Home » অর্থনীতি » অবহেলায় কৃষিখাত :: বরাদ্দ কম, উল্টো করও বসেছে কৃষিভিত্তিক শিল্পে

অবহেলায় কৃষিখাত :: বরাদ্দ কম, উল্টো করও বসেছে কৃষিভিত্তিক শিল্পে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

DIS 5২০১৫১৬ অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে বিগত সময়ে সরকারের নেয়া বেশ কিছু উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু কৃষি ক্ষেত্রের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট সমাধানে, অর্থাৎ কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনও দিক নির্দেশনা নেই এই বাজেটে। বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই কৃষির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়া। দেশের প্রধান শস্য ধানের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের অর্ধেক মূল্যও ঘরে তুলতে পারেননি সাধারণ কৃষক। ৭০০৮০০ টাকা খরচ করে প্রতি মণ ধান উৎপাদন করে সেই ধান বিক্রি করতে হয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। সবজিসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষকদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। স্বাভাবিকভাবেই কৃষকদের আশা ছিল বাজেটে তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ থাকবে। কৃষকদের সেই আশা পূরণ হয়নি।

২০১৪১৫ অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা হিসেবে খাদ্য মজুদের ক্ষমতা বাড়ানো ও কৃষকদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কৃষকদের কৃষিপণ্য ক্রয় বা সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তন বা সংস্কার প্রয়োজন, কারণ সরকার যেভাবে পণ্য ক্রয় করে তাতে এর সুবিধা কৃষক পায় না, পায় মধ্যস্বত্বভোগীরা। সরকার যখন কৃষি পণ্য সংগ্রহ করে, ততদিনে সেটা কৃষকের হাতছাড়া হয়ে যায়। এ পরিস্থিতির অবসানে প্রস্তাবিত বাজেটে কোনও কিছুই দেখা যায়নি বাজেটে। এক্ষেত্রে কৃষক বাঁচাতে এবং কৃষিপ্যণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর ‘জাতীয় কৃষি পণ্য মূল্য কমিশন’ গঠন করতে হবে। এই মূল্য কমিশন কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণে কাজ করবে এবং সরকারি ও বেসরকারি কৃষি পণ্য ক্রয়পদ্ধতিতে সংস্কার আনবে।

বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ‘কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্যই পাচ্ছেন’(?) খোদ কৃষিমন্ত্রীর এই উপলব্ধি আশংকাউদ্বেগ সৃষ্টি করে। এই বিষয়টি নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে তেমন কোনও চিন্তাভাবনা নেই, কারণ সরকার এটিকে কোনও সমস্যাই মনে করছেনা। এর প্রমাণও পাওয়া যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক ২০১৫১৬ টু ২০১৭১৮’ নামের বিশাল একটি প্রকাশনাতে। এতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক আটটি কর্মসূচি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত মানের বীজ উৎপাদন, অর্গানিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, উন্নত মানের বীজের সম্প্রসারণ ইত্যাদির কথা থাকলেও কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে, এমন কোনও কর্মসূচির উল্লেখ নেই।

আগামী অর্থ বছরের জন্য বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১২,৬৯৯ কোটি টাকা, যা টাকার অঙ্কে ২০১৪১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪২১ কোটি টাকা বেশি। ২০১৪১৫ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৫১৬ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ২৩.১৩ শতাংশ, অথচ কৃষির জন্য বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৩.৪৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে কৃষিখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৫.১২ শতাংশ, অথচ আগামী অর্থ বছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ মাত্র ৪.৩০%। মোট বাজেটের আকার বাড়লেও কৃষির জন্য বরাদ্দ কমে গেছে দশমিক ৮২ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে এবারই কৃষি বাজেটের আকারের আনুপাতিক হারে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেল।

প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিভিত্তিক ১৩টি শিল্পের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। পোলট্রি খাদ্যের উপকরণ সয়ামিল এবং ভুট্টা আমদানিসহ মুরগির বাচ্চা বহনের জন্য ব্যবহৃত ট্রে আমদানির ওপরও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কৃষিভিত্তিক শিল্পের পণ্য আমদানির ওপরও বাড়তি শুল্কারোপের প্রস্তাব রয়েছে। ২০১৫১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

পোলট্রি শিল্পের ওপর করারোপ বৃদ্ধি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন পোলট্রি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এ শিল্পে উদ্যোক্তারা কর দেয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান। কিন্তু সেটা অবশ্যই শিল্পে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। গত দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে পড়ে এ শিল্প। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে এ খাত থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন দেশীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। এ পরিস্থিতিতে এক ধাপে ১৫ শতাংশ করারোপ এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে। বাড়তি এ করারোপের কারণে সার্বিকভাবে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, পোলট্রি শিল্পের আয়ের ওপর আয়কর ছিল শূন্য। প্রস্তাবিত বাজেটে এ শিল্পের আয়কর এখন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ১০ লাখ টাকা আয় উপার্জনকারীর ওপর ৩ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পটি দেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। এ খাতের সঙ্গে ডিম, বাচ্চা, মুরগি, খাদ্য এবং ওষুধ উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছে হাজারখানেক কোম্পানি। এছাড়া দেশে এক লাখের বেশি ক্ষুদ্র খামার রয়েছে। শিল্পটিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং প্রায় ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পোলট্রি শিল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার টন মাংস, দেড় লাখ টন খাদ্য, ৪২ কোটি ডিম উৎপাদন করা হয়। সার্বিকভাবে করারোপের কারণে হরতালঅবরোধের মতোই আবারো বিপর্যয়ে পড়বে এ শিল্প।

এদিকে, হাঁসমুরগি, চিংড়ি, মাছের হ্যাচারির ওপর সাধারণ করহার প্রযোজ্য হলেও এখন থেকে এসব কোম্পানির ওপর বাড়তি করারোপ করা হয়েছে। এসব খাতের কোম্পানিগুলোর ওপর করারোপ পোলট্রি শিল্পের মতোই নির্ধারণ করা হয়েছে। পোলট্রি খাতের বিভিন্ন শিল্প ছাড়াও গবাদিপশু, বীজ, দুধ, ব্যাঙ, তুত চাষ, মৌমাছি, রেশম, ছত্রাক ও ফুল চাষের ওপর কর ছিল ৩ শতাংশ। এসব খাতের কোম্পানির ওপর এখন পোলট্রি শিল্পের আয়ের মতোই করারোপ। তবে কৃষিভিত্তিক শিল্পের মধ্যে সিড খাতে করারোপ হলে তা ভালো মানের বীজ উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

লাল তীর সীডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আনাম এ প্রসঙ্গে বলেন, কোম্পানিগুলো ভালো মানের বীজ নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত গবেষণা ও বিনিয়োগ করছে। দেশের চাহিদা মেটাতে জাত উদ্ভাবনসহ বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেছে। এজন্য বেশকিছু কোম্পানি বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু প্রণোদনা না দিয়ে উল্টো করারোপের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা হলো। এর মাধ্যমে মানহীন খারাপ বীজ আমদানি উৎসাহিত হবে। আর ক্ষতির কবলে পড়বে দেশের কৃষক। বাধাগ্রস্ত হবে খাদ্য উৎপাদন।

বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে শতভাগ সবজি ও ভুট্টাবীজ এবং ৯০ শতাংশ হাইব্রিড ধানবীজ সরবরাহ করছে বেসরকারি খাতের সনদপ্রাপ্ত দেড়শটি কোম্পানি। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে ২০ হাজার বীজ ডিলার ও ১৫ হাজার ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী কাজ করে থাকেন। এ বিষয়ে এসিআই লিমিটেডের (এগ্রিবিজনেস) নির্বাহী পরিচালক ড. ফা হ আনসারী বলেন, কৃষি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে দেশের বীজ খাতের কোম্পানিগুলো। যদিও এ খাতের ব্যবসায় নানাবিধ বাধা রয়েছে। এসব বাধা উপেক্ষা করেই বেশকিছু কোম্পানি কাজ করছে। বাজেটে প্রস্তাবিত করারোপের বোঝা গিয়ে কৃষকের ওপরই পড়বে। তাই সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি করেন তিনি।

লাভজনক হওয়ায় ফুল চাষে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দেশে এখন আবাদ হচ্ছে দেশী বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির ফুল। এর ওপর ভিত্তি করে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের অনেক কৃষক জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ অবস্থায় ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর করারোপ এ শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। এদিকে কর বাড়ানো হয়েছে মৌমাছি চাষেও। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এ খাতের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ টন মধু সংগ্রহ করা হয়। এ খাতে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। করারোপের কারণে মধু উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বাড়তে পারে আমদানি নির্ভরতা। এছাড়া হ্যাচারি ও চিংড়ি চাষের ওপর কর বাড়ানোর মাধ্যমে এ খাতকে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হবে। কেননা এ খাতের উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পণ্য রফতানি করতে হয়।।