Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (দ্বিতীয় পর্ব)

নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (দ্বিতীয় পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

Last 6বর্তমানের কোনো অস্তিত্ব নেই, আমাদের সবটাই অতীত, আমরা অতীতের মাঝে বসবাসে অভ্যস্ত’ গ্যাসপার গালাজ এভাবে যখন কথাটা বলেন তখন আমরা চমকে না উঠে পারিনা। কারণ কথাটা কোনো দার্শনিক জায়গা থেকে বলা হয়না, নির্ভেজাল বিজ্ঞানের জায়গা থেকে বলা হয়। অথচ একই কথা দার্শনিক হাইদেগার যখন তার বিখ্যাত ‘dasein বা ‘আছে ময়তা’ এর ব্যাখা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, যেখানেই আমরা গতির অনুসরণ করি সেখানেই যেন সময়কে পেয়ে যাওয়া উচিত, সময় যেন গতির সাথে যুক্ত। অথচ চলমান বস্তুটি ঠিক যেখানে, সেখানে আসলে সময় হাজির থাকেনা’ আমরা তখন দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক মতবাদ বলে অবিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু একই কথা যখন বিজ্ঞানী গালাজ বলেন তখন তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে বৈকি। সাক্ষাতকারে গালাজ জানান, ‘সূর্য থেকে আমাদের কাছে আলো পৌঁছাতে সময় লাগে আট মিনিট এবং চাঁদ থেকে এক সেকেন্ডের কিছু বেশি। …. বর্তমানের অস্তিত্ব শুধুমাত্র আমাদেন অভ্যন্তরে অবস্থিত যে মন তার ভেতর, একমাত্র ঐ জায়গাটিই শুধুমাত্র বর্তমান। কিন্তু আমরা যখন উচ্চারণ করি, ‘আমি’, তখন উচ্চারণের আগে চিন্ত বা সেন্স এবং উচ্চারণের মাঝে একটা সময়ের পার্থক্য তৈরি হয়ে যায় এবং ‘আমি’ সাথে সাথে অতীত হয়ে পড়ে।পৃথিবীর সবকিছু এমনকি আমরা যে এখন কথা বলছি এর সবকিছু অতীত। যেমন ধরেন, এই যে আমার সামনে ক্যামেরাটা আছে এবং এই ক্যামেরা থেকে যে আলো প্রক্ষেপন হচ্ছে আমার উপর এই দুইয়ের মাঝে একটা সময়ের পার্থক্য ঘটে যাচ্ছে, হতে পারে তা খুবই ছোট, এক সেকেন্ডেরও কিছু কম কিন্তু তা অতীত।—-অ্যাস্ট্রনমারদের সব থেকে বড় প্রশ্ন, পৃথিবীসহ বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সির উদ্ভব কীভাবে ঘটেছে তা খুঁজে বের করা। এটা এক অনন্ত গল্প, যে গল্প কখনো শেষ হয়না।’ আমরা তখনই কিছুটা ইঙ্গিত পাই, পিনোচের শাসনামলে নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বের করাও যেন এমনই এক অনন্ত গল্প। যে গল্প প্রত্নবীদেরাও খুঁজে বেড়ান। এর পরেই পরিচালক আমাদের প্রবীণ প্রত্নতত্ত্ববিদ লোরাটো নুনেজের কাছে নিয়ে যান। ছবিতে আমরা দেখতে পাই পাথরের পাহাড়ের গায়ে কলাম্বিয়ান পূর্ব যুগের প্রায় দুই হাজার বছর আগের আঁকা ছবি। লোরেটো নুনেজ জানান, জ্যোতির্বিদেরা শক্তিশালী টেলিস্কোপ উদ্ভাবন করেছেন, যা দিয়ে সুদূর অতীতকে কাছে আনার কৌশল আয়ত্ত করে চলেছেন, আমরাও তেমনি মাটি খুঁড়ে অতীতকে কাছে আনার আয়ত্তে নিয়োজিত। অর্থাৎ উভয় দলই অতীতকে গভীরভাবে খুঁড়ে খুঁড়ে সত্যের অন্বেষণে নিয়োজিত। আর তাই নুনেজ দুঃখ করে বলেন, ‘আমরা দূর অতীত দূরে থাক, নিকট অতীতকেই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। ঊনিশ শতকের কত ঘটনাই তো আমাদের এখনো অজানা। আসলে এ এক বিশাল স্ববিরোধিতা। এই যে ইতিহাসকে আমরা গোপন করছি, ইতিহাসের কাছে একদিন আমাদের দায়বদ্ধ হতে হবে।’ তারপর আমরা দেখি অ্যাটাকামা মরুভূমির কাছে ছাকাবুকো শহরের বিশাল কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। যেটা মূলত ক্যাম্প ছিল না, ছিল ঊনিশ শতকের একটা খনি। যে খনিতে মানুষ দাসের মতো ব্যবহৃত হতো। রেডিমেড সেই ক্যাম্পে বিভিন্ন রাজনৈতিক বন্দীদের ধরে এনে রাখা হতো এবং তারপর তারা কবে কখন নিখোঁজ হয়ে যেতো কেউ জানতো না। পরিচালক আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন সেই ক্যাম্পে বেঁচে যাওয়া এক বন্দী লুই হেনরিকেজের সাথে। ১৯৭৩ এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৪ এর অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই ক্যাম্পে ছিলেন। সেখানে বিশ সদস্য বিশিষ্ট একটা দলের সাথে লুই যুক্ত ছিলেন, যারা আকাশের তারা পর্যবেক্ষন করতেন, কোনো টেলিস্কোপ ছাড়া। যা সম্ভব হয়েছিলো অ্যাটাকামা মরুভূমির আবহাওয়ার কারণে। রাতের স্বচ্ছ আকাশে যখন তারার মেলা পর্যবেক্ষন করতেন লুই জানালেন তার অনুভূতির কথা – ‘রাতের আকাশে আমরা সবাই মিলে যখন নক্ষত্রপুঞ্জ দেখতাম, দল বেঁধে থাকা তারার মতোই আমরা সবাই এক ধরণের স্বাধীনতা অনুভব করতাম। তারাগুলো যেন এক অপার স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।’ লুই সেই ক্যাম্পের প্রায় মুছে যাওয়া দেয়ালে একের পর এক নামগুলো পড়ে শোনান, যে নামগুলো হারিয়ে গেছে আর কখনো তাদের খুঁজে পাওয়া যাবেনা। স্মৃতির অতলে তারা হারিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতি কি সত্যি হারিয়ে বা মুছে যায়? ঠিক তখনই আমাদের মনে পড়ে যায়, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো পরিচালিত ‘ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান’ সিনেমার শেষ দৃশ্যের কথা। যেখানে আমরা দেখি বই পোড়ানোর শহর থেকে পালিয়ে আসা একদল মানুষ নদীর ধারে, তাদের স্মৃতিতে পৃথিবীর নানা দেশের অজস্র বই ধরে রাখার জন্যে মুখস্থ করে যাচ্ছে। ছবির নায়ক মনটাগ, নায়িকা ক্ল্যারিসকে, স্মৃতিতে ধরে রাখার এই চেষ্টার কারণ জিজ্ঞেস করলে ক্ল্যারিস উত্তরে তাকে বলে – ‘আমরা এই জ্ঞান স্মৃতিতে ধরে রাখছি, যাতে স্মৃতি থেকে এই জ্ঞান কেউ কেড়ে নিতে না পারে।’ ক্ল্যারিস যেন আর্নেস্ট হেমিংয়ের মতো বলেন, মানুষকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু পরাজিত করা যায়না। স্মৃতির অবিনশ্বরতাই যেন নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট ছবির মূখ্য উদ্দেশ্য। তারপরেই ছবিতে আমরা মুগিয়েল লওনার নামে এরকম এক অপরাজেয় স্থপতির সাথে পরিচিত হই। যাকে ধারা বর্ণনায় স্মৃতির স্থপতি নামে অভিহিত করেন পরিচালক গুজমান। দিনের বেলায় মুগিয়েল লওনার পায়ের পদক্ষেপ দিয়ে মাপঝোঁক করতেন আর রাতে মোমের আলোয় ক্যাম্পের চিত্র এঁকে রাখতেন। পরদিন সেই কাগজ দুমড়ে মুচড়ে লুকিয়ে রাখতেন কোথাও। তারপর তাকে যখন ডেনমার্কে নির্বাসন দেয়া হয়, স্মৃতি থেকে সেই ক্যাম্পের খুঁটি নাটি সব এঁকে রেখেছিলেন। যে স্মৃতি তিনি আজও ধারণ করেন। তারপর পরিচালক আমাদের এমন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যার পরিচয় শুনে আমরা অবাক হয়ে যাই।।

(চলবে…)