Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ষষ্ঠ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ষষ্ঠ পর্ব)

ইরানের শাহের সাথে অস্ত্র ব্যবসায়

LAST 6আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (ষষ্ঠ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ: জগলুল ফারুক

শাহের সাথে দুষ্টচক্রের লেনদেন চলতেই থাকে। রিপোর্টারের কমিশনের মাত্রা বেড়ে ৫০ শতাংশে দাড়ায়। সম্ভবত এ কারণেই সবেমাত্র পুননির্বাচিত লেবারদলীয় প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনকে ১৯৭৪ সালের আগস্টে সাফিল্ড চমকপ্রদ কিছু নতুন সংবাদ শোনাতে পেরেছিলেন। উইলসনকে জানানো হয়, শাহ মোট ২ হাজার ট্যাংক কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলো তার পছন্দ মতো আরো বেশি শক্তিশালী ইঞ্জিন বিশিষ্ট হওয়া চাই। এগুলোর মোট মূল্য দাড়াতে পারে ১শ কোটি পাউন্ড।

উইলসনকে জানানো হয়, এই ট্যাংক বিক্রয় আমাদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উইলসন তার নথিতে লেখেন, ‘এটি সাদরে গৃহীত হওয়ার মতো একটি বিষয় এবং এ ব্যাপারে নেয়া পদক্ষেপের সাথে আমি একমত’। এরই মধ্যে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য ২৭ কোটিরও বেশি পাউন্ড বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে ২০ লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ ঘুষ হিসাবে প্রদান করা হয়ে গেছে। একইভাবে ব্রিটিশ এয়ারক্র্যাফট করপোরেশনও তাদের র‌্যাপিয়ার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির ব্যবসা করে নিয়েছিল। স্যার শাপুরের কাছে কোম্পানীর চেয়ারম্যান কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতেই লেখেন, ‘আমি আপনাকে বিশেষভাবে অভিনন্দিত করতে চাই’। ‘শাহের তহবিল’ সংক্রান্ত গোপনীয়তাটি ফাঁস হয়ে যায় কিনা তা নিয়ে ব্রিটিশরা একটু ভীতই হয়ে পড়েছিল। সাফিল্ডের লোকজন মন্ত্রিসভাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিন : ‘এই অর্থ প্রদান অবশ্যই ইরানের কাছে আমাদের কদর বাড়িয়ে দিয়েছে, তবে দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদান খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয় এবং এটি নিয়ে আমরা বেশি জানাজানি করতে চাই না। জানাজানি হলে বিষয়টি নিয়ে এমন সব কথাবার্তা উঠতে পারে, যা ওই ঘনিষ্ঠ দেশটির সাথে বিরাজমান আমাদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে’।

আরো ২০ কোটি পাউন্ড মূল্যের যুদ্ধ জাহাজ বেচাকেনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই সাথে ১৪ কোটি পাউন্ড মূল্যের হ্যারিয়ার যুদ্ধ বিমান বিক্রির কথাটাও শোনা গিয়েছিল। শাহ বিশালাকৃতির একটি সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও একটি জাহাজ নির্মাণ কারখানা গড়ে তোলার ব্যাপারে কথাবার্তা বললেন। ব্রিটিশরা একে ঘিরে ২শ কোটি পাউন্ড ব্যবসার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো।

অস্ত্র খাতে শাহের ব্যয় এরই মধ্যে ব্রিটিশদের নিজেদের জন্য করা ব্যয়ের পরিমাণকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি জানালেন, ইরানকে তিনি বিশ্বের পঞ্চম সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য দুঃসংবাদের জন্ম দিয়ে ১৯৭৯ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যান। সেই থেকে ইরানে এখন অব্দি আয়াতুল্লাদের শাসন কায়েম রয়েছে। শাহের অস্ত্র ক্রয়ের উচ্চাভিলাস সেদিন ভেস্তে গিয়েছিল। কেনাবেচার আওতায় থাকা বহু সমরাস্ত্রই আর শেষ পর্যন্ত সরবরাহ করা যায়নি এবং অস্ত্রের মূল্য বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থও বকেয়া থেকে গেছে। তবে লেবার এবং রক্ষণশীল দু’দলেরই প্রধানমন্ত্রীরা ঘুষ এবং দুর্নীতির সাথে কেন যেন এতটা সখ্য গড়ে তুলতে চাইতেন নগদ অর্থের এই রমরমাই তার প্রমাণ।।

(চলবে…)