Home » রাজনীতি » উন্নয়নের নামে আইনকে শাসন

উন্নয়নের নামে আইনকে শাসন

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

এক.

DIS 1আমাদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্য ভিত্তি ছিল আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং একটি স্থিত, দক্ষ ও সন্ত সরকার’ (The foundation for our financial centre were the rule of law, an independent Judiciary & a stable, competent government)। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক বি কুয়ান তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ From Third world to First: The Singapore Story-এ সিঙ্গাপুরের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার বিষয়ে এ কথাগুলো বলেছিলেন। আজকের সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া অর্থনৈতিক মানদণ্ডে এশিয়া ও বিশ্বে যে জায়গায় অবস্থান নিয়েছে তার মূলে ছিল আইনের শাসন। তাদের দেশে এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে দল, গোষ্ঠি, ব্যক্তি বা বিশেষ পরিবারের প্রতি পক্ষপাত করে শাসন পরিচালিত হয় না। শাসন ব্যবস্থাই সেখানে আইনের প্রতি অন্ধ। অপরাধ করে বংশ পরিচয় বা দলীয় পরিচয়ে সেখানে কেউ নিস্তার পেয়েছে, এমনটি জানা যায় না। উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যারা অল্পস্বল্প গণতন্ত্রের কথা বলে যে কোন উপায়ে নির্বাচনে জেতেন বা জিততে চান, তারা আসলে আইনের শাসনের চেয়ে এর পদ্ধতিগত পথটিকে নির্দেশ করতে যেয়ে সত্যমিথ্যা গুলিয়ে ফেলেন। ফলে, তাদের উদাহরনে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর মডেল অসাড় হিসেবেই বিবেচিত হয়।

ভারতের উদাহরনও আজকাল অনেকে সামনে নিয়ে আসছেন। রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে গিয়ে ব্যবস্থাগত অনেক দুর্বলতা হয়তো ভারতের রয়েছে, কিন্তু সেখানকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অনেক বেশি দৃশ্যমান। আর এই সক্ষমতার কারনে দৃশ্যমান আইনের শাসনকে ক্ষমতাশালীরা খুব সহসাই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে পার পায় না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা বা বেকায়দায় ফেলার নোংরা রাজনীতি কমবেশি সেখানেও রয়েছে। কিন্তু সংঘবদ্ধ বা বড় অপরাধ করে কিংবা যুক্ততা থাকলে আদালত, মিডিয়া এড়িয়ে যাবার রাস্তা ভারতে নেই। আদালত, মিডিয়া বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির সক্ষমতা সেখানে এই পর্যায়ে পৌছেছে যে, অপরাধীরা অন্তত: নির্বিঘ্ন থাকতে পারে না। তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও শক্তি ভারতকে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে পরিনত করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর ভর করেই ভারত রাষ্ট্র হয়ে উঠছে গণতান্ত্রিক, ভিত্তি পাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিধি ব্যবস্থা। জনগণ তার ইচ্ছেমত ভোট দিতে পারছে এবং তার মতামতের প্রতিফলন নির্বিঘ্ন ও নির্দিষ্ট সময়ে হস্তান্তর হচ্ছে ক্ষমতা। রাষ্ট্রাচারে গুনগত পরিবর্তন থাকায় জাতীয় স্বার্থের ঐক্যমত্য রয়েছে। আগেই বলেছি, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অন্তর্গত দুর্বলতার কারনে ভারতে এখনও এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে যায় না। কিন্তু সেখানে এর বিরুদ্ধে রয়েছে প্রবল জনমত। যাকে শাসকরা উপেক্ষা করে না, ধামাচাপাও দেয় না। এজন্যই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে ভারতের বহু প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীদের। হালের জয়ললিতা, অভিনেতা সালমান খানের দণ্ড ও দিল্লির আইনমন্ত্রীর গ্রেফতার সবচেয়ে বড় উদাহরন।

আইনের শাসনহীনতা, বিচারহীনতা এবং ধামাচাপা দেবার সংস্কৃতি এখন বাংলাদেশকে আঁকড়ে ধরেছে আষ্টেপৃষ্ঠে। এই অপসংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে ‘উন্নয়ন, জিডিপির সাফল্যের সাতকাহন, লাখ কোটি টাকার বাজেট আর মধ্যম আয়ের দেশ নামক কথামালার ফুলঝুড়ি’ ছোটানো হচ্ছে। ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকারএর জায়গা দখল করে নিচ্ছে উন্নয়ন আর মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন। জনগণের বিরুদ্ধে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত সংঘবদ্ধ অপরাধ ধামাচাপা দিয়ে দিচ্ছে এই স্বপ্ন। আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে শেয়ার বাজার লুন্ঠন, হলমার্কবিসল্লিাহডেসটিনিযুবক দুর্নীতি, সোনালীবেসিক ব্যাংক দুর্নীতি, তিন’শ গুমের ঘটনা, পুড়িয়েপিটিয়ে হত্যা, সাংবাদিক সাগররুনি ও অভিজিৎসহ ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ষবরনে যৌন সন্ত্রাসসহ অগনিত অপরাধ। এই ভয়াবহ সব ঘটনা মাটিচাপা দিয়ে আইনের শাসনের বদলে আইনকে শাসন করে এই দেশ কোন উন্নয়ন ঘটাতে চায় এবং মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হতে চায়? এ যেন সারা গায়ে দগদগে কুৎসিত ঘা নিয়ে সুস্থ জীবনযাপনের প্রতারনা!

রাষ্ট্র তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে না তুললে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, অথর্ব এবং দলীয় আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। তারা রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের অনুসারী না হয়ে দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যশীল থাকে। বাংলাদেশে এই চর্চার এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে, দল বা ব্যক্তি আইনকে শাসন করছে, বিনিময়ে লাভ করছে নানা রকম বৈষয়িক ও পার্থিব সুবিধাদি। ক্ষমতাসীনদের জন্য আইনের পক্ষপাত এবং বিরোধী দল বা মতের কিংবা ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থাকা মানুষদের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ জানিয়ে দেয়, আইনের শাসন নয়, শাসন করা হচ্ছে আইনকে। এই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং সবশেষ সিটি নির্বাচন। একক ও প্রায় ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনে সরকার গঠনের পর কর্তৃত্ব ও সত্যির ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতিতে বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে। ফলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুনের মত ভয়ংকর অপরাধ এবং নির্বাচনী অনিয়মসহ দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাচ্ছে।

এখন গণতন্ত্র আগে না উন্নয়ন আগে এ নিয়ে লেখালেখি, আলোচনা, বক্তব্য, বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে। সরকার, ক্ষমতাসীন দল এবং ক্ষমতাকাঠামোর সাথে যুক্ত ও সমর্থক বুদ্ধিজীবিগন ধারনা দেবার চেষ্টা করছেন যে, উন্নয়ন চাইলে অল্পস্বল্প গণতন্ত্র মেনে নিতে হবে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে তুলনা করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, উন্নয়নের জন্য শক্তি প্রয়োজন, নীতি মেনে চলা প্রয়োজন। যুক্তিটি হচ্ছে, লি কুয়ান স্বৈরশাসকের মত দেশ চালিয়েছিলেন এবং মাহথিরের কর্তৃত্ববাদী শাসন সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে। সুতরাং বাংলাদেশে তাদের মত অল্পস্বল্প বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র থাকলে অসুবিধে কোথায়, তা যদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে! কিন্তু আসল সত্যটি আড়াল করা হচ্ছে যে, আইনের শাসনহীনতা, বিচারহীনতা এবং ধামাচাপার সংস্কৃতি দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি জনগণের রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে কত বড় বাধা, প্রতিবেশী দেশ ভারতকে দেখেও সেই সত্যটুকুও আড়াল করা হচ্ছে।

দুই.

শরণার্থী বা রিফিউজি হওয়ার অভিজ্ঞতাকে সাথে নিয়েই এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এককোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এই মানবিক বিপর্যয় সে সময়ে সারাবিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশ্বের বিবেকবান সরকার, সংগঠন, মিডিয়া ও জনগণ সে সময়ে বাংলাদেশী শরণার্থীদের সমব্যাথী হয়েছিল, মানবিক সহায়তা জুগিয়েছিল। চুয়াল্লিশ বছর পরে আজকের পরিস্থিতি সেরকম নয়, দেশ এখন স্বাধীন। স্বাধীন দেশের মানবসম্পদ এখন দেশের শ্রমবাজারে ক্রমপুঞ্জিভূত উদ্বৃত্ত শ্রমিক। খাদ্যহীন, আশ্রয়হীন ও নিরাপত্তাহীন এই মানবসম্পদ এখন অকূল সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোর কোন স্তরে এই মানুষগুলোর অবস্থান তারা বিবেচ্য নয় আদম সন্তান হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এরা হচ্ছে মানসিক রোগী’। এই কথিত মানসিক রোগীগুলি বৈধঅবৈধ যে কোন পথে তার উপার্জন পাঠাবেন, তখন তা রেমিট্যান্স হিসেবে জাতীয় রিজার্ভে অবদান রাখবে! তারপরেও মানুষ হিসেবে তার ন্যূনতম মর্যাদা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে না। কি নিদারুন কৃতজ্ঞতা!

সমস্যাটি আন্তর্জাতিক ও আন্ত:রাষ্ট্রীয়। কাজের খোঁজে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত শ্রম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের জন্য সাগরে ভাসছে। তারা বাংলাদেশে ঢুকতে গিয়ে সাগরপথেই পুশব্যাকড হয়েছে। ভাগ্যবানরা এদেশে ঢুকে মূল ¯্রােতে মিশে যাবার চেষ্টা করছে। সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে না ধরে এডহক ব্যবস্থা হিসেবে আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথেই পাঠিয়ে দেয়া হয়। আশ্রয়ের খোঁজে রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যাবার জন্য আন্তর্জাতিক দালালচক্রের শরণাপন্ন হয়। এই চক্রের চোখ পড়ে বাংলাদেশের দিকেও। মালয়েশিয়া যাবার প্রলোভনে আকৃষ্ট করা হয় দেশের যুবতরুনদের। টেকনাফউখিয়াকক্সবাজারের মানব পাচারের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৪১টি জেলায়। আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের যোগানের সাথে যুক্ত হয় দেশীয় চক্রটি। ফলে ২০১৫ সালে এসে নিরাশ্রয় ও অসহায় রোহিঙ্গাদের সাথে অকূল সমুদ্রে ভাসছে হাজার হাজার বাঙালী সন্তান। এই মানবিক বিপর্যয়ে পড়া মানুষগুলিকে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী বলছেন, মানসিকভাবে অসুস্থ এবং পাচারকারীদের সাথে তাদেরও শাস্তি হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করছেন।

মানবপাচারের দেশীয় চক্রের গডফাদার হিসেবে কক্সবাজার অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্যর নাম খুবই আলোচিত হচ্ছে। তাকে বাংলাদেশের মিডিয়া, প্রশাসনসহ সকলেই চেনে ইয়াবা সম্রাট হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র ও স্মাগলিং সিন্ডিকেটের সাথে তার ঘনিষ্টতা রয়েছে। গত ১৩ জুন সকাল ৭টায় প্রচারিত সময় টিভি সংবাদের সচিত্র প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সংসদ সদস্যকে প্রশ্ন করা হলে যথারীতি তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। খবরে দাবি করা হয়, তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলি নিয়ে প্রশাসন বিব্রত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে দেখতে পারেন, তদন্তের নির্দেশ দিয়ে সত্যাসত্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন। গডফাদারকে যদি ধরা যায় তাহলে খুচরো পাচারকারীদের ক্রসফায়ারের শিকার হতে হবে না। তারাও আইনের আওতায় চলে আসবে। এইসব পাচারকারীদের শাস্তি ও অস্তিত্ব বিলুপ্তির সাথে অথৈ সাগরে ভাসমান মানসিক রোগীগুলির রোগমুক্তি ও বেঁচে থাকার প্রশ্নটিও যে জড়িত!