Home » অর্থনীতি » গালভরা বাজেটে সাধারণ মানুষের লাভ কি

গালভরা বাজেটে সাধারণ মানুষের লাভ কি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

LAST 3গত ৪ জুন আমাদের অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে ৪৫তম তথা প্রস্তাবিত ২০১৫২০১৬ অর্থবছরের দুই লাখ ৯৫,১০০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন। যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে (২০১৪১৫) বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এবারের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা।

এতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা আদায় করা হবে। এনবিআরবহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। যে যেভাবেই আলোচনাসমালোচনা করুন কেন, এই বাজেটের কতগুলো দিক ভাল ও মন্দ দিক রয়েছে। যা নাগরিক জীবনে ইতিবাচক ও নেতিকবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথমত: দেশের প্রবৃদ্ধি গেল কয়েক বছর ধরে ৫৬ এর মধ্যে আটকে থাকছে। সেখানে এই বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে হঠাৎ করেই এই প্রবৃদ্ধি অর্জন কিভাবে হবে তার কোনো সঠিক দিক নির্দেশনা নেই এই বাজেটে। ফলে কোন বৈপ্ল#বিক পরিবর্তন ছাড়া হঠাৎ করেই প্রবৃদ্ধি বাড়ার কৌশলপত্রও এ বাজেট নয়। নিঃসন্দেহে এই বাজেটে বিনিয়োগ ও শিল্পক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য আর বাচনভঙ্গি থেকে যতটুকু বুঝতে পারা যায়, তাতে মূলত বিদেশি বিনিয়োগের কথা মাথায় রেখে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে দেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো ‘পলিসি ভিশন’ নেই। আমরা সবাই জানি গেল দুইতিন বছর থেকে দেশিয় বিনিয়োগ সেভাবে হচ্ছে না। এতে অর্থনীতি অনেকটাই চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে দেশিয় বিনিয়োগ না বাড়লে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সত্যিই অলীক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত: প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের জন্য যে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন। এ বিষয়ে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা নেই। যা কিছু বলা আছে, তা একেবারেই গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক চিন্তা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলে কর্মসংস্থানের জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ বাড়ানো ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন সেটা এই বাজেটে নেই। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে কথা বলা হয়েছে তা অর্থমন্ত্রীর কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই।

তৃতীয়ত: বাজেটে যে ব্যয়ের বিশাল আকার ধরা হয়েছে তা পূরণ করতে যে অর্থের যোগান কোথা থেকে হবে সে ব্যাপারে কোন স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়নি। সামগ্রিক আয় সংস্থান করতে গিয়ে বৃহৎ ব্যয় সংকুলানের জন্য বিভিন্ন ধরনের আয়ের উৎসে অবাস্তব ধরনের বৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই বাস্তব নয়। ফলে বাজেটের যে স্ফীতি, তার বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই। কিছু কিছু জায়গায় ব্যাপক ধরনের স্ফীতি দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলো কী ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যম অর্জিত হবে এ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। সরকার রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, তার একটি বড় অংশ অর্জিত না হবার সম্ভাবনাই বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে যে ধরনের সুনির্দিষ্ট পথনকশার প্রয়োজন, সেটি এ বাজেটে নেই। ফলে কোথা থেকে, কীভাবে এ অর্থের সংস্থান হবে সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। স্বাভাবিকভাবেই আয়ের লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেটে ঘোষিত অন্যান্য লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না। তাই বাজেটের আকার নয়, অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে বাজেটের বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

চতুর্থত: এ উচ্চভিলাসী বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা চাপানো হয়েছে তাতে করে দেশের মানুষের অবস্থা ভাল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, বরং আরো খারাপ হবে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস। এর ওপর আবার বাড়তি করের বোঝা চাপবে। জ্বালানি তেলের দাম কমানোর কোনো বক্তব্য বাজেটে নেই।

পঞ্চমত: প্রস্তাবিত বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের উৎসে কর প্রায় আড়াই গুণ বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। বাজেটে তৈরি পোশাক পণ্যের রপ্তানি মূল্যের উপর আরোপিত বর্তমান দশমিক ৩০ শতাংশ উৎস কর ২৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অন্য সব রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রেও রপ্তানি মূল্যের উপর উৎসে করহার দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একই করহারকে চূড়ান্ত কর হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ষষ্ঠত: কৃষকরা যে পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপের কথা বলা নেই এই বাজেটে। ফলে দেশিয় উৎপাদনের বৃহৎ ক্ষেত্রটির বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেই। ফলে এটা সার্বিকভাবে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ২০০৯১০ থেকে ২০১৪১৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট বাজেটে সামগ্রিক কৃষি খাতের অংশ ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে তা নেমে হয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বরাদ্দের বড় অংশই ভর্তুকি। ফলে এটা কৃষিখাতের জন্য খুবই দুঃসংবাদ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষকদের উপর। তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির কোনো বন্দোবস্তের ব্যবস্থাও প্রস্তাব করা হয়নি বাজেটে।

সপ্তমত: নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে তা ছিল ১১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার মোট বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ বিদায়ী ২০১৪১৫ অর্থবছরের বরাদ্দ ছিল ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আবার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ একই রকম আছে, দশমিক ৭৪ শতাংশ। পাঁচ বছর আগেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতের এই বরাদ্দ হতাশাজনক। এতে জনস্বাস্থ্যের দিকে সরকারের গুরুত্ব ও মনোযোগের বিষয়টি উপক্ষিত হয়েছে। এই বরাদ্দে চিকিৎসা নিতে মানুষের পকেটের খরচ বাড়বে। এতে দরিদ্রজনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা পাওয়া যে কঠিন হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

অষ্টমত: প্রস্তাবিত বাজেটে টাকার অঙ্কে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পেয়েছে ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা ছিল ১৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা ১৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি এক করে দেখানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাত বরাদ্দ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এবারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ। আর আগের অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। যা আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশের চেয়েও অনেক কম। অথচ ইউনেসকোর সুপারিশ হচ্ছে, শিক্ষা খাতে একটি দেশের বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রী বক্তৃতায় শিক্ষা খাত গুরুত্ব পেলেও বাস্তবে বরাদ্দে গুরুত্ব পায়নি। ফলে এটা মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করবে।

নবমত: মোবাইল ফোনের সিম ও রিম প্রদত্ত সেবার ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের সরাসরি জনগণের উপর প্রভাব পড়বে। এ ধরনের শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ন্যূনতম একটি স্তর নির্ধারণ না করেই এটা করা কোনো মতেই ঠিক হয়নি। এছাড়াও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাজেটে জনগণের জীবনে নেতিকবাচক প্রভাব ফেলার মতো প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ২০১৯ সালের পর দেশে আর গরিব মানুষ থাকবে না। তাঁর মতে, কোন দেশে ১৪ শতাংশের নীচে গরীব থাকলে তাকে গরীব বলা যায় না। সবসময় কিছু মানুষ অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকে, বয়স্ক, অক্ষম, শিশু ইত্যাদি। বর্তমান প্রবৃদ্ধির যে ধারা তাতে দারিদ্র বিমোচনে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ৩০ থেকে ১৪ শতাংশতে নেমে আসবে, তাতে করে দেশে আর দরিদ্র থাকবে না। সেটা হতে পারলে আমাদের জন্য প্রকৃতই একটি আনন্দ সংবাদ। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা বা সত্য আসলে কি তাই?

৬ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি কি দারিদ্রের এই হার এভাবে কমাতে পারে? যেখানে বিশ্বব্যাংক ও বিশেষজ্ঞরা ৭% প্রবৃদ্ধি ব্যতিরেকে এই ধারণা নাকচ করে দিচ্ছেন। তারপরে তত্ত্বে তা ঠিক হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা কতটা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য? উন্নয়ন অর্থনীতির তত্ত্ব ও সূত্রের সাথে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রবণতা কি সব ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ?

তত্ত্বগতভাবে সেটা অর্জন করা সম্ভব হলেও কি বলা যায় এ সময়ে নাগরিকদের একটা স্বচ্ছল অবস্থা তৈরি হবে? জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো সহজেই পূরণ করা সম্ভব হবে তাদের পক্ষে! আসলেই কি ৩ বছর পরে মৌলিক মানবিক প্রয়োজন গুলো মেটানোর ক্ষেত্রে এমন অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটবে? যেখানে কেবল দারিদ্রের কারণে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর প্রায় ৫০ শতাংশ ঝরে যায় প্রাথমিক পর্যায়ে, কেবল বাঁচার তাগিদে গ্রাম থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লোক প্রতিবছর ঢাকামুখী হয়, সাড়ে ২২ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে, প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষিত যুবকের কোন কাজ নেই, ভূমিহীনের সংখ্যা বাড়ছে, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য তীব্র হচ্ছে। এমন অনেক তথ্য দিয়ে এই বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করা যাবে। এ সময়ের মধ্যে এ অবস্থার কোন যাদুকরী পরিবর্তন না হলে এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হবে রাজনৈতিক চাতুর্য!

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১০১ ডলার, ২০১২ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ৮২২ ডলার। তার মানে ৪০ বছরে (১৯৭২২০১২) বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৮ গুণ! যেখানে সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে রুপান্তরিত করা। মধ্যআয়ের মানদকি? উপার্জনের স্তর অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক দেশগুলোকে ৪টি ভাগে ভাগ করেছে। () মাথাপিছু আয় ৯৯৫ ডলার বা তার নীচে হলে নিম্নআয়ের দেশ, () ৯৯৬৩৯৪৫ ডলার হলে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ, () ৩৯৪৬১২,১৯৫ ডলার হলে উচ্চমধ্য আয়ের দেশ এবং () ১২,৯৯৬ ডলার ও তার উপরে হলে উঁচু আয়ের দেশ বলা হয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশ এখন নিম্নমধ্য আয়ের তালিকায় আছে। মাথাপিছু আয় ২০০০ ডলার হবার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নাগরিক এই সমপরিমান অর্থ উপার্জন করতে সমর্থ হবে। এটি হচ্ছে একটি দেশের সমগ্র আভ্যন্তরীণ আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে হিসেব করা।

এই স্তরে উন্নীত হওয়া যেমন আনন্দের একই সাথে কিছুটা দুশ্চিতারও। কারণ এই স্তরে উন্নতি হওয়ার সাথে সাথে দেশ বেশ কিছু সুবিধা হারাবে। বিশেষ করেউন্নত বিশ্বে শুল্কমুক্ত পণ্যরপ্তানির সুবিধা হারাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। যে সুবিধা ব্যবহার করে দেশের রপ্তানি শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সুবিধাজনক জায়গায় আছে, সেটা আর থাকবে না।

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে আমদানিরপ্তানি বাণিজ্য কিছুটা কাছাকাছি এসেছে। গড় আমদানি ব্যয় হয়েছে ৩২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে গত অর্থবছর রফতানি আয় ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। গড়ে রফতানি আয় হয়েছে ২৪.১৩ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানোর প্রথম ধাক্কাটা এসে লাগবে এই সেক্টরে। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলার কি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেই বিবেচনায় ‘এই মর্যাদা অর্জন’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

বেতনভাতা, সুযোগসুবিধা, দুর্ঘটনা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে শ্রমিক অসন্তোষ একটি নিয়মিত বিষয়। আর বাইরের বিনিয়োগ ও ক্রেতার প্রধান মনোযোগ বাংলাদেশে সস্তা শ্রম, কাঁচামাল ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তি। এই সুবিধা উঠে গেলে তখন তাকে প্রতিযোগিতা করতে হবে মাঝারি আয়ের দেশগুলোর সাথে। আর বিদেশি ক্রেতাদের কাঙ্খিত মূল্যে পণ্য সরবরাহ করতে অক্ষম হলে এই শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন ছোটমাঝারি অনেক শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শ্রমিক ছাঁটাই ও বঞ্চনার কারণে ছড়িয়ে পড়তে পারে ব্যাপক অসন্তোষ। সেক্ষেত্রে এই আকাঙ্খা অর্জনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, তা বলি কিভাবে?

প্রবৃদ্ধির এই নেতিবাচক অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রধানত বিনিয়োগের হারকে দায়ী করে থাকেন। দেশে এখন বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ১০ বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ ২১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বরং গত দুই বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও কমেছে। ২০১১১২ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল সাড়ে ২২ শতাংশ, এখন তা ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ! বর্তমান যে ২৮ শতাংশ বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে সেটার পুরোটা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নয়। এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি পোষাতে সরকারি বিনিয়োগ যুক্ত হয়েছে। প্রধানত এই বিষয়ের দ্রুত পরিবর্তন ও উন্নয়ন নির্ভর করে বেসরকারি বিনিয়োগের উপর, আর তা হতে হবে বাৎসরিক ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু বাংলাদেশে তা গত একদশকে প্রায় ২০’র ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এই দুষ্টচক্র ভাঙতে প্রয়োজন দেশিবিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ যে কোন মূল্যে বাড়ানো।

এবারের বাজেট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ কারণ, নানা সীমাবদ্ধতায়ও অর্থনীতিকে গতিশীল করার অনেক শর্তই বর্তমান ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। যেমন ১. বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এখন সবচেয়ে বেশি, . মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ৩. প্রবাসী আয় ও প্রবাহ বাড়ছে ৩. বিনিময় হার মন্দ নয় ৪. রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা হলেও বাড়ছে ৫. লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে। ৬. আন্তর্জাতিক অর্থনীতিও ভালো অবস্থায়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে ৭. খাদ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল ৮. জ্বালানি তেলের দাম কমে গেছে, এতে সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে, এবং তেল বিক্রি করে মুনাফা করতে পারছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এতগুলো সূচক ইতিবাচক থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির হার কেন ৬ শতাংশেই থেকে গেছে, এবং বাজেটের আকৃতি বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার বিপরীতমুখী? এই পরিস্থিতির উপযুক্ত মূল্যায়ন ও এই সুযোগের মোক্ষম ব্যবহার হতে পারেএই বৃত্ত ভাঙ্গার প্রধান উপায়।

২০১৪’র বিবিএস’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৫.৬ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলছেন, দারিদ্যের হার এখন ২০ শতাংশের নীচে, আমরা জাতিসংঘ সহগ্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করেছি। সে কারণেই ২০১৫১৬ অর্থবছরের বাজেট হবে স্বপ্ন পুরণের বাজেট।’ তথ্যই কথা বলছে, ভবিষ্যতেও বলবে! স্বপ্নপূরণ কেবল কথার ফুলঝুড়িতে নয়, বাস্তবে দেখাতে হবে। দারিদ্র বিমোচন, মধ্যআয়ের, শীর্ষআয়ের দেশ, শক্তিশালী অর্থনীতি, কল্যাণ রাষ্ট্র সবই নির্ভর করছে লক্ষ্য নির্ধারণ ও দৃশ্যমান লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে। তত্ত্ব ও পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ বোঝে না, তারা চায় তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও পরিবর্তন। নাগরিকদের স্বপ্রণোদিত উদ্যোগই দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রধান শক্তি। সেই শক্তির সাথে দরকার সরকারের সততা ও দায়বদ্ধতার সমন্বয়। তাহলেই কেবল সম্ভব হবে স্বপ্নপূরণের সেই কথার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বাস্তবের অমসৃন পথে চলা, সেই কঠিন সত্যই হতে পারেপ্রকৃত স্বপ্নপুরণের সিঁড়ি।

প্রস্তাবিত বাজেট বিনিয়োগবান্ধব নয়। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ রাখা হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ জরুরি। আর এ বছরের বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৮৪৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। কিন্তু উল্টো রফতানিতে কর বাড়িয়ে দেশীয় শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করার পথ খোলা রাখা হয়েছে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বরাদ্দের বেশিরভাগ দেয়া হয়েছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এর ফলে আগামী অর্থবছরেও দেশে কাক্সিক্ষত পরিমাণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। এসব বিবেচনায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন স্বপ্নবিলাসী লক্ষ্য বলে মত তাদের। এদিকে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একটি জরিপ চালিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এ ক্ষেত্রে সংস্থাটি ৫টি মৌলিক সমস্যা চিহ্নিত করে। ওই জরিপ অনুসারে ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশে বিনিয়োগ যেমন হচ্ছে না তেমনি হওয়ার লক্ষণও নেই। সংশি#ষ্ট বিশে#ষকরা মনে করেন, বাজেটে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেগুলোও বাস্তবসম্মত নয়। এতে করে এ খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ যে বাড়বে না, তা আর বলার অবকাশ রাখে না।

বেসরকারি বিনিয়োগ কমছে : বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ শুক্রবার তাদের বাজেট পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৩১৪ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ, ২০১৪১৫ অর্থবছরে ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। উন্নয়ন অন্বেষণের মতে, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জিডিপির অনুপাতে ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু দেশের অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা ও বিদ্যমান ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। ফলে উভয় দিক বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি ব্যাহত হওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হবে।

বিনিয়োগের জন্য যা জরুরি : এ বিষয়ে সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, তারা বিনিয়োগ নিয়ে সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি জরিপ চালায়। সেখানে ব্যবসায়ীরা ৫টি সমস্যা চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, অবকাঠামো ঘাটতি, অদক্ষ সরকারি আমলা, সরকারের অস্থিতিশীলতা এবং অর্থায়নে পুঁজির স্বল্পতা। ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন ব্যাংকিং সিস্টেমেই মানি লন্ডারিং হয়েছে। ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবসায়ীদের মতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিরও লক্ষণ নেই। সংস্থাটি বলছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ বাধা ও সংকট নিরসনে বাজেটে কার্যকর কোনো উদ্যোগের কথা বলা নেই।

ব্যবসায়ীদের অবস্থান : ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটের দিকনির্দেশনায় তারা তৈরি পোশাক খাত নিয়ে শংকিত। কারণ, তৈরি পোশাক পণ্যের রফতানি মূল্যের ওপর আরোপিত উৎসে কর বর্তমান দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে উৎসে কর এক লাফে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। এই হার অব্যাহত থাকলে এ খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। পোশাক ও বস্ত্র খাতের চার সংগঠন বিজিএমইএর মো. আতিকুল ইসলাম, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও বিপিজিএমইএর বাজেটোত্তর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এসব কথা বলেন। বিজিএমইএর সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি তপন চৌধুরী এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান ও বিজিপিএমইএ রাফেজ আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের কাছে এমন মন্তব্য করেন। তারা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতায় মার খাবে দেশীয় শিল্প।।