Home » আন্তর্জাতিক » তিস্তা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য হতাশার কারণ হয়েছে :: রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর

তিস্তা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য হতাশার কারণ হয়েছে :: রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর

LAST 2হুমায়ুন কবীর, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন আমাদের বুধবারএর সাথে।

আমাদের বুধবার : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরকে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর : বাংলাদেশভারত সম্পর্কের দিক থেকে সাধারণভাবে এই সফরটিকে ইতিবাচক বলতে হবে। তার কারণ হচ্ছে, ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী, দেশটির সাথে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এ কারণেই ভারতের যেকোনো প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ৪১ বছর ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টের দুটি কক্ষেই অনুসমর্থনের পক্ষে নরেন্দ্র মোদী যে ধরনের নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্ষমতা দেখিয়েছেন সে প্রেক্ষাপট বিবেচনায়ও তার এই সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি তার যে মনোযোগ দেখা যাচ্ছে এবং এর মধ্যদিয়ে সার্কের প্রতি তার যে বাড়তি নজর তার একটি বাড়তি প্রতিফলন এই সফরের মধ্যদিয়ে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া আরও একটি কারণ অর্থাৎ গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশভারত সম্পর্ক যেভাবে যাচ্ছে তাতে তিনি নতুন একটি গতি সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন। তবে গতি সঞ্চারিত হয়েছে কিনা সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।

আমাদের বুধবার : তার এ সফরকে মূল্যায়ন করতে হলে লাভালাভের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। কারণ যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দুই দেশের ঐকমত্য হয়েছে সে সব বিষয় মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে কিভাবে দেখছেন?

হুমায়ুন কবীর : নরেন্দ্র মোদী আসার আগে যেটুকু প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সফর শেষে ওই প্রত্যাশার আলোকে অর্জনকে সেভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি না বা খুব একটা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পাদনে তিনি যে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন সে জন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কিন্তু এছাড়াও যে অন্যান্য বিষয়গুলো ঝুলে ছিল এবং যেগুলোতে তার কাছ থেকে আরও একটু বেশি নেতৃত্ব আশা করেছিলাম সে সব বিষয়ে আমরা কিন্তু খুব একটা অগ্রগতি লক্ষ্য করিনি। যেমন ধরুন, তিস্তা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে ভারতের কাছেও। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা তার কাছ থেকে সমাধানের ব্যাপারে কিছুই শুনিনি, এমনকি সমাধানের কাঠামো বা সময়সীমার ব্যাপারেও তিনি কিছু বলেননি। কাজেই তিস্তা নদীর পানি বন্টনের বিষয়টি আমাদের জন্য একটি হতাশার কারণ হয়েছে। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে, বিষয়টাকে আরও জটিল করা হয়েছে। প্রথমদিনে তিনি যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন তিনি তিস্তার পানি বন্টনের সাথে ফেনী নদীর বিষয়টিকেও নিয়ে এসেছেন। আমার ধারণা, এতে বিষয়টি জটিল হয়েছে বা হতে পারে। তার কারণ হলো তিস্তার পানি বন্টনের সমাধান নিজের কারণেই হওয়া দরকার এবং এ নিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারত বহু বছর ধরে বিভিন্ন ফর্মূলা বের করার চেষ্টা করছে। সবশেষ ২০১১ সালে একটি ফর্মূলাও আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে সে সময় চুক্তিটি হয়নি। তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়টি নিজ গুণেই সমাধানের দাবি রাখে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে ব্যাপারে আমরা কিছু শুনিনি। সীমান্তে মানুষ হত্যা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আমরা পাইনি যা বাংলাদেশীদের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা বাংলাদেশীরা মনে করি, যখন সীমান্ত সমস্যা সমাধান করা হচ্ছে, সে সময়ে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার ঘটনাটি চিন্তিত করে তুলেছে। আমাদের ধারণা ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সীমান্তে হত্যার বিষয়টির ইতি টানার জন্য অন্তত একটি নির্দেশনা দেবেন। এটা আমাদের সবার জানা যে, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকায় এসেছিলেন এবং ভারতীয় অন্যান্য উচ্চ পদস্থ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা এসেছেন তারা সবাই বলেছিলেন, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হবে। তবে নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকে এ ধরনের কোনো আশ্বাসবাণী কিন্তু আমরা শুনতে পাইনি। আর বাণিজ্যের ব্যাপারে দুই একটা সাধারণ কথাবার্তা ছাড়া খুব সুনির্দিষ্ট কিছু পাওয়া যায়নি। তবে আমার ধারণা, ভারত হয়তো মনে করছে বাংলাদেশে যদি বিনিয়োগ করা যায় তাহলে বাংলাদেশ থেকে রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। সব মিলিয়ে বলতে হবে সফরের ফলাফল মিশ্র।

আমাদের বুধবার : অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর উপরে চীনের প্রভাব কমানোর জন্যই নরেন্দ্র মোদী ওই সব দেশের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। চীন ফ্যাক্টরকে আপনি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

হুমায়ুন কবীর : থাকতেই পারে। ভারত একটি বড় দেশ। আমরা তার প্রতিবেশী। বাংলাদেশের যেমন নিজস্ব কিছু মতামত আছে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে, ভারতেরও তেমনটি থাকতে পারে এবং তা ভারতের নিজস্ব বিষয়। তবে আমি যা মনে করি তাহলো, আমরা ভারতের সাথে যেমন সুসম্পর্ক চাই তেমনি চীনের সাথেও সুসম্পর্ক থাকুক তা কামনা করি। আমরা কামনা করবো, বাংলাদেশ কোনো ধরনের প্রতিযোগিতার পক্ষ হতে চায় না, বরং আমরা সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে চাই।

আমাদের বুধবার : আপনি কি মনে করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের কারণে চীনবাংলাদেশ সম্পর্কের উপরে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রভাব পড়বে?

হুমায়ুন কবীর : আমি তা মনে করি না। কারণ ভারত এবং চীনের সাথে আমাদের যে সম্পর্কটি রয়েছে তা বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাংলাদেশ চীন থেকেই সবচাইতে বেশি পণ্য আমদানি করে এবং চীনই এক্ষেত্রে প্রধান দেশ, ভারত দ্বিতীয়। কাজেই ভারত এবং চীন তো আমাদের অর্থনীতির সাথে জড়িয়েই আছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিয়ে উভয়ের সংঘাতের কোনো প্রশ্ন নেই। একইভাবে আমরা রফতানির ক্ষেত্রে, বিনিয়োগের অন্যান্য ক্ষেত্রে একই চিন্তাভাবনা করতে পারি। কাজেই বিষয়টি যেহেতু আমাদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক নয় সেহেতু দু’দেশের সাথেই সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকতে পারে।

আমাদের বুধবার : ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে নরেন্দ্র মোদীর সফর কতোটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে?

হুমায়ুন কবীর : আমি তেমনটা মনে করি না। বাংলাদেশ কোথায় সমুদ্র বন্দর বানাবে কি বানাবে না বা কোন স্থাপনা আমরা তৈরি করবো সে সিদ্ধান্তটি আমাদেরই নিতে হবে। কিন্তু যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, ভারত বা চীন কে নারাজ হবে বা খুশি হবে সে প্রেক্ষাপটে বলা যায়, সবাইকে নিয়েই এ কাজটি আমরা করতে পারি। তাতে তো কোনো অসুবিধা দেখছি না। মিয়ানমারে যদি ওই দেশটিতে চীনভারতকে নিয়ে এক সাথে গ্যাস রফতানির কাজ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশচীনভারত এক সাথে কাজ করতে কেন পারবে না। শুধু এই সফর নয়, অন্য কোনো সফরেও বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং তা যদি নিরাপত্তা, শান্তিশৃঙ্খলা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে তাতে এক সাথে কাজ করা যাবে না তা আমি মনে করি না। বাংলাদেশের এই সক্ষমতা অর্জন করা বা তৈরি করা প্রয়োজন এবং এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আর এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ভবিষ্যতনীতি।

আমাদের বুধবার : আপনাকে ধন্যবাদ।।