Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (শেষ পর্ব)

নস্টালজিয়া ফর দ্য লাইট (শেষ পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

LAST 7ভিক্টোর গঞ্জালেজ, সফটওয়ের ইঞ্জিনিয়ার, চিলির প্রধান টেলিস্কোপ প্রতিষ্ঠান ALMAয় কর্মরত। ভিক্টোর চিলির নাগরিক হলেও, তার জন্ম জার্মানিতে। কারণ তার মা যখন অন্তসত্তা তখন তাকে নির্বাসনে যেতে হয় সেখানে। ভিক্টোরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার জন্ম জার্মানিতে। তার মানে তুমি একজন নির্বাসিত শিশু। বিষয়টা কেমন লাগে ? উত্তরে ভিক্টোর বলে, ‘আসলে আমি কোনো জায়গারই নই। না জার্মানির, না চিলির। তবু নিজেকে আমি একজন চিলিয়ান মনে করি।’ এই মনোবলের কারণেই মায়ের অনুপ্রেরণায় ভিক্টোর একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছেন। ভিক্টোর ইঞ্জিনিয়ার হতে পারলেও, বিশাল সেই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে আমরা দেখি একদল স্বজনহারা নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের হাড়গোড় খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিশাল মরুভূমির প্রান্তরে। স্বৈরশাসক পিনোচে তার দীর্ঘ সতের বছরের স্বৈরশাসনের আমলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু কোনো যুদ্ধে সংগঠিত হয়নি, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সংগঠিত হয়েছে। ছবির ফুটেজে আমরা প্ল্যাকার্ডে লেখা দেখি, ‘এটা কোনো যুদ্ধ নয়, গণহত্যা’। ছবির এই পর্যায়ে এসে আমরা দেখি সেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের, যাদের অধিকাংশই ছিলেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুম হওয়া মানুষ, তাদের স্বজনেরা তাদের খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছেন অ্যাটাকামা মরুভূমিতে। ছবির এই অংশ যেন ইতিহাস, জ্যোতিবির্দ্যা এবং প্রত্নবিদ্যার অনুসন্ধান সব অনুসন্ধান যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তবু কিছু পার্থক্য থেকে যায়। জ্যোতির্বিদ্যার প্রফেসর গ্যাসপার গালাজ যেমন বলেন, ‘দুটো বিষয়ের অনুসন্ধান অর্থাৎ সেই স্বজনহারা নারীদের অনুসন্ধান এবং আমাদের অনুসন্ধান সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট। আমরা সারাদিনের অনুসন্ধান শেষে যখন রাতে বিছানায় ঘুমাতে যাই, আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাই। কারণ আমাদের সন্ধান আমাদের ঘুমকে ব্যহত করে না। কিন্তু সেই নারীদের রাতে ঘুম হয় না ঠিক মতো। কেননা তাদের অনুসন্ধান আমাদের থেকেও কঠিন। আমাদের একটা টেলিস্কোপ আছে। টেলিস্কোপ একটা ভরসার জায়গা। যে ভরসার উপর ভিত্তি করে অতীতকে খুঁজে দেখা যায়। কিন্তু অ্যাটাকামার বিশাল মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খুঁজে পাওয়া সত্যি খুব দূরহ কাজ’। আর তাই একজন স্বজনহারা নারী ভাইয়োলেটা বেরিওস হতাশ হয়ে বলছিলেন, ‘যদি সম্ভব হতো আমরা সেই টেলিস্কোপ দিয়ে এই মরুভূমিতে আমার স্বামীকে খুঁজে বেড়াতাম। টেলিস্কোপ দিয়ে তো অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়’। সত্তর বছর বয়সী ভায়োলেটা দীর্ঘ আটাশ বছর ধরে তার স্বামীকে খুঁজছেন। একবার মুখের একটা অংশ পাওয়া গিয়েছিলো, ভায়োলেটা মেনে নিতে পারেননি। তার কথা হলো, তার স্বামীকে যখন ধরে নিয়ে গিয়েছিলো, আস্তো মানুষটাকেই তারা ধরে নিয়েছিলো, কাজেই এখনও তিনি সেই আস্ত মানুষের কঙ্কালই চান। অনেকে তাকে বোকা মনে করে, কিন্তু যাদের স্বজন হারিয়ে যায় শুধু তারাই তার মর্মবেদনা বুঝতে পারে। আর তাই ভায়োলেটা তার স্বামীর সন্ধান পাবার আগে মারা যেতে চান না। মৃত স্বামীর সন্ধানের মধ্যে দিয়েই যেন তার মৃত্যু সার্থক হবে। লরেটো নুজেজও একই কথা বললেন, ‘অবশ্যই আমাদের খুঁজতে হবে। যদি তারা সমুদ্রে নিক্ষিপ্তও হয়ে থাকে অথবা কোনো খনির অভ্যন্তরের পুঁতে ফেলা হয়ে থাকে, তবু তাদের সন্ধান করে যেতে হবে।’

জীবন নামের অনন্ত জিজ্ঞাসা মানুষকে সেই আদিকাল থেকে পেছনে লেগে আছে। জীবনের শুরু কবে, কিভাবে হয়েছিলো, জীবন এখন কোথায় আছে এবং এই জীবনের পর জীবন কোথায় শেষ হবে সৃষ্টিতত্ত্বের এই আদিম জিজ্ঞাসা জ্যোতির্বিদদের ধাওয়া করে চলেছে। অতীত খুঁড়ে চলেছে তারা। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির অনুসন্ধানরত বিজ্ঞানী তারা। আর তাই মানুষের হাড়ের ক্যালশিয়ামের সঙ্গে আকাশের তারা যেসব উপদানে গঠিত সেই গঠনের মধ্যেও এসব বিজ্ঞানীরা একই ক্যালশিয়ামের খোঁজ পেয়েছেন। স্বজনহারা নারীরাও তাদের স্মৃতি খুঁজে পাবার চেষ্টায় আছেন। স্মরণশক্তির মাঝেই বর্তমান বেঁচে থাকে। ছবির একেবারে শেষের দিকে অসাধারণ ধারা বর্ণনায় পরিচালক প্যাট্রিশিয়া গুজমান আমাদের জানান, অনেক ছোটবেলায় তার মা তাকে একটা মিউজিয়ামে নিয়ে কীভাবে বিশাল এক তিমির কঙ্কাল দেখিয়েছিলেন। ছবিতে সেই বিশাল কঙ্কাল আমরা দেখতে পাই। সেই বিশাল কঙ্কালের নিচে দাঁড়িয়ে গুজমানের মনে হয়েছিলো, সেই কঙ্কালটা যেন একটা বাড়ির ছাদ এবং সেই ছাদের নিচে আরো অনেক তিমির বাস। আমরা অনুভব করি, বাড়ির সেই ছাদ যেন আমাদের স্মৃতিশক্তি আর সেই তিমিরা মানুষের মুছে যাওয়া ঘটনাসমূহ। নস্টালজিয়াকে যে দৃষ্টিকোন থেকে আমরা দেখি তার নতুন এক মাত্রা যেন যোগ করে দেয়া হয় এই স্মৃতিশক্তির মাঝে। ভ্যালেনটিনা রোডরিগুয়েজ নামের আরেকটি মেয়ে, যিনি একজন জ্যোতির্বিদ, তার বয়স যখন মাত্র এক বছর, তার বাবামাকে সেই সময় ধরে নিয়ে নিখোঁজ করে দেয়া হয়। ভ্যালেনটিনার মতে, সে হয়তো যন্ত্রযুগের একজন ক্রটিযুক্ত মানুষ, কিন্তু তার স্বামীসন্তান সেই ক্রটির মধ্যে পড়েনি। জ্যোতির্বিদ হবার ফলে, তার নিখোঁজ বাবামাকে তাদের দেশে আছে বলে সান্তনা পান। একই সান্তনার কথা প্রফেসর গ্যাসপার গালাজ বলেন, ‘আমার জীবনে যদি এমন কিছু ঘটতো তাহলে আমিও হয়তো আমার আপন স্বজনহারাদের আকাশের তারার দেশে আছে ভেবে সান্তনা পেতাম’। সান্তনা যেভাবেই তারা পাক, যুদ্ধের সময় মানুষের মৃত্যুকে মানুষ স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়, কিন্তু একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে ‘নিখোঁজ’ শব্দটা যে কতটা ভয়াবহ পরিচালক গুজমান আমাদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন। ছবিটা আমাদের এক চরম উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়, মানুষ দ্বারা মানুষের এসব কর্মকান্ডকে আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারিনা। তাই স্মৃতিশক্তিকে ধরার রাখার গুরুত্ব আমাদের সামনে আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। আমাদের মনে পড়ে লাতিন আমেরিকাসহ পৃৃথিবীর নানা দেশের আরো নিখোঁজ হবার অতীত কাহিনী। পরিচালক প্যাট্রিশিয়া গুজমানের ভাষায়, ‘আমি নিশ্চিত, স্মরণশক্তির একটা মহাকর্ষীয় শক্তি আছে, যে শক্তি ক্রমাগত আমাদের আকর্ষণ করছে। যাদের এই স্মৃতিশক্তি আছে তারা এই নশ্বর বর্তমানে টিকে যেতে পারে, যাদের এই শক্তি নেই, তারা কোথাও টিকতে পারেনা।’