Home » অর্থনীতি » বিদেশী বিনিয়োগের তুলনায় অর্থ পাচার বেশী

বিদেশী বিনিয়োগের তুলনায় অর্থ পাচার বেশী

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Last 2যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত গবেষণা ও পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ (জিএফআই) অর্থ পাচার নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে। তাদের হিসাবে প্রতি বছর উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রায় এক লাখ কোটি (১ ট্রিলিয়ন) ডলার পাচার হয়ে যায়। ‘অপরাধদুর্নীতি এবং কর ফাঁকি’ এই তিন প্রধান কারণে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে অর্থ পাচার। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশ থেকেও অর্থ পাচার বাড়ছে। জিএফআইয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য এমন কথাই বলছে। আবার সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) তাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে বিদেশিদের গচ্ছিত অর্থের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে বাংলাদেশীদের বড় অঙ্কের অর্থ থাকার তথ্য রয়েছে। সেখানেও আগের চেয়ে গচ্ছিত টাকার পরিমান বেড়েছে।

অর্থ পাচার বিষয়ে জিএফআইয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রকাশনার তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে গত এক দশকে ১ হাজার ৬০৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০০২ থেকে ২০১১ সময়কালে এই পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৮০ কোটি ডলার (২২ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে, যা তার আগের বছরে ছিল ২১৯ কোটি ডলার (১৭ হাজার কোটি টাকা)। দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি সরকারের শেষ সময়ে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। জিএফআইয়ের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে বিএনপি সরকারের শেষের দিকে ২০০৬ সালে অর্থ পাচার তার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৫ কোটি ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা। ২০০৮ সালে তা আবার কমে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি ডলারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক (টিজেএন) নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ হাজার ৪৭০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। এই অর্থ সরিয়ে নিয়ে করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও অঞ্চলে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পর বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশী পরিমাণ অর্থ বা আর্থিক সম্পদ কর ফাঁকি দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর এই পুঁজি পাচার ঘটেছে ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০১০ সময়কালে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৬০ কোটি ডলার (৫২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা)। এতে দেখা যায়, ২০০০ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে বাইরে পাচার করা হয়েছে, পরের ১০ বছরে তার চেয়ে অনেক বেশী অর্থ পাচার হয়েছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৮১০ কোটি ডলার (১ লাখ ৪৪ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা) সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আর পরের ১০ বছরে সরানো হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার (৫২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা)। ‘দ্য প্রাইস অব অফশোর রিভিজিটেড’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ব্যক্তি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কৌশলে তাদের আয় ও মুনাফা ফাঁকি দিয়ে এসব অর্থ নিজ দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। তবে এই হিসাবে শুধু আর্থিক সম্পদকেই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন অআর্থিক সম্পদ, যেমন : স্বর্ণ, জমিবাড়ি, রেসের ঘোড়া ও ইয়টকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

ইউএনডিপি’র এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৮০ কোটি ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৪০০ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে গত ৪ দশকে ( ১৯৭১২০১০) যে পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয় তা ২০১০ সালের জিডিপি’র ৩০ শতাংশ। সমীক্ষায় অবশ্য অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে নানা রকম অনিয়ম ও ফাঁকফোকরের কথা বলা হয়েছে। অবশ্য হুন্ডি, সোনা বা অন্যান্য বিলাস সামগ্রীর চোরাকারবারি, মানব পাচার এবং মাদক ব্যবসার মতো বিভিন্ন মাধ্যমে আরও কত হাজার কোটি টাকা পাচার হয়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায় না। দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, হংকংসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়েছে বেশকিছু রোড শো। এতে কয়েক বছর ধরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশী বিনিয়োগ আনতে সমর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। তবে বিনিয়োগ যে হারে আসছে, তার চেয়ে বেশী হারে অর্থ পাচার হচ্ছে দেশ থেকে।

গত এক দশকে এফডিআইয়ের দেড় গুণের বেশী অর্থ পাচার হয়েছে দেশ থেকে। আর স্বাধীনতার পর থেকে হিসাব করলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ এফডিআইয়ের তিন গুণ। সম্প্রতি সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এক পর্যটন মেলায় মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম প্রকল্পের ফরম বিক্রি করা হয়। এর আগে হোটেল ওয়েস্টিনে দুবাইভিত্তিক দামাক প্রপার্টিজ তাদের আবাসন প্রকল্প নিয়ে মেলার আয়োজন করে। এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এজেন্টদের মাধ্যমে দেশ থেকে অর্থ পাচারের ব্যবস্থা করছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, হংকং, দুবাই, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে এ অর্থ। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা নেয়ার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এক দশকে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশী এ সুযোগ নিয়েছে। এছাড়া ব্যাংককের প্রপার্টি মার্কেটের বড় ক্রেতাও বাংলাদেশীরা। এর মাধ্যমে দেশ থেকে চলে গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দেশে এফডিআই এসেছে ৮২৪ কোটি ডলার। আর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) হিসাবে ওই সময়ে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ দেশে আসা এফডিআইয়ের তুলনায় পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৬০ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, পুঁজি পাচারের ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত হওয়াটা খুবই জরুরি। বৈধ উপায়ে দেশের বাইরে অর্থ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সীমারেখা তৈরি করা আছে। সে সব পন্থায় দেশের বাইরে অর্থ নিয়ে যাওয়ার পথ খুব বেশী নয়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিয়ম মেনেই তাদের উপার্জিত অর্থ দেশের বাইরে নিয়ে যায়। এছাড়া ক্যাপিটাল আউটফ্লোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাই অবৈধ পন্থাগুলো কী, সেগুলো শনাক্ত করে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার আরো সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। সে হিসাবে চার দশকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে স্বাধীনতার পর চার দশকে দেশে মোট এফডিআই এসেছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করলেও দেশের বাইরে অর্থ পাচার রোধে তেমন ভূমিকা নেই সংস্থাটির। এ প্রসঙ্গে বিওআইয়ের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মল বলেন, অবৈধ উপায়ে অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থ পাচারের ঘটনা লোকমুখে শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এ বিষয়ে কেউ দিতে পারেনি। তাই প্রথমেই সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়গুলো শনাক্ত করতে হবে। তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

জিএফআইয়ের ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৩১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন বা মিস ইনভয়েসিং, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ওই এক দশকে ব্যালান্স অব পেমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫১০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেনের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মূলত রফতানির ক্ষেত্রে এ মিস ইনভয়েসিং হয়। এর মধ্যে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ১৪৬ কোটি ২০ লাখ ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ৬৮৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে বলে সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে। এবার পাওয়া গেল অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার চিত্র। এ দুটি আসলে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া সম্প্রতি আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারিও বেড়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকজনই সাধারণত দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি ইত্যাদিতে জড়িত থাকে। নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নির্বাচনের আগে এগুলো সরিয়ে নেয়া হয়, যার চিত্র জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালের তথ্য পাওয়া গেলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরো বেশী হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ৩৫ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে, একই সময়ে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থপ্রবাহ ছিল ৮৩ কোটি ডলার। এর পর নিয়মিতই অর্থ পাচার বাড়তে থাকে। এর পাঁচ বছর পর ২০০৮এ বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে যায়। যদিও এর দুই বছর আগে ২০০৫ সালে বাইরে যাওয়া অর্থপ্রবাহ ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। আর ২০০৬ সালেই অবৈধ পাচার ২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে, সে বছর অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পরিমাণ ছিল ২৬৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৭ সালে বেরিয়ে যাওয়া অথর্ প্রবাহ কমলেও এর পরিমাণ ছিল ২৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০০৮ সালে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশী পাচার হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আশঙ্কা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারই এর মূল কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাচার ও প্রবেশে অনেক উত্থানপতন ঘটলেও ২০১২ সালে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ২০১২ সালে বেরিয়ে গেছে ১৭৮ কোটি ডলার। নির্বাচন সামনে রেখে এ বৃদ্ধি বলে মনে করা হয়। আবার একই সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ১২৯ কোটি ২৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

সুইস ব্যাংকগুলোতে দেশবিদেশের পাচার করা গোপন অর্থের ইতিহাস বহু আগের। প্রায় ৩শ’ বছর আগে থেকেই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে গোপন অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা জমা রাখার ব্যবস্থা চালু ছিল। ফ্রান্সের রাজাদের সঞ্চিত অর্থ গোপন রাখার প্রবণতা থেকেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৭১৩ সালে জেনেভার সিটি কাউন্সিলে যে আইন করা হয়, তাতে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টের হিসাব গোপন রাখার বিধান চালু করা হয়। কেবল গ্রাহক ছাড়া অন্য কারও কাছে অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য জানানো ছিল নিষিদ্ধ। মূলত তখন থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচার করে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে রাখার প্রবণতা শুরু হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মইনুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করেন। তার গবেষণায় যে বিষয়টি উঠে এসেছে তাহলো বাংলাদেশী অভিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ‘হুন্ডি’ পদ্ধতিতেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে চলেছেন, যার ফলে বিশ্বের দেশে দেশে যেখানেই বাংলাদেশী অভিবাসীদের ঘনত্ব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, সেখানেই হুন্ডি চক্রগুলোর হাতে অভিবাসীদের সঞ্চয়ের বিপুল একটা অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। অভিবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এই অংশটা একটা ‘প্যারালাল বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে’ পণ্য হিসেবে ক্রয়বিক্রয় হয়ে চলেছে। প্রধানত মার্কিন ডলারেই এই বাজারে ক্রয়বিক্রয় চলে বিধায় এটাকে ‘হুন্ডি ডলারের বাজার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। জোগান ও চাহিদার শক্তিশালী কাঠামো গড়ে ওঠায় ‘হুন্ডি ডলারের’ এই বাজার দেশেবিদেশে ক্রমপ্রসারমাণ। বিশেষ করে গত তিন দশকে বাংলাদেশে বৈধ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সমান্তরালে এই ‘কার্ব মার্কেট’ প্রসারিত হয়ে দেশের বড় বড় নগরের সীমা পেরিয়ে দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন আর তেমন রাখঢাকের প্রয়োজন পড়ছে না কার্ব মার্কেটে ডলার কেনাবেচায়, এমনকি ব্যাংকারদের মধ্যস্থতায় অতি সহজেই নগদ ডলারের ব্যবসা চলছে খোলামেলাভাবে। এই হুন্ডি ডলার বাজারের কতগুলো অপব্যবহার দেশের অর্থনীতির জন্য ভীষণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুঁজি পাচারকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে।

অধ্যাপক মইনুল ইসলামের মতে, গত অর্থবছরে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশী রেমিট্যান্স দেশে পাঠানো হয়েছে বলে সরকারিভাবে তথ্যউপাত্ত প্রকাশ করা হলেও হুন্ডি পদ্ধতিতে সারা বিশ্বের ডলার বাজারে বাংলাদেশী অভিবাসী ও অনাবাসী বাংলাদেশীরা কত পরিমাণ ডলার পাঠিয়েছেন, তার প্রাক্কলিত তথ্যউপাত্ত সরকারিভাবে কিংবা কোনো বিশ্বাসযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া অসম্ভব। এ ব্যাপারে যে অঙ্কগুলো মাঝে মধ্যে বিভিন্নজন উদ্ধৃত করে থাকেন, সেগুলোর পেছনে ভালো গবেষণার অস্তিত্ব নেই।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হুন্ডি ডলার বাজারে পাচার হওয়া বাংলাদেশী অভিবাসীদের সঞ্চয়ের এই বিশাল প্রবাহের প্রধান ফায়দাভোগীতে পরিণত হয়েছে ক্ষমতাবান শ্রেনী, চোরাচালানিরা এবং দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকারী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস মালিকশিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা ও পুঁজিলুটেরা রাজনীতিকরা।।