Home » আন্তর্জাতিক » মোদীর সফরের মূলে কি বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

মোদীর সফরের মূলে কি বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ওয়েবসাইট অবলম্বনে আসিফ হাসান

last 1চীনের সাথে ভারতের অস্বস্তিকর সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে। তারই রেশ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে বেইজিংয়ের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ভারত দীর্ঘ দিন ধরেই ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। ভারত মহাসাগরে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বন্দর বানিয়ে চীনের কথিত ‘মুক্তার মালায়’ অন্তর্ভূক্ত নিয়েও ভারত উদ্বিগ্ন।

নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের সাথে সামান্য একটু ভূমি বিনিময়বিষয়ক একটি চুক্তির পক্ষে পার্লামেন্টে অনুমোদন পেয়েছেন। আগের মনমোহন সরকার এই চুক্তি করলেও নির্বাচনে ভোট হারানোর ভয়ে তারা এটি অনুমোদনের তেমন চেষ্টা করেননি। বাংলাদেশে রওনা হওয়ার আগে নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ভারতে অভিবাসী হচ্ছে ভারতে মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি এটাকে প্রধান ইস্যুতে পরিণত করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকে অভিবাসন নিয়ে পুরোপুরি চুপ করে আছেন মোদী। এর বদলে তিনি বাংলাদেশে ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য নিশ্চিত করার দিকে মনোনিবেশন করেছেন।

নয়া দিল্লির জওহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা বিশেষজ্ঞ শ্রীকান্ত কোন্দাপালি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া কূটনীতিতে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছিল চীন, তা ছিল ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ভারতে চীনের যত কর্মকর্তা সফর করেছেন, প্রায় ততজনই বাংলাদেশ সফর করেছেন। মোদী তার প্রতিবেশী দেশে গিয়ে বিষয়টি মোকাবিলা করার চেষ্টা করছেন। মোদীর লক্ষ্য ছিল উত্তরপূর্বের ট্রানজিট করিডোরসম্পর্কিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাধীনতাকামীদের ঠেকাতে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ভারতকে প্রায় দুই লাখ সৈন্য ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করতে হয়। এতে অর্থনৈতিক ‘কানেকটিভিটি’ও উন্নত হবে। ঢাকা বিরাজমান ট্রানজিট সুবিধা বহাল রাখতে প্রস্তুত। নিরাপত্তাগত দিক থেকে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটা চীনা দিক থেকেও। বেইজিংয়ের সামরিক সহযোগিতা এবং ঢাকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাড়ায় দিল্লি উদ্বিগ্ন। ঢাকা সফরের মাধ্যমে মোদী তা মোকাবিলাই করতে চেয়েছেন।

চীনা বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিন : এক বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পাকিস্তান ছাড়া সব দেশই সফর করেছেন মোদী। তবে চীনের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ভারত। বিশেষ করে চীন থেকে ডিজেলবিদ্যুৎচালিত দুটি সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনায় ভারতের উদ্বেগ ঢাকা আমলেই নেয়নি, জানিয়েছেন বাংলাদেশের এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং ভারত বিশেষজ্ঞ।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সময়কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কেনা অস্ত্রের ৮২ শতাংশ ছিল চীন থেকে। এর মাধ্যমে বিশ্বে চীনা অস্ত্রের শীর্ষ তিন ক্রেতার একটি হয়েছে বাংলাদেশ। সিপরি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮১২ সময়কালে চীন থেকে বাংলাদেশ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য অস্ত্র কিনেছে। গত বছর চীন থেকে কেনা দুটি নতুন ফ্রিগেট নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খান বলেছেন, ভারতের সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে চীন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে সামরিক সম্ভার প্রধান সরবরাহকারী। ঢাকায় এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, মোট ২০৬ মিলিয়ন ডলারে কেনা বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিনটি সরবরাহ করা হতে পারে ২০১৯ সালের আগে। চীন বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশকে তার যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলোর ডক হিসেবে ব্যবহার করার আদর্শ স্থান মনে করতে পারে। আর এটা ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদদের বেশ শঙ্কিত করছে।

গত বছর শ্রীলঙ্কায় যখন চীনা সাবমেরিনগুলো গিয়েছিল, তখন ভারত আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিল। তবে শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপ দেশটিতে চীনা সাবমেরিন ভেড়ার সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই। তবে বাংলাদেশের সাথে সামরিক সম্পর্ক নিয়ে চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার সহযোগিতা স্বাভাবিক।

চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়নে সহায়তা করছে চীন। কক্সবাজারের কাছে সোনাদিয়া দ্বীপে ৮ বিলিয়ন ডলারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন আগ্রহী। ভারতের আদানি গ্রুপও এই প্রকল্পটি পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নেদারল্যান্ডও এই বন্দর নির্মাণ করিয়ে দিতে চায়। তবে বন্দরটি কবে নাগাদ শুরু হবে তা নিশ্চিত নয়। চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন, তার মতে চীনা প্রস্তাবটিই সবচেয়ে সেরা। তাছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে চীন বেশ কয়েকটি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে।

বাংলাদেশের সাথে চীনা সামরিক সম্পর্কের বিষয়টিতে ভারত গভীরভাবে নজর রাখছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ভারতবাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সাগর দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও রাডার পর্যবেক্ষণ স্থাপন করেছে। তারা মনে করছে, সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হলে তারা সহজেই বঙ্গোপসাগরে যেতে পারবে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সাবেক হাইকমিশনার পিনাকি চক্রবর্তী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সামরিক সামর্থ্য নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। উদ্বেগ হলো পাশের বাড়িতে চীনা প্রভাব নিয়ে’।।