Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৯)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ১৯)

পরিবর্তনের শুরু

আনু মুহাম্মদ

Last 3চীন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ১৯৫৩ সালে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল ছিলো জাপবিরোধী যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোরিয়া যুদ্ধের বোঝা সামলানোর সময়। আর তার সাথে গ্রামে শহরে নতুন প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন সম্পর্ক এবং সংস্কৃতি নির্মাণের অবিরাম কর্ম উৎসব ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে সারাদেশে।

বিপ্লবী সরকার গঠন করবার সময় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সামনে ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের তিন দশকের অভিজ্ঞতা। রুশ বিপ্লবের পর সেখানে সাম্রাজ্যবাদী জোটবদ্ধ হামলা মোকাবিলা, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির রূপান্তরের কঠিন অধ্যায়, গ্রামাঞ্চলে যৌথকরণে জটিলতা, শিল্পায়নের সাফল্য ও ব্যর্থতা, পার্টির ভেতরের দ্বন্দ্ব সংঘাত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংসের মুখ থেকে বের হয়ে বিশ্বজয়ীর অবস্থান লাভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সে সময় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লবী, জাতীয় মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা ছিলো। সেই হিসেবে চীনের বিপ্লবী লড়াইএও সোভিয়েত প্রতিনিধিরা বিভিন্নভাবে ভূমিকা পালন করতে চেষ্টা করেছেন। বিপ্লবের আগে ও পরে চীনে সোভিয়েত সমর্থন ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পথ ও পদ্ধতি, অগ্রাধিকার, নীতি ও কৌশল ইত্যাদি ক্ষেত্রে সোভিয়েত প্রতিনিধিদের সাথে চীনা নেতৃবৃন্দের অনেকবারই মতবিরোধ হয়েছে। প্রয়োজনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনা নেতৃবৃন্দ সোভিয়েত দিকনির্দেশনা অগ্রাহ্য করেই কাজ করেছেন। পরে প্রমাণিত হয়েছে, সোভিয়েতের সব পরামর্শ শুনলে চীনের কমিউনিস্টরা নিজেদের হাতে ক্ষমতা আনতে পারতেন না, হয়তো তাদের কুওমিনটাংএর অধীনস্ত থাকতে হতো। প্রকৃতপক্ষে নিজেদের পরিস্থিতি নিজেরা উপলব্ধি করবার এবং যথাযথ লাইন নির্ধারণের ক্ষমতা, আর সেই অনুযায়ী নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবার সাহস ও সাবালকত্বই চীনের বিপ্লবীদের সফল করেছিলো। এর থেকে এটাও বুঝতে সহজ হয় যে, কেনো এবং কীভাবে ‘রুশপন্থী’ ও ‘চীনপন্থী’ রাজনীতি বরাবর নাবালক থেকে গেছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি, সমাজ ও শ্রেণীবিন্যাস, শিল্পায়নের মাত্রা, ভৌগোলিক অবস্থান, সাম্রাজ্যবাদীদের ভূমিকা, সাংস্কৃতিক গঠন ও লড়াইএর ইতিহাস ইত্যাদিতে রাশিয়ার সাথে পার্থক্য যেমন চীনের বিপ্লবের ধরনে ভিন্নতা এনেছে; তেমনি বিপ্লবউত্তর সমাজতন্ত্র গঠনেও নতুন চিন্তা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির তাগিদ তৈরি করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা ছিলো চীনের পথ অনুসন্ধানে বড় অবলম্বন। রুশ বিপ্লবে কৃষকদের ভূমিকা যতোটা ছিলো, চীনে বিপ্লবের প্রতিটি পর্যায়ে কৃষক সমাজের ভূমিকা ছিলো তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া ক্ষমতা গ্রহণের আগেই চীনা বিপ্লবীরা গ্রামাঞ্চলে ভূমি সংস্কারের মধ্য দিয়ে নতুন ভূমি ব্যবস্থা পত্তনের যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তার সুযোগ রুশ বিপ্লবীরা পাননি। সেকারণে রাশিয়ার গ্রামাঞ্চলে জমির জাতীয়করণ ও যৌথকরণ কর্মসূচি অনেক কঠিন অভিজ্ঞতা পার হয়েছে। এসব কাজের ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করবার শিক্ষা তাই চীনা বিপ্লবীদের সামনেই ছিলো।

বরাবরই চীন বিশ্বের সবচাইতে জনবহুল দেশ। বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জনশুমারী অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে, তখন জনসংখ্যা পাওয়া যায় ৫৮ কোটি ৩০ লক্ষ। বিপ্লবকালে এই সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি ছিলো এই ধারণা করা যায়। এতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে আবাদী জমি মোট জমির শতকরা মাত্র ১৩ ভাগ। জনসংখ্যার তুলনায় পানির প্রাপ্যতাও কম। কোনো কোনো অঞ্চলে এর সংকট ছিলো তীব্র। তবে প্রাচীন কাল থেকেই চীনে সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সংগঠিত ব্যবস্থা ছিলো। এর বিকাশের মধ্য দিয়ে আবাদযোগ্য জমির প্রায় পুরোটাই আবাদের অধীনে এসেছিলো ১৯৪৯ এর আগেই। কিন্তু তাতে অনাহার, দারিদ্র, অমানবিক দুর্দশা থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুক্তি মেলেনি। বিপ্লবীদের সামনে সমস্যা ছিলো তাই প্রথমত, বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন; এবং দ্বিতীয়ত, খাদ্য ও জমির ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা।

বিশ্বের শতকরা ৫ ভাগ পানি ও শতকরা ৭ ভাগ আবাদী জমি দিয়ে শতকরা ২০ ভাগ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা চীনের জন্য সবসময়ই একটি গুরুদায়িত্ব হিসেবে থেকেছে। ১৯৪৯ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিলো মোট ১০ কোটি টন। মাথাপিছু প্রাপ্যতা ছিলো ২০০ কেজি। এই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুমিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় চীনের মানুষ কয়েকটি ধাপে অগ্রসর হলো। কৃষক জনগণকে সাথে নিয়ে, ব্যাপক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে, অংশগ্রহণমূলক স্থায়ী একটি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলো চীনা পার্টি এবং তার সাথে যুক্ত বহুরকম সংগঠন। আগে থেকে কোনো মডেল ছিলো না। শুধু ছিলো জীবন, ভূমিসহ সকল সম্পদ এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কতিপয় শোষক দৃর্বত্ত বাদে সর্বজনের মালিকানা নিশ্চিত করবার লক্ষ্য ও দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ।

এই ধারায় গ্রামে গ্রামে ভূমি সংস্কার হয়ে দাঁড়ায় গরীব নারী পুরুষের উৎসবে। সকল পর্যায়েই নীচে থেকে ভেতর থেকে সবার অংশগ্রহণ ও সম্মতির ভিত্তিতেই জোতদার সমরপ্রভুর জমি জাতীয়করণ, জমি বিতরণ এবং সমবায়ী কাঠামো নির্মাণের কাজ অগ্রসর হয়। কয়েকবছরে সারাদেশে কমিউন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই ধারা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে পরিণতি লাভ করে। এর পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো ছিলো : পারস্পরিক সহযোগী দল, প্রাথমিক সমবায়, উচ্চতর সমবায় এবং কমিউন।।

(চলবে…)