Home » অর্থনীতি » বাড়তি করের বোঝা জনগণের ঘাড়ে কেন

বাড়তি করের বোঝা জনগণের ঘাড়ে কেন

এম. জাকির হোসেন খান

DIS 5আমাদের উদাহরণ রয়েছে এক বছরে ২৩ শতাংশ বাড়তি কর আদায়ের। আগামী অর্থবছরে ৩০ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এখনকার এনবিআর এ জন্য প্রস্তুত; কারণ সংস্থাটির জনবল বাড়ানো হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।’ ২০১৫১৬ অর্থ বছরের বাজেট উত্তর সংবাদ সম্মেলনে ২০১৪১৫ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৫১৬ অর্থ বছরে ৩০.৭২% বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের বিপরীতে অর্থমন্ত্রী এভাবেই অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। ২০১৫১৬ অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২,০৮,৭৭০ কোটি টাকা, অথচ ২০১৪১৫ অর্থ বছরে ২০১৩১৪ অর্থ বছরের তুলনায় ৯.০৮% বেশি রাজস্ব আয় সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলো এনবিআর। প্রশ্ন হলো এক বছরে কিভাবে রাজস্ব আয় আরো প্রায় ২০% বাড়বে ?

একই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির গতি খুবই শ্লথ। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ লাখ, ২০১৫ সালে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কমবেশি ১২ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর দেয়, অথচ ১৮ লাখ ব্যক্তির কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। আর বর্তমানে প্রদত্ত আয়করের সিংহভাগ আদায় হয় উৎসে আয় কর থেকেই। সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের চাপ যে বিদ্যমান আয়কর দাতা অর্থাৎ উৎসে আয়কর দাতাদের ওপর বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই। সৎ করদাতাদের ওপর সরকারের এ অন্যায় চাপ কতখানি যৌক্তিক, বিশেষ করে চাকরিজীবিদের সামান্য আয়ের ওপর অন্যায়ভাবে অধিক করের বোঝা চাপিয়ে দিলেও কোটিপতিরা থাকছে ধরাছোয়ার বাইরে।

২০১২১৩ অর্থ বছরে ২ কোটি টাকার ওপর নেট সম্পদের মালিকদের ওপর সারচার্জ আরোপ করা হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ৮৬৫ জন ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদ দেখিয়েছেন এবং এনবিআর কর্তৃক আদায়কৃত মোট কর রাজস্বের মাত্র ১১.১৭% দিয়েছে ধনীরা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর হিসাব মতে, ২০১২ সালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ হাজার। বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ১০ নাগরিক প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪ ভাগের এক ভাগ) অর্থ সম্পদের মালিক যার মধ্যে ৫ জন জাতীয় রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং এর মধ্যে ২ জন ক্ষমতাসীন সরকারের ২টি গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। প্রশ্ন হলো বাকিরা কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো? এনবিআর বা দুদক কি জানেনা কারা এ কোটিপতি। এটা কি প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে হয়েছে নাকি এনবিআরের এক শ্রেণীর কর কর্মকর্তাদের সাথে কোটিপতিদের অসাধু আঁতাতের ফলে ঘটেছে? উল্লেখ্য ২০১৩১৪ অর্থ বছরেও ২ কোটি টাকার ওপর সম্পদ দেখিয়েছেন ৫,৩২৯ জন এবং এ সংখ্যা ঢাকা এবং চট্টগ্রামে বেশি ,যা প্রকৃত কোটিপতির তুলনায় সামান্যই। ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৭,১৭৭ জন প্রত্যেকের কমপক্ষে ১ কোটি টাকা বা তার ওপরেও ব্যাংকে গচ্ছিত তহবিল রয়েছে যার সর্বমোট পরিমাণ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১,০৪২ জনের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ১৫ কোটি টাকার মধ্যে, ৩৬৮৭ জনের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৫১০ কোটি টাকা; ১০৮৯ জনের ১০১৫ কোটি টাকার মধ্যে এবং ২৪৮ জন ৫০ কোটি টাকার ওপর জমাকৃত অর্থ দেখিয়েছেন। তবে, প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা যে বাস্তবে অনেক বেশি তা নির্ধ্বিধায় বলা যায় । করের আওতা বাড়িয়ে ধনীদের ওপর প্রগতিশীল হারে কর আদায় বৃদ্ধি, কর ফাঁকি বন্ধ, ব্যাংক ব্যবস্থা হতে অর্থ আত্মসাৎকৃত ও বিদেশে পাচারকৃত তহবিল দেশে ফিরিয়ে এনে তার মাধ্যমে অতিরিক্ত উন্নয়ন তহবিলের যোগান দেওয়া সম্ভব। ।

প্রভাবশালীরা শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কর না দিয়েও দুদক এবং এনবিআর হতে দায়মুক্তির সনদ নিচ্ছে। শুধু তাই নয় রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান না রাখলেও নিয়মিত আয়কর দাতাদের চেয়ে কম হারে কর প্রদানের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ শুধু অব্যাহত রাখাই হয়নি, বরং করের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৫১৬ অর্থবছরে সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে কালোটাকায় ফ্ল্যাট কিনলে আগের চেয়ে কম কর দিতে হবে। অর্থবিল ২০১৫ অনুযায়ী, জেলা সদরে পৌরসভার মধ্যে ২০০ বর্গমিটারের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাট কিনলে বর্গমিটার প্রতি ৮০০ টাকা কর দিতে হবে। আগে এর পরিমাণ ছিল দেড় হাজার টাকা। নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলে বিনা প্রশ্নে কর কর্মকর্তারা তা মেনে নেবেন।২০১৩১৪ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর অধ্যাদেশের একটি নতুন ধারা সংযোজন করে ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করার স্থায়ী সুযোগ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, কেউ ফ্ল্যাট কিনতে না চাইলেও প্রদত্ত করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালোটাকা সাদা করা যাবে।

কিন্তু বাস্তবে যে এ সুযোগ কেউ নিচ্ছেনা উল্টো বিদেশে টাকা পাচার করছে তার অন্যতম উদাহরণ হলো, সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) এর ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৩’ প্রতিবেদনের বরাতে জানানো হয়, ২০১২ এর তুলনায় ৬২ শতাংশ বেড়ে সুইস ব্যাংকগুলোতো বাংলাদেশিদের ৩,১৬২.৭২ কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিকভাবে চাপের ফলে সুইজার ল্যান্ড ২০০২ সাল থেকে দেশভিত্তিক জমাকৃত কালো টাকার পরিমাণ প্রকাশ করার প্রেক্ষিতে দুর্নীতিবাজরা তাদের আমানত উঠিয়ে নিতে শুরু করলেও ২০০৮ আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে পাঁচারকৃত অর্থের আমানত বাড়ছে। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে, ১০ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার প্রাইজিং (কম মূল্যে আমদানি দাম দেখানো) এবং অন্যান্য অবৈধ উপায়ে আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাঁচার হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর বা দুদক কি করছে। এসব অর্থ কিভাবে দেশের বাইওে পাচার হচ্ছে? বিশ্বব্যাপী সন্দেহজনক বা কালো অর্থের পাঁচার সম্পর্কিত গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ২০০৩২০১৪ সময়কালে প্রতি বছর গড় বৃদ্ধির হার হিসাবে (২৮.৮৫%) বাংলাদেশ হতে প্রায় ১৮.৪১ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা পাঁচার হয়, যা হতে সরকার কমপক্ষে প্রায় ৩৫ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতো। উল্লেখ্য, ২০১১ সাল হতেই শেয়ার বাজার, সোনালি ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ব এবং বেসরকারি ব্যাংক হতে ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহায়তায় হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ সহ বিভিন্ন কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও সেসব টাকা উদ্ধার করা হয়নি। ডেসটিনি গ্রুপের প্রায় ৪হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল? আয়কর বিভাগের তথ্যমতে, এসব টাকা কারো নামে জমা হয়নি। মূলত ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে ব্যাপকভাবে অর্থ পাঁচার হলেও ২০১১ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ কম থাকলেও ২০১২ সাল হতে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ২০১১ এর তুলনায় ২০১৪ সালে ৫ গুণের বেশি কালো অর্থ বিভিন্ন দেশে পাঁচার হয়। উল্লেখ্য, উপরের মোট প্রাক্কলনে বেনামে বা অন্য কোন দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের নামে গচ্ছিত অর্থ বা মূল্যবান গহনা ও দূর্লভ সামগ্রীর মূল্য অন্তর্ভুক্ত করায় এ হিসাব খুবই কম। এতো টাকা গেল কোথায়? ১৪ জন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার অবৈধভাবে বিদেশে পাঁচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে দুদক ৮টি বিদেশি সরকারের সহায়তা চেয়ে ৩৪টি চিঠি পাঠালেও তার অগ্রগতি বিষয়ে জনগণ অবহিত নয়। একদিকে অবাধে অর্থ পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার আর অন্যদিকে অন্যায়ভাবে জনগণের কাধে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপাচ্ছে। কোন যুক্তিতে অতিরিক্ত করের বোঝা জনগণের কাধে চাপানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা অবশ্যই জনগণকে দিতে হবে। ক্ষমতায় থাকার পথ সুদৃঢ় করতে জনগণের করের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর এখতিয়ার জনগণ কাউকে দেয়নি।।