয়ায় আনাষ্টিও সামোজার অধীনে চলেছে ৪৩ বছরের পারিবারিক শাসন। ষাটের দশকে রাফায়েল ট্রজিলেলা ডোমিনিকান রিপাবলিকে ক্ষমতা আরোহনের ছয়মাসের মধ্যেই প্রতিশোধের রক্তগঙ্গায় অবগাহন করলেন। যে কোনো সময় তুলে নেয়া হতো বিরোধী মতাবলম্বীদের। ষাটের দশকের মাঝামাঝি উরুগুয়েতে স্থাপন করা হয় ডিপার্টমেন্ট অফ ইনফরমেশন অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স যা ডেথ স্কোয়াড নামে পরিচিত ছিলো। ভয়াবহ সেসব নিখোঁজ, নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা মানুষ আজও স্মরণ রেখেছে। কারণ অতীত কখনো অতীত হয়ে যায়না। ফিরে ফিরে আসে। ফিরে আসে কারণ মানুষের স্মৃতি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়না। মানুষের এই স্মৃতিময়তার গল্প ‘নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট’, যে আলো চির প্রজ্বালিত থাকে।

ইতিহাসে দুটো ৯/১১ র ঘটনা মানুষ কখনো বিস্মৃত হতে পারবে না। একটা হলো, ২০০১ সালের আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা। আরেকটা ১৯৭৩ সালের জেনারেল আগুস্ত পিনোচে কৃর্তক চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দের ক্ষমতাচ্যূতির ঘটনা। আমেরিকার মদদে সালভাদোর আলেন্দেকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পিনোচে চিলিতে শুরু করেন সতর বছরের স্বৈরশাসন। যে স্বৈরশাসনের ইতিহাস অতীত হয়েও বর্তমান হয়ে আছে। চিলির এই অতীত ইতিহাস প্রামাণ্য চিত্রপরিচালক প্যাট্রিশিয়ো গুজমান তার নিপুণ হাতে শুধু তুলে ধরেননি তার ‘নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট’ ছবিতে, সেই সঙ্গে যুক্ত করেছেন জ্যোতির্বিদ্যা আর প্রতœবিদ্যাকে। মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন মানুষের হাড়ের ক্যালশিয়ামের গঠনের সঙ্গে আকাশের তারার ক্যালশিয়ামের গঠনের।

চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমি পৃথিবীর এক বিস্ময়কর ভূমি। যেখানে কখনো বৃষ্টি হয়না, অত্যন্ত শুষ্ক আবহাওয়া, কোনো পশুপাখি নেই, নেই কোনো পোকামাকড়, এক কথায় বিস্তীর্ণ রুক্ষ ভূমি ছাড়া কিছুই নেই। স্বচ্ছ আকাশ এবং তারা দেখার জন্যে সর্বোত্তম ভূমি। সব থেকে বড় কথা, বহির্বিশ্ব থেকে সব থেকে স্পষ্টভাবে এই একটি মাত্র বাদামী মরুভূমি প্রতীয়মান হয়, পৃথিবীর বাইরে থেকে আর কোনো ভূখন্ড এতো স্পষ্টভাবে দেখা যায়না। এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতেই পিনোচে নির্মাণ করেছিলেন তার কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। যে ক্যাম্প থেকে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী গুম অথবা নিখোঁজ হয়েছিলো। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি রেডিও টেলিস্কোপের বিভিন্ন অংশ, যে টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের তারা এতো স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে তারাগুলোকে ছোট ছোট বাল্বের মতো মনে হয়। উত্তম পুরুষের ধারাভাষ্যে, যা পরিচালক নিজেই বলেছেন, আমরা জানাতে পারি স্যান্টিয়াগোর পুরনো টেলিস্কোপের সাথে পুরনো চিলির কথা। যখন চিলি ছিলো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মতো, যেখানে ছিলো শুধুই এক স্বর্গীয় বর্তমান। যখন চিলির আকাশ বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলো। পিনোচে’র আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু যে চিলির জনগণের নিস্তরঙ্গ জীবনের ছেদ ঘটলো তা নয়, একই সঙ্গে ছেদ ঘটলো গণতন্ত্র, স্বপ্ন আর বিজ্ঞানের। তবু কিছু মানুষ, যারা সেই দুর্যোগের সতের বছর সময়ে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ স্বপ্ন দেখতেন। এই স্বপ্ন দেখাকে সব থেকে যা সহায়তা করেছিলো সেদিন তা হলো চিলির সেই অ্যাটাকামা মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়া। যে আবহাওয়ায় কোনো টেলিস্কোপ ছাড়াই আকাশের তারার অবস্থান স্পষ্টভাবে নির্ণয় করা যায়, যা তাদের সেদিন বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছিলো। ছবির গতি যত এগিয়ে যায়, পরিচালক গুজমান দর্শকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, সেদিনের কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে বেঁচে যাওয়া ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, নিখোঁজ মানুষদের আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের মানুষদের সঙ্গে। পরবর্তী প্রজন্মের এমনই একজন গ্যাসপার গালাজ, যিনি চিলির পন্টিফিকার ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির, অ্যাস্ট্রোনমির প্রফেসর। তার কাছে আমরা জানতে পারি এই মহাবিশ্বের শুধু আকাশের খবর নয়, সেই সঙ্গে সময়ের এক বিস্ময়কর তথ্য।।

(চলবে…)